kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি ও ঢিলেঢালা লকডাউনে সংক্রমণ বাড়বে

মো. শাহ জালাল মিশুক

৬ এপ্রিল, ২০২১ ১২:১৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি ও ঢিলেঢালা লকডাউনে সংক্রমণ বাড়বে

লকডাউন কথাটা বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালীন এই শব্দটা বেশি প্রচার পেয়েছে। লকডাউন এর শাব্দিক অর্থ তালাবদ্ধ করে দেয়া। শব্দটির ব্যাখ্যায় ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, কোনো জরুরি পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোনো জায়গা থেকে বের হতে না দেয়া কিংবা ওই জায়গায় প্রবেশ করতে বাধা দেয়াই হলো ‘লকডাউন।’ এছাড়া অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, জরুরি সুরক্ষার প্রয়োজনে কোনো নিদিষ্ট এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করাই ‘লকডাউন'। তবে ‘লকডাউন’ শব্দটির সরল বাংলা ‘অবরুদ্ধ’ কিংবা ‘প্রিজনে রাখা’। 

বাস্তবিকভাবে করোনাকালীন লকডাউন কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নয়। এটা প্রশাসনিক বা আইনগত বা সরকারি ব্যবস্থা। এর মানে হলো বিমান বন্ধ, সীমানা বন্ধ ও চলাচল বন্ধ। এটা পুরোপুরি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, নাগরিকের স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত নয় অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ যা বলবে, জনগণের তা শুনতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনার প্রকোপ ফের বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করে দিল বাংলাদেশ সরকার। গত ৫ এপ্রিল থেকে ৭ দিনের জন্য লকডাউনের আওতায় বাংলাদেশ, ঘোষণা করল সরকার। প্রতিবেশী দেশ ভারতে যেখানে সংক্রমণ আটকাতে নাইট কারফিউ ও জায়গায় জায়গায় আংশিক লকডাউন করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ আগে থেকেই সম্পূর্ণ লকডাউনের রাস্তায় চলে গেল। তবে দেশের অর্থনীতি যাতে থমকে না যায়, তার জন্য কলকারখানা আগের মতোই চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জরুরি পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলিও খোলা থাকবে। 

গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দৈনিক শনাক্তের রেকর্ড সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। গত বছর ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর এই প্রথম একদিনে এতো বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হল। এই রেকর্ড পরিমাণ আক্রান্তের সংখ্যাসহ বাংলাদেশে গত ৪ এপ্রিল পর্যন্ত মোট কভিড-১৯ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৪ জন। আর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯ হাজার ২৬৬ জন। অন্যদিকে, সুস্থতার হার কিছুটা কমে এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৫২ হাজার ৪৮২ জন। বাংলাদেশের চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাসপাতালগুলোতে যেভাবে কভিড আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়ছে, তাতে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা সেবা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

গত বছর লকডাউন ও সাধারণ ছুটির সময় গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিষ্ঠুর অবস্থার কথা হয়তো আমরা কেউ-ই ভুলিনি। কর্তৃপক্ষ একবার তাদের বাড়ি থেকে ঢাকায় এনেছে, আবার অল্প সময়ের ব্যবধানে বাড়ি পাঠিয়েছে। এবার সরকার আগ থেকেই সবকিছু সুনির্দিষ্ট করে দিচ্ছে। এবার লকডাউনেও গার্মেন্টস, শিল্প-কারখানা খোলা থাকবে; ব্যাংক-শেয়ারবাজারও চালু থাকবে। পাশাপাশি যথারীতি খোলা থাকবে জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, কাঁচাবাজর। অতি জরুরি কাজ ছাড়া কেউ যাতে বাইরে ঘোরাঘুরি করতে না পারে, সে ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কেউই বাসা থেকে বেরুতে পারবেন না। তবে বইমেলা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত পুরো লকডাউনকেই হাস্যকর করে তুলতে পারে। মানুষ ঘর থেকে বেরুতে না পারলে বইমেলায় যাবে কীভাবে? পাশাপাশি এবার লকডাউনের প্রথম দিনে দেখা গেছে, ঢাকার রাস্তায় গাড়ির জ্যাম ও বাইরে মানুষের বেপরোয়া ঘোরাঘুরি।

পাশাপাশি লকডাউনের প্রজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যবিধি মানার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা উপেক্ষিত হচ্ছে এবং শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই থেকে যাচ্ছে। এটা এদেশের মানুষের অভাবে স্বভাব নষ্টের মতো অবস্থা। কেনাবেচা করা কিংবা ব্যাংকিং সেবা নিতে গিয়ে তাদের ভেতর সামাজিক দূরত্ব না মানার আচরণ লক্ষ্য করা যায়। গত ১ বছর যাবত অফিসের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে সেখানে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার যে দরকার নেই এটাই বোঝানো দরকার মানুষকে। পাশাপাশি লকডাউনের প্রজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যবিধি মানার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা উপেক্ষিত হচ্ছে এবং শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই থেকে যাচ্ছে। এটা এদেশের মানুষের অভাবে স্বভাব নষ্টের মতো অবস্থা। কেনাবেচা করা কিংবা ব্যাংকিং সেবা নিতে গিয়ে তাদের ভেতর সামাজিক দূরত্ব না মানার আচরণ লক্ষ্য করা যায়। গত ১ বছর ধরে অফিসের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে সেখানে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার যে দরকার নেই এটাই বোঝানো দরকার মানুষকে। পাশাপাশি লকডাউনের প্রজ্ঞাপনে স্বাস্থ্যবিধি মানার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা উপেক্ষিত হচ্ছে এবং শুধুমাত্র কাগজে-কলমেই থেকে যাচ্ছে। এটা এদেশের মানুষের অভাবে স্বভাব নষ্টের মতো অবস্থা। কেনাবেচা করা কিংবা ব্যাংকিং সেবা নিতে গিয়ে তাদের ভেতর সামাজিক দূরত্ব না মানার আচরণ লক্ষ করা যায়। গত ১ বছর যাবত অফিসের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে সেখানে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার যে দরকার নেই এটাই বোঝানো দরকার মানুষকে। বাংলাদেশে মরনঘাতি করোনাপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হয়েছে প্রায় দুই মাসের মতো হয়ে গেল। শুরুতে ভ্যাকসিন নিয়ে অনেক ভীতি-গুজব থাকলেও পরে সেটা অনেকাংশেই দূর হয়ে যায়। অনেকেই ব্যপারটি সিরিয়াসলি নিয়ে ভ্যাকসিন নেয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভ্যাকসিন নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ও সচেতনতার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই বেশ অজ্ঞ। 
কিন্তু কভিড-১৯ পুরোপুরি প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের দুটো কাজের কোনো বিকল্প নেই। এক. কাগজে-কলমে নয় বরং বাস্তবিকভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মানা; দুই. ভ্যাকসিন নেয়া। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এ দুটোর কোনোটাই আমরা যথার্থভাবে করছি না। একজন সুনাগরিক হিসেবে আমরা প্রত্যেকে যদি নিজের অবস্থান থেকে এই ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করি এবং  সচেতন থাকি। তাহলে করোনা রুখে দেয়া যে সম্ভব সেটা মনে হয় বিগত এক বছরে আমরা সবাই জেনে গেছি।

মোদ্দকথা হলো, বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি বিরাজমান সেটাকে যেকোনো মূল্যে কমাতে হবে অর্থাৎ, এক কথায় বলা যায় করোনাডাউন করতে হবে। নতুবা বিশ্বের অন্যান্য মহামারী আক্রান্ত দেশের মতো হয়তো বাংলাদেশেও লাশের ওপর লাশ রাস্তাঘাটে পড়ে থাকবে এবং আক্রান্ত রোগীদের মরণ কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে যাবে। কিন্তু কারো কিছুই করার থাকবে না। গতবছর সরকার ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বৈশ্বিক মহামারী আমরা যেভাবে অনেকাংশেই প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছি, সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ও জোড়ালো লকডাউন এবং জনগণের কাগজে-কলমে নয়, বরং বাস্তবিকভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এবারও মহামারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সফল হওয়া সম্ভব।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা