kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

বাঙালির কোনো বর্ণ থাকতে নেই

আফরিনা ওশিন   

৬ এপ্রিল, ২০২১ ২১:১৬ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



বাঙালির কোনো বর্ণ থাকতে নেই

আফরিনা ওশিন।

বর্ণবাদ বিষয়টি আমরা নিজের অজান্তেই ধারণ করি, পূর্বসূরি থেকে পাওয়া অধিকারের মতো। অথচ বর্ণবাদের বিপক্ষে যারা বলে গেছেন তাদেরকে পূর্বসূরি মানি কয়জন- এটাই কথা। মার্কিন দেশে মার্টিন লুথার কিং বর্ণবাদের বিপক্ষে বলে গিয়েছেন সেই ’৬৩ সালে। কালজয়ী নেতা শেখ মুজিবের সময় ’৭২-এর সংবিধানে বর্ণবাদের বিপক্ষচারণ করা হয়েছে। এত কিছুর পরও এই বিংশ শতাব্দীতে এসে শুনতে হয়, সেই সভ্য দেশেই কাল বর্ণের মানুষ খুন হয়, আমার দেশে কুৎসিৎ দেখতে বলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়। আসলে বর্ণবাদের এদেশ-সেদেশ বলে কিছু নেই। কোনো বর্ডার নেই। বর্ডার গার্ডও নয়। একটা স্বার্থান্বেষীগোষ্ঠীর নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য বর্ণবাদের প্রয়োজনীয়তা অনেকটা জোর করে রাখা হয়েছে। সে কারণেই বর্ণবাদ আর গায়ের রঙের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছড়িয়েছে জাত, ধর্ম, রাজনীতিসহ আরো কত রকমের রূপ ধরে।

ধারণা করা হয়, ভারতবর্ষে বর্ণবাদের শুরু করেছিল আর্য জাতি। তাই বলে কি আর্য জাতির আগমনের আগে বর্ণবাদ ছিল না? সামাজিক স্তরবিন্যাস ছিল। তবে তা বর্ণবাদের নামে ছিল না। ভারতীয়রা জন্মগতভাবেই স্বাধীনচেতা। এ কথা আলাদা যে তারা পূর্ণভাবে স্বাধীনতা পায়নি কখনো। কাছে গিয়ে ছুঁতে না পারার মতো। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ শতক পর্যন্ত সমগ্র ভারতে ব্রাহ্মণ সমাজের প্রতাপ ছিল একচেটিয়া। একসময় উত্তর ভারতের কিছু রাজ্য হঠাৎ করেই প্রতিবাদ করে বসল। তারা গণতন্ত্র চায়। সে সময় থেকে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ শতক পর্যন্ত রাজা গণতান্ত্রিক নিয়মেই নির্বাচিত হতো। অর্থাৎ রাজার ছেলে রাজা, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে- এই বিষয়টা আর থাকল না। এর অর্থ দাঁড়ায়- আর্যরা ৮০০ শতকের আগে যখন জঙ্গল উজাড় করে করে উত্তর-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বে এগিয়ে আসছিল, তখনো বর্ণবাদ নিয়ে কোনো কথা ওঠেনি। তাহলে কখন বর্ণবাদ এলো?

খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ শতকে প্রথম লোহার ব্যবহার শুরু করল আর্যরা। লোহার তৈরি সরঞ্জাম দিয়ে বন উজাড় করে এগিয়ে যাওয়া তখন সহজতর হলো। ফলে কাজের পর অখণ্ড অবসরে বসে দর্শন ও ধর্মচর্চা শুরু করল। সমসাময়িককালেই তাদের গল্পগাথা রূপ নিল মহাভারতে। মহাভারতেই প্রথম চতুর্বর্ণ দিয়ে সামাজিকভাবে মানুষের অবস্থান দেখানো হলো।

মহাভারতে শান্তি পর্বে ভরদ্বাজকে জাতির বৈশিষ্ট্য বোঝাতে গিয়ে ভৃগু বলছেন, “ব্রাহ্মণরা গৌরবর্ণ, ক্ষত্রিয়রা রক্তবর্ণ, বৈশ্যরা পীতবর্ণ, আর শূদ্ররা কৃষ্ণবর্ণ। কিন্তু ভরদ্বাজ এ ব্যাপারে কিছুটা অস্বস্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন- ‘যদি বিভিন্ন বর্ণ, বিভিন্ন জাতি নির্দেশ করে, তবে বলতে হয় সব জাতিই মিশ্র জাতি'।" (১৮৮,৬০)। মানে তত দিনে ভারতে আর কালোবর্ণের দ্রাবিড়রা রইল না মাত্র। আবার গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে কৃষ্ণ স্পষ্টই বলেছেন- 'চাতুবর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্ম্বিভাগশঃ।' অর্থাৎ চতুর্বর্ণ তিনিই সৃষ্টি করেছেন, তবে তা গুণ ও কর্ম অনুযায়ী- ব্রাহ্মণরা বুদ্ধিজীবী, ক্ষত্রিয়রা প্রশাসক, বৈশ্যরা ব্যবসায়ী এবং শূদ্ররা শ্রমজীবী। কথাটা দাঁড়াল এমনবভাবে, গায়ের বর্ণ দেখলেই বোঝা যাবে তার পেশা কী।

মহাভারতের ঘটনা ধরেই খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ শতকে রামায়ণের পথ নির্ধারণ হলো বটে। আর্যরা উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। অর্থাৎ আর্যরা প্রথম সমুদ্রপথ পাড়ি দিল রামের লঙ্কা জয়ের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে ধারণা করে নেওয়া যেতে পারে, বর্ণপ্রথা প্রচলনের পঞ্চাশ থেকে এক শ বছরের মাথায় আর্য জাতি বাংলার মাটিতে পা রেখেছিল। ভারতবর্ষে বর্ণবাদ প্রচলনের শুরু থেকেই বাংলায় এর একটা প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষে পূর্বে দর্শন চর্চায় মানুষকে যেভাবে প্রকৃতির অংশ হিসেবে দেখা হতো, সে বিষয়টি ব্যাহত হলো।

পরবর্তী সময়ে মৌর্য শাসন থেকে শুরু করে অষ্টম শতকে পালবংশের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা আর তার নিজস্ব রূপে ফিরতে পারেনি ।স্বাধীনতা থেকেও হয়েছে বঞ্চিত। পালরাজাদের উদার মনোভাবের কারণে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, শাস্ত্র, লোকাচারে এক ধরনের সহনশীল ও সংশ্লেষাত্মক সমাজব্যবস্থার সূচনা হয়। তবে পাল শাসনামলে বাংলার স্বতন্ত্র সত্তা মূর্ত হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১১০০ শতকের শেষের দিকে তুর্কি আক্রমণ এবং কালক্রমে মুগল ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও হস্তক্ষেপের ফলে বাংলার নিজস্ব সমাজ কাঠামো গড়ে ওঠার যে সূর্যোদয় হয়েছিল পুনরায় তা স্তিমিত হয়।
 
ব্রিটিশ শাসনামলে বর্ণবাদ কতটা প্রোকট ছিল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধীর ওপর তাদের বিরূপ মনোভাব। তা ছাড়া শ্বেতাঙ্গ ও ইউরোপীয় জীবনকে দক্ষিণ এশীয়দের জীবনের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি তো আছেই। ভেরিয়ার এলুইনের লেখা বইতে ব্রিটিশরা ভারতীয়দের জিপসি বলে অভিহিত করেছিল। যারা শুধু সাপের খেলা দেখাতে পারে। সভ্য জগতের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই।  চলে যাওয়ার পরও ভাবখানা এমন যে ভারতীয়দের সভ্য বানানোর দায়িত্ব নিয়েছিল ব্রিটিশ। অথচ বর্ণ ও জাতভেদে কর্মে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রথা ব্রিটিশরা পুনরায় চালু করেছিল, সে ঘটনা প্রাচীন ভারতে তত দিনে ঘটে গিয়ে পুরনোও হয়ে গেছে।
 
১৯০৫ সালে যখন লর্ড কার্জন প্রথমবার বাংলা বিভাগের আদেশ দিলেন, তখন কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল বাংলা অনেক বড়, তাই প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু বাঙালির প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের মুখে সে সময় বাংলাকে না ভাঙলেও ব্রিটিশরা মনের মাঝে পোষণ করে রেখেছিল সেই স্বপ্ন। সে সময় ব্রিটিশের তৈরি তালিকায় নাম উঠানো কিছু স্বার্থান্বেষী অসাধু বাঙালি শাসকও নিজেদেরকে প্রায় ব্রিটিশ ভাবতে শুরু করেছিল। তাদের কারণে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ তখন প্রকটতা লাভ করে ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু তারা যে ব্রিটিশের বলির পাঁঠায় পরিণত হয়েছিল, নিজের অজান্তেই সেই বিষয়টি ঠাওর করেছিল ১৯৫০ সালে জমিদারপ্রথা নির্মূলের সময়। কারণ জমিদাররা ব্রিটিশ প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে প্রজাদের চোখে যারপরনাই নিচে নামিয়েছিল নিজেদের। অবশেষে পূর্ববঙ্গেই প্রথম জমিদারপ্রথা বিলুপ্ত হলো। বলতে গেলে এটিই বর্তমান বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা ভাবমূর্তির প্রথম রূপ।

বাংলা ভাগের দ্বিতীয় চেষ্টায় সফল হয়েছিল ব্রিটিশ। এটিও জাতভেদের কারণকে কাজে লাগিয়েই সম্ভব করেছিল তারা। জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব অনেকাংশেই দায়ী এর জন্য। উনিশ শতকে এসে ব্রিটিশদের প্ররোচনায় হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটলে মুসলমানদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধের সৃষ্টি হয়। এর পেছনে আরেকটি সূক্ষ্ম কনসপিরেসি ছিল জিন্নাহ আর নেহরুর মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। কিন্তু তা প্রকাশ পেয়েছে জাতভেদের নাম ধরে। এতে করে ব্রিটিশদের অক্ষমতা ঢাকা দেওয়ার খুব সুবর্ণ সুযোগ এলো। ধর্মের দোহাই দিয়ে বাংলাকে ভাগ করা হলো।

দ্বিজাতিতত্ত্ব যে শুধু হিন্দু-মুসলিম জাতিকে ভাগ করল তা নয়, পরবর্তীকালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের বুকে প্রথম যে আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল, তা ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। এবারও বাঙালির সম্মুখে কঠিন পরীক্ষা। তবে অধিকার আদায় করেই ছাড়ল। বাংলা আবার তার নিজস্বতায় ফিরবে বলে জানান দিল। কিন্তু পরবর্তী সময়গুলোয় আমরা দ্বিজাতিতত্ত্ব থেকে মুক্তি পেলাম কি?

১৯৬৩ সালে মার্কিন বর্ণবাদবিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের সাড়া জাগানো ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'আমরা আমাদের স্বাধীনতার তৃষ্ণাকে তিক্ততা এবং ঘৃণার পেয়ালা থেকে নিবারণ করব না। আমাদের সৃজনশীল প্রতিবাদকে শারীরিক আক্রমণে পরিণত করব না। আমরা বারংবার শারীরিক শক্তির সাথে আত্মিক শক্তির মিলন ঘটাব।' সেই একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নির্বিচার অনাচার সহ্য করছিল শুধু নিজেদের স্বতন্ত্রতাকে জাগিয়ে তুলতে। যেখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতভেদের কোনো সুযোগ নেই। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে বাংলা ভাষা আর বাঙালি জাতি প্রতিষ্ঠার জন্য।

বাঙালির এত সব ত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। ১৯৭১-এর যুদ্ধ পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ধর্মযুদ্ধ ছিল বললে ভুল বলা হবে না। লিঙ্গ পরীক্ষা করে যদি হিন্দু-মুসলিম যাচাই করা হয়, তাহলে তাকে ধর্মযুদ্ধ বা বর্ণযুদ্ধ না বলে আর কী-ই বা বলা যায়। এই ধর্মযুদ্ধ থেকে আমরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের মুক্তির পথ খুঁজে নিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু জিন্নাহর প্রথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজ তত দিনে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁথে গেছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধ এবং এর পরবর্তী সময়ে বড় অঙ্কের হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল। ১৯৫১ সালে যে আদমশুমারি হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর ২২ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে এ সংখ্যা নেমে আসে ১৪ শতাংশে। আর সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এটা নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে- মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হিন্দু জনগোষ্ঠী দেশছাড়া হলো কেন? 

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাদেশের সংবিধানে যে সংশোধন হয়েছিল তার তৃতীয় ভাগটি ছিল মৌলিক অধিকার নিয়ে। আলোচনার সুবিধার্থে অংশটি তুলে ধরছি-

ধর্ম, প্রভৃতি কারণে বৈষম্য

২৮। (১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। 

(২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।

(৩) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।

(৪) নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

শেখ মুজিব দেশ গড়বেন, মানুষ তা কামনা করেছিল। কিন্তু তত দিনে পাকিস্তান তাদের অনুসারীদের বড় একটা সংখ্যা বাংলায় ভূমিষ্ঠ করে গেছে। তাদের নিবারণ না করে মহৎ উদ্দেশ্যে দেশ গড়ার লক্ষ্যে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন মুজিব। তবে বিষধর সাপের বিষ কতটা নির্মম হতে পারে সেই প্রমাণ আমরা পেয়েছি ’৭৫-এর ১৫ই আগস্টে। এরপর দেশ থেকে হিন্দু বিতাড়িত করা খুব সহজ হয়েছিল সেই বিষধরদের জন্য। 

শেখ মুজিব শুধু নামমাত্র নেতা হয়ে থাকেননি। নিজের সাহসিকতার চরম পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাঁকে আজীবন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। কারণ তাঁর কাছে নিছক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাটা প্রাধান্য পায়নি। সে জন্যই তিনি সব মানুষের নেতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। অথচ বিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের সংবিধান হয়ে গেল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের। বাংলাদেশ সফল হলো না। পুনরায় সফল হলো জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব। এই সফলতা এনে দিল তারই রেখে যাওয়া অনুচরেরা। যেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, উপজাতিগোষ্ঠী নির্যাতিত হচ্ছে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও।

আমাদের দেশে ভেদাভেদগুলো গায়ের রঙে আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যখন দেখি গরিবের ঘর থেকে উঠে আসা কালো বর্ণের ছেলেটি শিক্ষক ও সহপাঠীদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাঙালির আন্দোলনের মূল তোরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আঙুল তুলে দেখাতে গিয়ে আত্মহত্যা করে।  না, আমাদের শিক্ষকদের তাতে লজ্জা হয় না। কারণ তারা তাদের কার্যকলাপে বুঝিয়ে দিচ্ছে '৭১-এ শেষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো দায় নেই। সুতরাং মানবিক বা মূল্যবোধ শিক্ষা প্রচারের আর কোনো প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেন না।

এখনো কন্যাশিশুকে ড্রেনের পাশে ফেলে রেখে যায়। কিন্তু তার কোনো সুবিচার বা তদন্ত হয় না। কালো মেয়েকে বিয়ে দিতে যৌতুক দিতে হয়। মেয়েরা আজ যতই প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, তাদের গায়ের বর্ণ দিয়েই তারা বিবেচিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন। তিনি ১৯৯৯ সালে এ নিয়ে একটি গবেষণাও করেছেন। সেই গবেষণার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ফলোআপ গত দুই দশকেও হয়নি। কাবেরী গায়েন বলেন, ‘পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আমার বিবেচনায় আরো খারাপ হয়েছে।’ তিনি তখন চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত ৪৪৬টি বিয়ের বিজ্ঞাপনের ওপর এ গবেষণা করেন। বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে ২২০টিতে, অর্থাৎ ৪৯.৩২ শতাংশে সরাসরি পাত্রীর গায়ের রং ফর্সা উল্লেখ করা হয়। মাত্র ১৩টি বিজ্ঞাপনে পাত্রীপক্ষ পাত্রীর শ্যামলা রঙের কথা উল্লেখ করেছে। সুন্দরী, প্রকৃত সুন্দরী, অসামান্য রূপসী, রূপসী, অপূর্ব সুন্দরী- এ ধরনের বিশেষণ ব্যবহার করে সৌন্দর্যকে বিজ্ঞাপিত করা হয়েছে ২২২টি বিজ্ঞাপনে। অর্থাৎ ফর্সার চেয়েও বেশি ৪৯.৭৬ শতাংশ বিজ্ঞাপনে। নারীর সৌন্দর্য গায়ের বর্ণেই ঠেকে আছে। এগোবার পথ দেখালে কুচক্রান্তকারীদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে নিজের নিরপেক্ষ রূপে ফিরতে পারেনি। এর পেছনে জোঁকের মতো লেগে আছে বর্ণবাদ আর জাতভেদ। প্রতিটি অধিকার আন্দোলনের পেছনে যেকোনোভাবেই বর্ণবাদকে কাজে লাগিয়েছে প্রতিপক্ষ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োজন নেই বর্ণবাদের নাম উচ্চারণ করার। কিন্তু বর্ণবাদ আলোচনায় না থাকলে সামাজিক স্তর থাকবে না। চলবে না ত্বক উজ্জ্বল করা প্রসাধনীর ব্যবসা। চলবে না ধর্ম ব্যবসা। এত কিছু না চললে আমরা সাধারণ মানুষ কিন্তু ক্ষতির সম্মুখীন হব না। ক্ষতি হবে অসৎ ব্যবসায়ীদের। আমাদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনা করা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা আমরা নিজেরাও আন্দাজ করতে পারছি না। 

আজ সারা বিশ্বে করোনার চেয়েও বড় মহামারি বা গুপ্তরোগ বর্ণবাদ। সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে, এখনো কোনো আন্দোলন বা আইন একে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। বিশ্বের এক দেশে বন্ধ হচ্ছে তো অন্য কোনো প্রান্তে, হয়তো অন্য কোনো দেশে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আজও লুথার কিংয়ের দেশ আমেরিকার পথে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বর্ণবাদবিরোধী মানুষের সারি। মুজিবের দেশে কালো বর্ণের মেয়েটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ম্যান্ডেলার দেশের কালো ছেলেটি পকেটে টাকা থাকলেও ইউরোপের হোটেলের পাশের ফুটপাতে শুয়ে রাত কাটায়। 

শেখ মুজিব বিশ্বনেতা হয়েছিলেন। এরপর বড় হৃদয়ের নেতা আমরা আর পাইনি। যিনি জনসমুদ্রেও সাদা পাঞ্জাবি আর কালো কোট পরেও ধর্ম-বর্ণের বিপক্ষে বলতে জানতেন। ফেরাতে পারতেন বর্ণহীন রঙে রঙিন সমাজ।

লেখক-
আফরিনা ওশিন
শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা