kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

[মিলেমিশে থাকি মোরা]

মাছের সওদাগর জেরিন

অনলাইন ডেস্ক   

১৬ মার্চ, ২০২১ ০৯:৩৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাছের সওদাগর জেরিন

এ দেশের নদী-পুকুর-হাওর-বাঁওড়-বিলে মেলে অনেক মাছ। তাইতো ওই কথাটা—মাছে-ভাতে বাঙালি। এখানকার মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ষাট শতাংশ আসে মাছ থেকে। হোসনে আরা কলি ও মোহাম্মদ আসাদ দেখা পেয়েছিলেন জেরিন হান্নানের। জেরিন একজন মাছ বিক্রেতা। মাত্র ৯ মাসে বিক্রি করেছেন ৫০ লাখ টাকার মাছ।

খুলনায় বড় হয়েছেন জেরিন। বিবিএ, এমবিএ করেছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষকতা করছেন দেশের খ্যাতনামা একটি ইংরেজি মাধ্যম (ইংলিশ মিডিয়াম) স্কুলে। স্বামীর সঙ্গে কিছুকাল থেকে এসেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। ফিরে এসে ২০১৮ সালে চাঁদপুরে যেতে হলো স্বামীর চাকরিসূত্রেই। তাঁর মাছের গল্পের শুরু ওই চাঁদপুর থেকেই।

আগ্রহ বাড়ল
পানি, মাছ, জেলে, জালে জড়িয়ে পড়লেন জেরিন চাঁদপুর গিয়ে। মুগ্ধ হয়ে গেলেন এত এত রকম মাছ দেখে। স্বামীর সঙ্গে জেলেদের মাছ ধরাও দেখেছেন। মাছের আড়তে গিয়ে বসে থেকেছেন অনেকবার। জেলেপল্লীতেও গিয়েছেন। খোঁজ নিয়েছেন জেলেদের খাওয়াদাওয়া, কাপড়চোপড় ও পড়ালেখার। আরো পরে তিনি ভাবলেন, আমাদের দেশে অনেক পণ্যেরই ব্র্যান্ড আছে; এমনকি মসলা-মাংস, চাল-ডালেরও আছে। নেই শুধু বুঝি মাছের! আর এই ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তাও কম। সেই থেকে জেরিন ক্রেতার কাছে মাছ পৌঁছে দেওয়ার কথা ভাবলেন। কিন্তু বড় একটি সমস্যা আছে—মাছ দ্রুত পচনশীল। সেটা তাজা ঘরে ঘরে পৌঁছানোর উপায় খুঁজতে লাগলেন। এই সঙ্গে যুক্ত হলেন উইম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই) নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে। এখানে দেখলেন অনেক নারী উদ্যোক্তা। কেউ খাবারের, কেউ পোশাকের, কেউ বা কসমেটিকসের ব্যবসা করছেন। মাছ ব্যবসায়ী নগণ্য। এর মধ্যে আসে করোনা। প্রথম কয়েক দিন পরিস্থিতি দেখলেন। তারপর বুঝলেন সবাই যেহেতু লকডাউনে, এখনই মাছ পৌঁছে দেওয়ার উপযুক্ত সময়। গেল বছরের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে ফেসবুক পেইজ মাছের হাট-বাজার। প্রথম দিন ফরমায়েশ পেয়েছিলেন ১৭ কেজির। দিনকয়েক পর থেকে গড়ে ৩০-৪০ কেজির অর্ডার পেতে থাকলেন।

কী কী মাছ
জেরিনের সবই দেশি মাছ। তবে চাঁদপুরের টাটকা ইলিশ দিয়েই তিনি বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। সেই সঙ্গে আছে শোল, পাবদা, পোয়া, বাইম, বেলে, বোয়াল, রুই, পাঙ্গাশ, কাতলা, আইড়, বাঘাইড়, কই, শিং, তেলাপিয়া ইত্যাদি। যাঁর প্রয়োজন তিনি পেইজে গিয়ে ফরমায়েশ দিতে পারেন। দুই কেজির নিচে ফরমায়েশ দেওয়া যায় না। পরদিনই চাঁদপুর থেকে নিয়ে এসে পৌঁছে দেওয়া হয় ক্রেতার হাতে। চাঁদপুর থেকে ঢাকায় মাছ পৌঁছানোর সময় ধরা হয় চার বা সাড়ে চার ঘণ্টা। প্রিমিয়াম সার্ভিস চালু করা হয়েছে আরো ৩১টি জেলায়। দুইভাবে পৌঁছানো হয়ে থাকে—একটি হলো আস্ত মাছ, অন্যটি ‘রান্নার জন্য প্রস্তুত’। পরেরটির জন্য অবশ্য আলাদা সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। 

ক্রেতা যাঁরা
মিঠাপানির মাছ যাঁরা পছন্দ করেন তাঁরাই মূলত মাছের হাট-বাজারের ক্রেতা। তাঁদের বেশির ভাগই শহরবাসী। কিছু ক্রেতা থাকেন প্রবাসেও। তাঁরা ফরমায়েশ দেন আপনজনদের জন্য; সেসব স্বজনের জন্য যাঁরা থাকেন দেশে। সব মিলিয়ে মাছের হাট-বাজারে প্রবাসী ক্রেতা আছেন ৩২ জন। মাছ পছন্দ না (পচা বা খুঁত বা অন্য কোনো উপযুক্ত কারণে) হলে সরবরাহকারীর (ডেলিভারিম্যান) উপস্থিতিতে মাছের ছবি বা ভিডিও তুলে পাঠাতে হয়। খুঁত মিললে মাছ ফেরত আনা হয় আর পরের দিন কোনো চার্জ ছাড়াই নতুন মাছ পাঠানো হয়।  

হ্যাঁ, একটু চ্যালেঞ্জ ছিল
‘আমি একজন নারী। আমাদের সমাজ সেভাবে প্রস্তুতও নয়। উপরন্তু মাছের ব্যবসা! তবে পরিচিতদের বেশির ভাগের কাছ থেকেই উৎসাহ পেয়েছি। বড় কথা হলো, আমি চাইতাম যেন আমি পারি। তাই পেরেছি। উই আমাকে অনেক ক্রেতা দিয়েছে। এটা সত্যি যে অল্প সময়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে গেছে মাছের হাট-বাজার। এর বড় কারণ আমরা ফাঁকি দিতে চাইনি।’ বলছিলেন জেরিন হান্নান। এখন হাট-বাজারে আটজন কর্মী। তাঁরা মাছ সংগ্রহ, মাননিয়ন্ত্রণ, কাটাকুটি, প্যাকেট করা ইত্যাদি কাজ করেন। সরবরাহের কাজও করেন কেউ কেউ। জেরিন নিজেও ক্রেতাদের বাড়ি বাড়ি যান। সঙ্গে রাখেন উপহার। ক্রেতার ভালো লাগায় তিনি আনন্দ অনুভব করেন।



সাতদিনের সেরা