kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

লড়াই জারি আছে

মথুরার ভাষা

অনলাইন ডেস্ক   

৯ মার্চ, ২০২১ ০৮:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মথুরার ভাষা

‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক-২০২১’ পেয়েছেন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার মানুষ। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক-

গ্রামে কোনো হাই স্কুল ছিল না। তাই পঞ্চম শ্রেণির পর খাগড়াছড়ি সদরে যেতে হলো মথুরাকে। সেটা ১৯৮৫ সাল। শহরে গিয়ে প্রথম ধাক্কা খেলেন ভাষা নিয়ে। মাতৃভাষা ককবরক ছাড়া যে আর কিছুই বুঝতেন না। একসময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন মথুরা। ইতিহাস পড়তে। সেখানে লড়াইটা জমল আরো। বই-পত্র সব বাংলা, নয়তো ইংরেজিতে।

কাজে নেমে পড়লেন

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই জাবারাং কল্যাণ সমিতি নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হলো। তখন ‘উপজাতীয় শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা’র বিষয়টি সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০২ সাল থেকে শিক্ষা নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। দেখলেন পাহাড়ি শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের অন্যতম বাধা হলো ভাষা। দেখলেন ত্রিপুরা ভাষায় লিখিত সাহিত্য খুব বেশি নেই। ভালো অভিধানও নেই। তাই শুরুতেই লিখে ফেললেন, ‘ককবরক শব্দ ভাণ্ডার’। এটি মূলত বাংলা, ইংরেজি শব্দার্থসহ ককবরক শব্দমালার বই। বেশি টাকা ছিল না বলে অভিধানটি ছোট আকারে নিজের টাকায়ই প্রকাশ করলেন। পরে অবশ্য ২০১১ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃৎতিক ইনস্টিটিউট বইটি বড় করে প্রকাশ করে।

কাজ চলল

২০০৬ সালে সেভ দ্য চিলড্রেন এবং জাবারাং কল্যাণ সমিতি যৌথভাবে চাকমা, মারমা ও ককবরকে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ‘মাতৃভাষা-আশ্রয়ী বহুভাষিক শিক্ষা’ কার্যক্রম শুরু করে। পরে এই ব্যবস্থা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হয়। এরপর একে একে ইউএনডিপি, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইউনেসকো জাতীয় কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় মথুরা বিষয়সংশ্লিষ্ট নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছেন। 

এবার রিসার্চ ইনস্টিটিউট

ককবরক রিসার্চ ইনস্টিটিউট একটি ভাষাবিষয়ক সংগঠন। মূলত ককবরক প্রমিতকরণ, ককবরক বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ককবরকে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ইত্যাদি কাজ করে থাকে সংগঠনটি; আর তা দেখভালের কাজ করে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের ভাষা কমিটি, যেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৮ সালে। এত সব কাজের মধ্যেও মথুরা লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। ত্রিপুরা ভাষায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির জন্য বই লিখেছেন। লিখেছেন শিশুতোষ গল্প, ছড়া, প্রবন্ধের মতো সৃজনশীল বইও। একক ও যৌথভাবে লেখা মোট বইয়ের সংখ্যা ৩০টি। আর সম্পদিত সাময়িকীর সংখ্যা প্রায় ৭০টি।

দেশের বাইরেও

মাতৃভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা বিষয়ে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ বক্তৃতা দিয়েছেন। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন ভারতের ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ফিলিপাইনের ইউপি বাগিও, ইন্দোনেশিয়ার গানেশা ও উদায়ানা ইউনিভার্সিটিতে। মথুরা বললেন, ‘দেশের বাইরে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় বাদে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজিতেই কথা বলতে হয়েছে। অনেক সময় মনে হয়েছে—যা বলতে চেয়েছি, ইংরেজিতে তা মন খুলে বলতে পারিনি।’ থাইল্যান্ডে বহুভাষিক শিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন মথুরা।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় শিক্ষাবিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির একজন সদস্য মথুরা। ২০১৪ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় এমএলই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি কর্তৃক গঠিত ভাষাভিত্তিক (ককবরক) লেখক প্যানেলের টিম লিডার হন। টিম লিডার হিসেবে নিজের মাতৃভাষায় শিখন-শেখানো উপকরণ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

 

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অনুবাদ করছেন

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে চাকমা, মারমা, ককবরক, সাদরি ও গারো ভাষায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি অনুবাদ করা হয়েছে। ককবরক ভাষায় অনুবাদটি করেছেন মথুরা।  বললেন, ‘‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ পুরোটাই একটি রাজনৈতিক দর্শন। তাই এটি আর দশটি সাধারণ অনুবাদকর্মের চেয়ে আলাদা। ভাষণের প্রতিটি শব্দকে বারংবার নানাভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছি, বিশেষ করে দুটি জায়গায় অনেক সময় নিয়ে কাজ করেছি। প্রথমটি হলো ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—এই বাক্যে।  ‘মুক্তি’ এবং ‘স্বাধীনতা’ সাধারণভাবে একই অর্থ প্রকাশ করে। তবে আমার বিশ্লেষণ বলে, বঙ্গবন্ধু শব্দ দুটিকে সচেতনভাবেই আলাদা আলাদাভাবে বলেছেন। আসলে তো মুক্তির পরিসর অনেক বড়। দ্বিতীয়টি হলো ‘জয় বাংলা’। বুঝলাম, দেশের স্বাধীনতার জন্য যে মন্ত্রটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে, সেটি কোনো ভাষায়ই অনুবাদ করা ঠিক নয়। তাই এই শব্দযুগলকে অনুবাদ করিনি। ‘জয় বাংলা’ই রেখেছি।’’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা