kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ চৈত্র ১৪২৭। ১৩ এপ্রিল ২০২১। ২৯ শাবান ১৪৪২

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অবলম্বনে

বাংলাদেশে নারীবাদীদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় কেন?

অনলাইন ডেস্ক   

৮ মার্চ, ২০২১ ১৬:১২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশে নারীবাদীদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় কেন?

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বজুড়েই 'নারীবাদ' নামে একটা বিষয় চলে আসছে। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও অনেকের মধ্যে নারীবাদ এবং নারীবাদের চর্চাকারীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। অনেকেই একে পুরুষ বিদ্বেষ বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু নারীবাদ মানে কি আসলেই পুরুষ বিদ্বেষ? আর এই নেতিবাচক ধারণাগুলোই আসলে কেন এলো?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, বাংলাদেশে নারীবাদ সম্পর্কিত নানা ধরণের ভুল ধারণা আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, নারীরা শার্ট-প্যান্ট পরবে, নারীরা ছোট চুল রাখবে, সিগারেট খাবে, নারীরা পুরুষ বিদ্বেষী, নারীরা পরিবার বিদ্বেষী, বিয়ে বিদ্বেষী অন্যতম। এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, নারীবাদকে আসলে নারী-পুরুষসহ সব ধরণের বিষয় থেকে আলাদা করে দেখা হয়।

এর আরেকটি ধারণা হচ্ছে, অনেকেই এটাকে মনে করেন যে, নারীবাদ হচ্ছে একটি পশ্চিমা জ্ঞান। তিনি বলেন, নারীবাদকে পুরুষ বিদ্বেষী বলার মধ্য দিয়ে এক ধরণের লেভেল তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয় যে, যারা নারীবাদী তারা আসলে পুরুষতান্ত্রিকতার বিপক্ষে নয় বরং পুরুষদেরকে বিপক্ষ হিসেবে দেখে। এই ভুল ধারণাগুলো যত বেশি চর্চিত থাকবে, তত বেশি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাটাই আরো জেঁকে বসবে। নারীবাদীদের বিষয়ে পুরুষতান্ত্রিক এক ধরণের "অচ্ছুৎ ভাব" আছে বলে মন্তব্য করেন ড. জোবাইদা নাসরীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. উম্মে বুশরা ফাতেহা সুলতানা বলেন, নারীবাদ নিয়ে যে ধারণার কথাগুলো শোনা যায় তার সবগুলোর সাথেই শুধু নারীরাই জড়িত। মনে হতে পারে যে, নারীবাদ মানেই নারী। আসলে তা নয়। পুরুষরাও নারীবাদী হতে পারে। এগুলো ভুল ধারণা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে করেন ড. সুলতানা।

নারীবাদ কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, নারীবাদ হচ্ছে লিঙ্গ আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রশ্ন তোলা। নারীবাদের মূল লক্ষ হলো নারী-পুরুষসহ সব ধরণের লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, এখানে একটি জিনিস খেয়াল রাখতে হবে। সেটা হচ্ছে পুরুষকে পুরুষতন্ত্রের সাথে এক করে ফেলা যাতে না হয়। পুরুষ আর পুরুষতন্ত্র এক নয়। পুরুষ মানেই যেমন পুরুষতান্ত্রিকতা নয়, তেমনি নারীবাদ মানেই পুরুষ বিরোধিতা নয়। নারীরা যেমন নারীবাদী হতে পারে, তেমনি পুরুষরাও নারীবাদী হতে পারে।

তিনি বলেন, নারীবাদ শুধু নারী বা পুরুষের অধিকারেরই যে সমতা চায় তা নয়। বরং নারীবাদে সম্প্রতি যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকারের সমতা বিধান যা ট্রান্স-ফেমিনিজম হিসেবে পরিচিত। নারীবাদ মানে হচ্ছে, সব লিঙ্গের মধ্যে জারি থাকা অসমতা ও বৈষম্যগুলো রয়েছে বা আলাদা করে দেখার ধরণগুলোকে নিয়ে প্রশ্ন করা এবং এগুলো যতভাবে যত দ্রুত কমিয়ে আনা যায় সেটা নিয়ে কাজ করে। পুরুষের মতো নারীদেরও সমান অধিকারের পক্ষে কাজ করে নারীবাদ।

নারীবাদীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা কেন?
নারীবাদীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরণের নেতিবাচক ধারণার জন্য নানা রকম কারণ রয়েছে বলে মনে করেন ড. জোবাইদা নাসরীন। তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে জেন্ডার বা লৈঙ্গিক সমতা নিয়ে ধারণা খুব বেশি স্পষ্ট নয়। ধারণা করেই নেয়া হয় যে, নারীরাই শুধু পুরুষতন্ত্রের শিকার হয়, কিন্তু আসলে তা নয়। পুরুষরাও পুরুষতন্ত্রের শিকার হয়। পুরুষতান্ত্রিক দাপট যেখানে থাকবে, সব লিঙ্গের মানুষেরাই সেখানে কম বেশি শিকার হবে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এখন অনেক সময়ই জানা যায় যে, পুরুষরাও ধর্ষণের শিকার হন, যৌন নিপীড়নের শিকার হন, কিন্তু তারা সেটি বলছেন না পৌরুষদীপ্ততার কারণে। কোন পুরুষ যদি তার যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা অন্যের সাথে শেয়ার করেন, তাহলে সমাজের চোখে তিনি হয়ে পড়বেন দুর্বল পুরুষ, সমাজের চোখে তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা হবে এবং তাকে 'হাফ-লেডিস' বলা হবে- এসব কিছুই পুরুষতান্ত্রিক এক ধরণের বুলিয়িং। তাকে বুলিয়িংয়ের শিকার হতে হয়। আর এসব কারণেই একজন পুরুষ নিপীড়নের শিকার হলেও তা বলতে চান না।

নিপীড়নের কথা বলতে না পারার যে বড় খাঁচাটি, এই খাঁচার নামই পুরুষতন্ত্র। এই খাঁচা থেকে বের হওয়ার যে অভিপ্রায়, সেটিই হচ্ছে নারীবাদ। পুরুষতন্ত্র চায় না যে, লৈঙ্গিক সমতা আসুক। কারণ তাহলে পুরুষতন্ত্রের আরাম, আয়েশ, দাপটের জায়গা বা দমন নিপীড়নের কৌশল সেটি অনেকাংশেই কমে যাবে। ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, 'আমাদের দেশে নারীবাদের বিষয়টা হয়ে যাচ্ছে কি, যে আমরা যখন আমাদের পারিপার্শ্বিকতা, আমাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি আমাদের বাস্তবতা- এগুলোকে নিরিখে না রেখে, এগুলোকে আমলে না নিয়ে, যখন হঠাৎ করে নারীবাদী চর্চাকে সামনে আনতে চেষ্টা করি তখনই মানুষকে ভুল ধারণা দেয়ার বা মানুষ ভুল বোঝার একটা অবকাশ থাকে।'

তার মতে, এ কারণেই এখনো নারীবাদ ড্রয়িংরুমের আলোচনার বিষয়, নারীবাদ অনেক বেশি উচ্চমার্গীয় বিষয়, উচ্চশিক্ষিত মানুষের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে বলেন যে, 'লোক দেখানো নারীবাদী'। এ শব্দগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক বেশি পরিচিত এবং প্রচলিত। একজন নারী হয়তো সিগারেট খেতে খেতে ছবি দেন বা শর্ট ড্রেস পরেন এবং বলেন যে তিনি নারীবাদী, তাহলে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। নারীবাদীরা মনে করেন, বাংলাদেশে পুরুষরা নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা প্রকাশ করলে তাদের দিকেও উল্টো আঙুল তোলা হয়।

বাংলাদেশের যে খেটে খাওয়া নারী যিনি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন, অন্যের বাড়িতে খেটে খাচ্ছেন যাদের জন্য নারী দিবসের সূচনাও, সেই শ্রমিকের রাজনীতি যদি বুঝি, শ্রমিকের সমতার জায়গা যদি বুঝি, তার শ্রমকে ঘিরে যদি টাকা উপাজর্নের মধ্য দিয়ে যদি অর্থনৈতিক মুক্তিকে খুঁজি তাহলে বাংলাদেশের নারীবাদের প্রতীক আসলে সেই শ্রমজীবী নারীরাই। ড. উম্মে বুশরা ফাতেহা সুলতানা বলছেন, নারীবাদ বা এর চর্চাকে আসলে বাংলাদেশে কখনোই ইতিবাচকভাবে দেখা হয়নি। তাই এই নেতিবাচক ধারণাগুলো যে আসলে কোন সময় থেকে শুরু হলো সেটিও সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

তিনি বলেন যে, বাংলাদেশে নারীবাদের ইতিহাস দেখলে দেখা যায় যে, আসলে এক সাথে কখনো নারীবাদ চর্চা হয়নি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে বেগম রোকেয়া পর্যন্ত যারাই এ বিষয়ে কাজ করেছেন, তারা এক সময়ের ছিলেন না। সেসময় লোতে একদিকে যেমন নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ চলছিল, সেই সাথে নারীদের পড়তে নিরুৎসাহিতও করা হয়েছে, তাদের পোশাক-আশাক নিয়ে কটূক্তি বা তিরস্কারও করা হয়েছে। সেই সময়ের সাথে নারীবাদ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার একটা যোগসূত্র থাকতে পারে। যারা নারীবাদ নিয়ে তেমন কিছু জানেন না বা চর্চা করেন না তারাই আসলে নানা ধরণের মন্তব্য করে থাকেন। এটা এক ধরণের নারী বিদ্বেষ বলে মনে করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা