kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

স্বাধীনতার চিন্তার উদ্ভব ও তার বাস্তবায়ন

অজিত কুমার সরকার   

২১ এপ্রিল, ২০২১ ১৬:৫৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্বাধীনতার চিন্তার উদ্ভব ও তার বাস্তবায়ন

ফাইল ফটো

২০২১ সাল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মের শতবর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির বছর। সারা দেশে পালন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা হঠাত্ করে আসেনি। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বপ্ন, দূরদর্শী চিন্তা, ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং চরম আত্মত্যাগ। এই স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাস্তবায়নে নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি। শেখ মুজিবের মাথায় বাংলার মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার চিন্তা উদ্ভূত হওয়ার রাজনৈতিক কারণ মুসলিম লীগের রাজনীতি এবং ভারতবর্ষ ভাগের প্রক্রিয়া। তিনি ভারতবর্ষ ভাগের পূর্বেই মুজিব মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক ও সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রতি আস্থা হারিয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মুসলিম লীগের সঙ্গে থেকে বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ভারতবর্ষ ভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়। মাউন্ট ব্যাটেনের ফর্মুলায় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের বিভক্তি নিয়ে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সিরাজউদ্দৌলা হোস্টেলে ছাত্র ও যুব নেতাদের নিয়ে এক রুদ্ধদার বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে লীগবিরোধী ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শেখ মুজিবের মনে অবস্থা স্পষ্ট করে লেখা হয়েছে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত মযহারুল ইসলামের গ্রন্থে। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৯৪) তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতায় সিরাজউদ্দৌলা হলে বন্ধু সহকর্মীদের ডেকে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান হতে যাচ্ছে, এই স্বাধীনতা সত্যিকারের স্বাধীনতা নয়। হয়তো বাংলার মাটিতে নতুন করে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু যে ওই সময়েই স্বাধীন বাংলাদেশের কথা ভেবেছিলেন তা আরো জানা যায় ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদা শঙ্কর রায়ের বঙ্গবন্ধুকে করা প্রশ্নের উত্তর থেকে। বঙ্গবন্ধুকে শ্রী শঙ্করের প্রশ্ন ছিল, ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটা প্রথম কবে আপনার মাথায় এলো?’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।’ (ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু, প্রকাশক : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ)।

কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের ভাগের ফর্মুলা মেনে নেয়। এই ভাগের ফর্মুলায় বাংলার অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবসহ বাংলার নেতারা মেনে নিতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজবিনীতে (পৃষ্ঠা ৭৩) লিখেছেন, ‘বাংলা যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা।’ ভারতবর্ষ ভাগের পর শেখ মুজিব, কামরুদ্দীন আহমেদ, তাজউদ্দীন আহমদ, তসাদ্দক আহমেদ প্রমুখের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় গঠিত হয় লীগবিরোধী অসাম্প্রদায়িক সংগঠন পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ।

পাকিস্তান স্বাধীন হলেও তা যে বাঙালিদের হবে না তরুণ ছাত্রনেতা মুজিবের এমন উপলব্ধিই সত্য হলো আট মাসের মধ্যে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই মুসলিম লীগ ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ‘অসামপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তানের রাজনীতি শুরু হলো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। জিন্নাহ যত দিন বেঁচেছিলেন প্রকাশ্যে কেউ সাহস পায়নি। যেদিন মারা গেলেন ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পুরোপুরি প্রকাশ্যে শুরু হয়েছিল।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৭৮)।

তবে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জিন্নাহর স্বরূপটিও উন্মোচিত হয়। মোট জনসংখ্যার ৫৪.৬ শতাংশ মানুষের ভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন তিনি। আসলে এই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল বাঙালিদের ওপর কর্তৃত্ব ফলানো, চাকরির ক্ষেত্রে উর্দুভাষীদের প্রাধান্য দেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে তাদের বঞ্চিত করার কৌশল এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ভারতের সংস্কৃতির অংশ বলে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশের পথ রুদ্ধ করা। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ মাত্র ৭.২ শতাংশ মানুষের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদে বাঙালিরা রাজপথে নামে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে আন্দোলনে শেখ মুজিব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানে তাঁর প্রথম গ্রেপ্তার ছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সচিবালয়ের সামনে ধর্মঘট পালনকালে। ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অনশন ধর্মঘটের ঘোষণা এবং জেল থেকে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়ে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়।

বঙ্গবন্ধু একদিনের জন্যও পাকিস্তান কথাটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলতেন পূর্ব বাংলা, বাংলা। পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘‘স্যার, আপনি দেখবেন, ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে আপনারা এটাকে বাংলা ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা ইতিহাস আছে, আছে ঐতিহ্য।’’ বঙ্গবন্ধু হূদয়ে ধারণ করতেন বাংলাদেশকে। তাঁর আন্দোলন-সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল—বাংলার মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতা। এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ধাপে ধাপে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করেন। স্বাধীনতার আন্দোলন পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগে ২৩ বছর। এই সময়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যোগ হয় গণতন্ত্র, ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার দাবি। স্বাধীনতাসংগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতে বাঙালিদের কতটা কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তা ২৩ বছরের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে বাংলার রাজপথ রঞ্জিত হয়।

লক্ষণীয় যে বাংলার রাজপথ বারবার রঞ্জিত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু আন্দোলন করেছেন গণতান্ত্রিক ধারায়। এটি ছিল রাজনৈতিক কৌশল। এই কৌশল অবলম্বন করেই বঙ্গবন্ধু আন্দোলনকে স্বাধীনতাসংগ্রামে পৌঁছে দেন। আন্দোলন যাতে কখনোই সহিংস রূপ পরিগ্রহ না করে সেদিকে সতর্ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণতান্ত্রিক ধারায় আন্দোলন পরিচালনার কৌশল গ্রহণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু তিনটি অধিকার অর্জন করেন, যা বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম করে। প্রথমত, রাজনৈতিক অধিকার : পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী নানা অজুহাতে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছে। মার্শাল ল জারি করে রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধও করেছে। এ জন্য তিনি রাজনৈতিক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়েছেন গণতান্ত্রিক ধারায়। যে কারণে পাকিস্তানি শাসকরা কখনোই এ আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে অভিহিত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একে সহিংস বা সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, দেশ শাসনের সাংবিধানিক অধিকার : গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকার অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনকে আন্দোলনের কৌশল হিসেবে বেছে নেন। যে কারণে ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়েও সামরিক সরকারের জারি করা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) অধীনে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনী প্রচার চলাকালে এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে শেখ মুজিব বলেন, নির্বাচনের পরে ওই এলএফও আমি ছিঁড়ে ফেলব। তৃতীয়ত, নৈতিক অধিকার : সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেও তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ও ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করলে বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে গ্রেপ্তারের আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার নৈতিক ও আইনগত অধিকার ছিল একমাত্র বঙ্গবন্ধুরই, যা তিনি সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমেই অর্জন করেন।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা (De facto declaration of Independence) দেন। তাঁর ভাষণের প্রতিপাদ্য ছিল—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে প্রথমে মুক্তির কথা বলেছেন এবং পরক্ষণেই বলেছেন স্বাধীনতার কথা। মুক্তি বলতে তিনি বুঝিয়েছেন জনগণের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক তথা সার্বিক মুক্তির কথা। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানি শাসন-শোষণের কবল থেকে মুক্ত করতে হলে একমাত্র ভৌগোলিক স্বাধীনতা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই তাঁর আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২৩ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে সশস্ত্র রূপ লাভ করে। ৯ মাসের রক্তস্নাত যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও বাসসের সাবেক সিটি এডিটর



সাতদিনের সেরা