kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ বৈশাখ ১৪২৮। ২২ এপ্রিল ২০২১। ৯ রমজান ১৪৪২

মেয়ে নয়, মানুষ হিসেবে বড় হওয়া একজন শাগুফার যত অবদান

ফারজানা লাবনী   

৮ মার্চ, ২০২১ ০১:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মেয়ে নয়, মানুষ হিসেবে বড় হওয়া একজন শাগুফার যত অবদান

ডা. শাগুফা আনোয়ার

স্বাধীনতার আগে আগেই জন্ম ডা. শাগুফা আনোয়ারের। বাবা রফিকুল আনোয়ার মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে লড়েছেন, পেশায় ছিলেন আইনজীবী পরে ব্যবসায়ে যুক্ত হন, মা স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন, পরে সংসারের দেখভালের জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয় শাগুফা ছোটকাল থেকেই প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। স্কুল ও কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান পেয়েই উত্তীর্ণ হয়েছেন। এরপর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকেই ১৯৯৩ সালে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে অনার্স মার্কসসহ উত্তীর্ণ হন। ডা. শাগুফা আনোয়ার একজন মেধাবী ছাত্রী, চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়ার সময় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সকল পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। এছাড়াও পরবর্তীতে তিনি হেলথকেয়ার ম্যানেজমেন্ট ও মার্কেটিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভে যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়াম এই দুটি দেশ থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। 

চিকিৎসা শাস্ত্রে হাতে কলমে ডাক্তারিতে না নেমে, তিনি তার উৎকর্ষ তুলে ধরেন দেশের স্বাস্থ্য সেবাখাতের অন্যান্য সীমানায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ঔষধ শিল্প প্রতিষ্ঠান ও এরপর স্বনামধন্য বেসরকারি হাসপাতাল, এ দুটো মিলিয়ে এদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে তার দুই দশকের অধিক সময় ধরে পথচলা, যার ফলে আজ তিনি একটি নেতৃত্ব দানকারী অবস্থানে পৌঁছেছেন। ঔষধ শিল্পের বিপণনে এক দশক ও তারপর দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবাখাতের মানোন্নয়ন এবং রোগী ও চিকিৎসকের সম্পর্কোন্নয়নের ভূমিকা রাখার জন্য আরো এক দশকেরও অধিককাল ধরে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। একজন হেলথ কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট হিসাবে তিনি মনে করেন, এদেশের সরকারি ও বেসরকারি, দুটি স্বাস্থ্য সেবাখাতেই সঠিক ও সময়োচিত কমিউনিকেশনের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা চিকিৎসা সেবাকে অনেক বেশি রোগী-বান্ধব করে তুলতে সহায়তা করবে। 

গত মার্চের পরে যখন সারা দেশে করোনা ভাইরাসের মহামারি ছড়িয়ে পড়ল, তখন ডা. শাগুফা আনোয়ার একজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সেবাকর্মী হিসাবে কোনো একটি কর্মদিবসও বাড়িতে বসে থাকার অবকাশ পাননি। তিনি বলেন, তার কাজের মাত্রা ও পরিধি এ সময় যেন আরো অনেকই বেড়ে গিয়েছিল যা এখনো চলমান। একে তো কাজের চাপ তার ওপর করোনাকালীন পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার দুশ্চিন্তা, সব মিলে অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। স্বামী প্রফেসর আনিসুর রহমান, স্বনামধন্য জেনারেল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জন, সমানতালে করোনাকালীন চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন। যা ছিল শাগুফার জন্য একদিকে অনুপ্রেরণা অন্যদিকে উদ্বেগের কারণও বটে।

করোনা মহামারিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল ইউনাইটেড হসপিটালের ডাইরেক্টর কমিউনিকেশন ও বিজনেস ডেভেলপমেন্ট হিসেবে বিশেষ অবদান রেখেছেন ডা. শাগুফা আনোয়ার। বিশেষ করে উল্লেখ্য, টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে দেশের সকল ঘরবন্দি রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্যাম্পল কালেকশনের সুবিধা ঢাকা শহরের সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সবচেয়ে জরুরি ছিল একাদিক্রমে কোনো রকম ব্যতিক্রম ছাড়া হাসপাতালের সকল প্রকারের রোগীদের জন্য সকল ধরনের সেবা নিরবিচ্ছিন্নভাবে অবিরাম চালু রাখা। একই হাসপাতালে এক ছাদের নিচে করোনা রোগী এবং অন্যান্য রোগী এই দুই ধরনের রোগীদের আলাদা আলাদাভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চিকিৎসা সেবা চালু রাখার কঠিন দায়িত্বটি তিনি পালন করেছেন।

মৃদু বা কম উপসর্গ যুক্ত করোনা রোগীদের বাড়িতে বসেই সম্পূর্ণ চিকিৎসা নেওয়ার সুবিধার্থে দুই সপ্তাহের হোম প্যাকেজে, প্রতিদিনের চিকিৎসক দ্বারা ভিডিও কনসালটেশন ও সঙ্গে অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী আর ডিসপোজেবল ক্রোকারিজ পৌঁছে দিয়ে বাড়িতেই আইসোলেশনে রেখে সুস্থ হয়ে ওঠার অভিনব প্যাকেজটি তিনি এদেশে জনপ্রিয় করে তোলেন। করোনা পরবর্তী সময়ের জটিলতা নিরসনে, পোস্ট কভিড রিহ্যাব পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি জনগণের কাছে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

তারপরেও এখন এক বছর পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, করোনার সময়ে নিজেকে যতটা ভাগ্যবান মনে হয়েছে, ততটা কখনোই আগে মনে হয়নি। এই যে রোগীদের অসহায়ত্বের মধ্যে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া ও রোগীর সেবার জন্য এই মহামারিতে কাজ করে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া, এটি জীবনের অনেক বড় পাওনা বলে ডা. শাগুফা আনোয়ার মনে করেন।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে ডা. শাগুফা আনোয়ার বলেন, নারীদের সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো তার মমতা দিয়ে জগত্জয়ী হওয়ার সক্ষমতা। এখন প্রয়োজন নারীর নিজের শক্তিকে ধরে রাখা ও হার-না-মানা মানসিকতায় নিজেকে সিদ্ধান্ত প্রণয়নকারীর ভূমিকায় নিয়ে যাওয়া। একজন স্বাস্থ্য সেবাকর্মী ও চিকিৎসক হিসাবে ডা. শাগুফা আনোয়ার, নারীর যত্নে নারীর ক্ষমতায়নের ‌ওপর জোর দিয়ে বলেন, নারীকে বুঝতে হবে যে, সামনে এগিয়ে যেতে হলে ও অন্যকে এগিয়ে নিতে হলে, নিজেকে সুস্থ থাকতে হবে। কন্যা আনুশেহ সুহীরা রহমানকে তিনি একজন স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর নারী হিসাবেই বড় করতে চান, কোনো নির্দিষ্ট পেশার পরিচয়ে নয়।

শাগুফা ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক সঙ্গীতময় আবহে বড় হয়েছে। ক্লাসিক্যাল ও নজরুল সঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন ওস্তাদ মিহির নন্দীর কাছে। তিনি বলেন, তার জীবনের সব সুখ ও দুঃখের অনুভূতিগুলো তিনি অনেক বেশি উপলব্ধি করেন। যখন তিনি কবি নজরুলের গীতি কবিতার মাঝে নিজেকে সমর্পণ করেন। জীবনের সকল চড়াই উৎরাইয়ে মাথা উঁচু করে চলতে পারার শক্তি তিনি সঙ্গীতের সাধনাতে পেয়েছেন বলে বিশ্বাস করেন।

শৈশব কৈশোর থেকেই মেয়ে হিসাবে নয়, মানুষ হিসাবে বড় করার জন্য, তিনি তার মা-বাবার কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি আশা করেন, সকল মা-বাবাই তার মেয়েদের মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা