kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর উত্তরণ ও বাংলাদেশ

ড. মো. মোফাকখারুল ইকবাল   

২১ এপ্রিল, ২০২১ ১৬:৫৮ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর উত্তরণ ও বাংলাদেশ

ফাইল ফটো

ঔপনিবেশক রাজনীতির প্রান্তিকলগ্নে নেতৃত্ব হস্তান্তরের মহারণে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আর রায়টের কুরুক্ষেত্র ভারতবর্ষের অধুনাতন শহর কলকাতায় রাজনৈতিকভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের উন্মেষ ঘটে। পরোপকারী আপসহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও নেতৃত্বগুণে পরিপূর্ণতার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক স্কুলে অধ্যয়নকালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীর আনুকূল্য পেতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের সাহচর্যে আসার প্রবল আগ্রহ ও প্ররোচনায় কলকাতার তত্কালীন প্রখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন তেজোদীপ্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। প্রবল সাহসী কিন্তু শিক্ষা গুরুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র-শিক্ষকদের আস্থায় মুজিব হয়ে উঠলেন।
ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যাসহ জনসাধারণের চাওয়া-পাওয়াকে অবজ্ঞা করে তিনি যখন দিন-রাত নিজের খাওয়াদাওয়া ভুলতে বসেছিলেন, তখনই শিক্ষকদের নজর পড়ল শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর। তাই শিক্ষকদের নির্দেশ ছিল তাঁকে নিজের ওপর নজর রাখতে হবে। আব্দুস সাত্তার যিনি পরবর্তী সময়ে এমএলএ ছিলেন, তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রুমমেট। সাত্তার সাহেবের একান্ত বন্ধু নীহারঞ্জন চক্রবর্তী। বাংলাদেশের চাঁদপুরের মানুষ মি চক্রবর্তী কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করে কলকাতা আসেন। মুক্তিযুদ্ধে কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে যাঁর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। তিনি তাঁর বাসভবনে বসে বলছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার চার বছরের বড় হলেও আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন অসুস্থতার কারণে তিনি আইএ ক্লাসে পড়তেন। তবে তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বগুণের কারণে আমরা তাঁর কথা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। নীহারঞ্জন অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে বলেন, বাঙালি ছাত্রদের পক্ষে মুজিব ছিলেন ধর্মের ঊর্ধ্বে। কী ভীষণ সাহসী সুপুরষ! তাঁকে না দেখলে অনুমান করা কঠিন। অবশ্য আব্দুস সাত্তার ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের স্নাতক পর্যায়ের সহপাঠী। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন গোপালগঞ্জের স্কুলজীবনের সহপাঠী শাহাদাত্ হোসেন। টুঙ্গীপাড়ার গিমাডাঙ্গা গ্রামের দরিদ্র বচন মিয়ার সহজ-সরল ছেলে শাহাদাত্ হোসেনের বেকার হোস্টেলের আর্থিক ভার নিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বেকার হোস্টেলের তিনতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারের ২৪ নম্বর কক্ষটি ছিল কলকাতার তখনকার মুসলিম ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার। এই কক্ষ থেকেই নির্ধারণ করা হতো ছাত্র আন্দোলনের রূপরেখা।
মোদ্দাকথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের উত্তরণের পরিপক্বতা আসে কলকাতা জীবনের ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের সময়কাল। তত্কালীন বিশ্বের সেরা আইনজীবীদের একজন ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কতটা থাকলে উচ্চ মাধ্যমিকের একজন ছাত্র তাঁর তত্ত্বাবধানে যুক্তিসংগত রাজনৈতিক তর্কে অংশ নিতে পারে। শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী হয়েও রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর যৌক্তিক উপস্থাপনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ফসল দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে বৈরিতায় পর্যবসিত করার কৌশল বের করেন, যা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রভাবিত করে। বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে কতটা সচেতন হলে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ইসলামিয়া কলেজের প্রকাশনায় ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান লেখেন, ‘জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার বর্তমান গণতন্ত্রের যুগে একটা অচ্ছেদ্য, অবশ্য করণীয় কর্তব্য, যা প্রত্যেক রাষ্ট্র নিতে বাধ্য হচ্ছে।’

২.
এখন আর সেই যুগ নেই যখন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা নিজেদের সর্বপ্রকার শোষণের পথ খোলা রাখার জন্য জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে মনোযোগী হতেন না, আর অনেক স্থানে অশিক্ষার বদলে কুশিক্ষা দিতেই ছিলেন আগ্রহী, যদিও পুঁজিবাদীদের আওতায় সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার’ মামুলি স্লোগান দিয়ে পৃথিবীর কতগুলো অতি প্রাচীন সুসভ্য রাষ্ট্রকে শিক্ষা দেওয়ার ভার নিয়ে অশিক্ষা ও কুশিক্ষা উভয়ই দিচ্ছে, যাতে নিজেদের শোষণের পথ চিরদিন উন্মুক্ত থাকে। একজন ছাত্রনেতা থেকে রাষ্ট্রের অধিকার নিয়ে এমন তীক্ষ, ধারালো ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা এসেছে মূলত ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের কৌশলী আন্দোলনের প্রবক্তাদের সান্নিধ্য ও প্রভাবিত হওয়ার কারণেই। শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ জনগণের জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেননি বাল্যকাল থেকেই। তা আরো জাগ্রত হতে লাগল যখন কলকাতায় সরাসরি দেখলেন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস মতবাদ ও সত্যগৃহ আন্দোলনে জনসাধারণকে কেমন করে সম্পৃক্ত করা যায়।
কলকাতার তত্কালীন প্রাণপুরুষ, যিনি বিশ্বরাজনীতিতে ঝড় তুলেছিলেন—সেই নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতবর্ষের শিক্ষা পরিকল্পনা, নারীমুক্তি, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কৃষ্টি ও শিক্ষাভাবনাকে আধুনিকায়ন করে কিভাবে ভারতবর্ষের চূড়ান্ত মুক্তি অর্জন করা যায় সে রূপরেখা প্রত্যক্ষ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে নেতাজি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার। জাতীয় সংগীত নির্ধারণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’ গানটির হিন্দি অনুবাদ। নেতাজির আজাদ হিন্দ সৈনিকদের সর্বস্ব ত্যাগ মুক্তিকামী মানুষদের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছিল। সারা দেশে আন্দোলনের যে দামামা বাজিয়েছিলেন নেতাজি তা ইংরেজিদের প্রবলভাবে টনক নড়েছিল সেই ঝংকার তাদের গঙ্গা-যমুনা থেকে বিদায় করেছিল। সুভাষ চন্দ্রের বলিষ্ঠ আদর্শিক নেতৃত্ব কিভাবে মানুষকে আলোড়িত করে মুক্তির নেশা জাগিয়ে চূড়ান্ত সফলতায় পৌঁছানো যায় তা বঙ্গবন্ধু নিজের জীবনে নিয়েছেন একান্তভাবে। মানুষকে কিভাবে জাগিয়ে তোলা যায়, কিভাবে আন্দোলনকে দুর্বার গতিতে সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করা যায় তা বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত প্রতিফলন করেছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ওপর।
বঙ্গবন্ধু নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের অনুরক্ত ছিলেন ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালীন সময়েই। নেতাজি এলগিন//// রোডে গৃহাভ্যন্তরীণ থাকা অবস্থায় একবার শেখ মুজিবুর রহমান দেখা করেছিলেন, যা ওই সময়ের নিরাপত্তারক্ষীদের আশ্চর্যের বিষয় ছিল। কারণ শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য নেতাজি যে সময় বরাদ্দ রেখেছিলেন তা আলাপ শুরু হওয়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যায়। গৃহাভ্যন্তরীণ নেতাজির সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাত্কালে অন্য কারোর প্রবেশ নিষেধ ছিল। নেতাজি যেভাবে মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে গিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ঠিক তেমনি মানুষকে আলোর পথে এনেছিলেন। নেতাজির মূলমন্ত্র ছিল ‘Freedom, Freedom is the song my soul’ এবং ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদোর স্বাধীনতা দেব।’ তেমনি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ জনতার সামনে ও পাকিস্তানের জান্তা সরকারের কঠোর হুংকার আর ওপর থেকে ব্রাশফায়ার করার তীব্র আতঙ্কের মধ্যেও ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
 ৩.

মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক আদর্শের চারটি বার্তা ছিল : হিন্দু মুসলিম ঐক্য, স্বরাজ, স্বদেশি আর রিম্যুভাল অব আনটাচেবিলিটি। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন খিলাফত আন্দোলন, স্বদেশির জন্য তাঁর হাতিয়ার ছিল চরকা, স্বরাজের জন্য হাতিয়ার ছিল অহিংসা। গান্ধীজির মূলমন্ত্র অহিংসার জন্য নির্ধারণ করেছিলেন সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আইন অমান্য সর্বশেষ অনশন। শেখ মুজিবুর রহমানও তেমনি সমাজের অসংগতি, দুঃখ-দুর্দশা, হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি, অস্পৃতা দূরীকরণ, মানুষে মানুষে নিবিড় বন্ধনের জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তা তুলে ধরেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ তিনি জনমানুষের তুষ্টির নিরিখে প্রতিটি কাজ করে গেছেন। কখন মানুষের কল্যাণ ব্যতিরেকে কিছু করতেন না। সব মানুষের মর্যাদা ছিল সমান। বলেছিলেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ মানুষের অধিকার বাস্তবায়নে নিবেদিতপ্রাণ নেতাজি, সুভাষ চন্দ্র বসু ও চিত্তরঞ্জন দাসের রাজনৈতিক দর্শন শেখ মুজিবুর রহমানের মনে সর্বদা বিরাজমান ছিল। কলকাতায় অধ্যয়নকালে শেখ মুজিবুর রহমান ভারতবর্ষের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বদের আদর্শিকরূপ রপ্ত করেছিল। বাঙালির রাজনীতির প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে পরিলক্ষিত হয় ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তকরণ, সামাজিক সাংস্কৃতিক, আর্থিক দিক নির্ধারিত হয় সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক উন্মাদনার ভিত্তিতে। এই সব কিছুর ঊর্ধ্বে ভারতবর্ষের কিছু রাজনৈতিক নেতার উজ্জ্বল আদর্শের কারণে মানবতার স্পর্শ পরিলক্ষিত হয়। সেই সব উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বরা হলেন : মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশ ও নেহরু। শেখ মুজিবুর রহমান এই সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আলোকিত দিকগুলো গ্রহণ করেছেন প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে।
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪২ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে আইএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। তত্কালীন মুসলিম ছেলেদের জন্য প্রভাবশালী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো ইসলামিয়া কলেজ। আবাসস্থল হলো বেকার হোস্টেল। রাজনীতির আদর্শস্থান হিসেবে পেলেন বেকার হোস্টেলকে তিনি। রাজনীতি করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শস্থান হয়ে উঠল বেকার হোস্টেল, যেহেতু তিনি গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়াকালীন ১৯৩৮ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। শেখ মুজিব তাঁদের সংবর্ধনায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। সেই সঙ্গে তিনি তাঁর সাহসিকতা ও যোগ্যতার প্রমাণ ওই সময়ে দিয়েছিলেন তাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁর বিস্তারিত তথ্য নিয়েছিলেন। তাই হোসেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব শেখ মুজিবকে কলকাতা আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ফলে কলকাতা ছিল শেখ মুজিবের জন্য রাজনীতি করার আদর্শ জায়গা। এদিকে ফজলুল হক সাহেব মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার পরে ১৯৪৩ সালে খাজা নাজিমুদ্দীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বেসরকারি সরবরাহ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন। রাজনীতির গুরু সোহরাওয়ার্দী এ দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন দিক দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি করার সুযোগ প্রসারিত হতে লাগল। প্রতিটি সুযোগ শেখ মুজিব সচেতনভাবে গ্রহণ করেছেন। মিছিল, মিটিং ও সভাতে লোকজন দরকার হলে শেখ মুজিব সফলভাবে তা ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশের মানুষকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে সব বাধাবিপত্তি পেরিয়ে মুক্তির চূড়ান্ত সোপানে নিয়ে আসার যে নেতৃত্বগুণ সেসব প্রতিটি ধাপ শেখ মুজিবুর রহমান বেকার হোস্টেলে অবস্থানকালে প্রখ্যাত নেতাদের সান্নিধ্যে পেয়েছেন। তখন শেখ মুজিব তাঁর নেতাদের নির্দেশমতো ছাত্র সভা-সমাবেশে নিয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উন্মেষকাল।                
৪.
কলকাতায় অবস্থানকালে শেখ মুজিব হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতির যে বীভত্স রূপ দেখেন তা তাঁকে পীড়া দিয়েছিল। তাই তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলার পক্ষে সমাবেশে বলেন, ‘ধর্মীয় ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজন আমাকে পীড়িত করে।’ একজন ছাত্রনেতা এমন উন্নত চিন্তা ও ধারণা তখনই করতে পারেন, যখন তিনি স্বার্থ, অহমবোধ, দ্বেষ ও হিংসার ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে পারেন। আপাতদৃষ্টিতে এসব গুণের সমন্বয় ঘটেছে রিম্যুভাল অব আনটাচেবিলিটি ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধী থেকে। নেতাজি কেমন ভারত গড়তে চেয়েছিলেন তা ১৯৩৫ সালে মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় উল্লেখ করেছিলেন : ভারতের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার বন্ধ করতে হবে। দেশের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করতে হবে। বিভিন্ন উন্নত সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। সমস্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে হবে, বিভিন্ন ভাষায় দেশের সম্পর্কে বই প্রকাশ করতে হবে, বিদেশে দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করতে হবে। বঙ্গবন্ধু ও নেতাজির এসব জানতেন। বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নেতাজির এসবের প্রতিটি স্মরণ রেখেছিলেন। ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের দায়িত্বে এলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম। তখন তাঁদের পক্ষে কোনো পত্রিকা সাময়িকী ছিল না। সোহরাওয়ার্দী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘মিল্লাত’ বের করলেন আবুল হাশিমের সম্পাদনায়। এ পত্রিকাটি ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান পথে পথে নিজে পাঠকের কাছে সরবরাহ করতেন। তিনি প্রগতিশীলতার রাজনৈতিক ধারা রপ্ত করেছিলেন মাধ্যমিক ছাত্র থাকাকালীন থেকেই। স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আব্দুল হামিদ মাস্টারের তত্ত্বাবধানে থেকে মাধ্যমিক স্তরেই শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিকভাবে সচেতন হন।
ভারতবর্ষের সংস্কৃতির তীর্থভূমি কলকাতায় অবস্থানকালে (১৯৪২-১৯৪৭) তত্কালীন সংস্কৃতিক অঙ্গনের নির্যাস সাহিত্যের ধ্রুপদি সৃষ্টির রস এবং প্রগতিবাদী সংগীত বঙ্গবন্ধুকে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঈশ্বরচন্দ্র, মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ও সাহিত্য বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের উদ্রেক করে। সংস্কৃতির আখড়ে গড়া আত্মায়ই শুধু সংহতির ভিত্তিতে বিশ্বের সব সংস্কৃতির মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করে নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সংগত চাওয়াকে মর্যাদা দিতে শেখায়। এসব গুণের অধিকারী বঙ্গবন্ধু ছিলেন তেমনই একজন সুপুরুষ।
প্রাজ্ঞ রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের সান্নিধ্য শেখ মুজিবুর রহমান নিজের জীবনে সচেতনভাবে সন্নিবেশ করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও খুব কাছ থেকে তাঁর বাবা বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন রপ্ত করেছেন। ‘সকলের সাথে বন্ধুত্বতা কারো সাথে শত্রুতা নয়’—এমন অমোঘ মানবতার দর্শনে বিশ্বাসী শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে সুগভীর বন্ধুত্ব বজায় রেখেছেন নিবিড়ভাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, করিডর সমস্যার সমাধান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

লেখক : প্রথম সচিব (প্রেস), বাংলাদেশ উপহাইকমিশন, কলকাতা



সাতদিনের সেরা