kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

পথে পথে

ফরিদপুরে মহাপবিত্র টেন্ডারবাজি

লায়েকুজ্জামান   

৫ মার্চ, ২০২১ ১৮:৩২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফরিদপুরে মহাপবিত্র টেন্ডারবাজি

টেন্ডারবাজি আবার পবিত্র হয় কী করে? হ্যাঁ ভাই, হয়। অপকর্ম কী করে পবিত্র হয়? তার ব্যাখ্যাও দিলেন ভদ্রলোক। বলছিলাম একটি জেলার হাল সময়ের টেন্ডারবাজি নিয়ে। জেলার নাম ফরিদপুর। তা-ও অর্ধবছরের বেশি সময় ধরে জেলাটি বেশ আলোচিত। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের ত্যাগ আর ভোগ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। 

কে ত্যাগী কে ভোগী তা প্রমাণে অক্লান্ত চেষ্টা চলছে নেতাদের মাঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো নেতাদের ত্যাগ উপচে পড়ছে। অবশ্য এ নিয়ে একজন পরিচিত পাগলের স্পষ্ট বক্তব্য হলো- দল ক্ষমতায় থাকতেও যারা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির সুযোগ পায় না, তারাই হলো ত্যাগী নেতা, অন্যদিকে যারা এগুলো করতে সক্ষম তারা হলো ভোগী নেতা। তার ভাষায়- এ হলো ত্যাগী এবং ভোগীর সংজ্ঞা। ত্যাগ এবং ভোগীর টানাটানির মধ্যে কখনোই তৃণমূলের সাধারণ কর্মীরা পড়ে না, কারণ ত্যাগ-ভোগ যা-ই হোক, ওগুলো বড়দের খাবার, নেতাদের খাবার। কর্মীদের দায় মিছিলে যাওয়ার, পুলিশের লাঠির আঘাত খাওয়ার, বিএনপির মার খাওয়ার- এ দায় তারা বুঝেশুনেই নিয়েছে- কারণ তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ভালোবাসে অন্তর থেকে, হৃদয় থেকে। পাওয়া না-পাওয়া তাদের কাছে তুচ্ছ।

পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগের মহা দুর্দিনে দলের বিভিন্ন জনসভায় ফ্রি মাইকিং করতেন আমাদের পাগলা খোকন। তারপর কখনো টাকা পেয়ে আবার কখনো বাকিতে জনসভার মাইকিং করতেন আলীপুরের দুলাল। ফরিদপুরের সেই দরিদ্র আওয়ামী লীগ যখন হঠাৎ ধনী হয়ে উঠল- ছিটকে গেল দুলাল। এখন কী করে দুলালের সংসার চলে সে খবর ত্যাগী-ভোগী কেউই হয়তো রাখেন না। আওয়ামী লীগের কাছে দুলাল যে বাকি টাকা পাবে, সেটা পেলেও বাকি জীবন ভালোভাবে চালাতে পারবে দুলাল। কিন্তু সে দাবি দুলাল কার কাছে করবে? কে শুনবে তার কথা। আওয়ামী লীগের দায় তো বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার একার। ত্যাগী হোক আর ভোগী হোক তারা কিন্তু আওয়ামী লীগের দায় নিতে রাজি নন, তাদের দায় দলের পদের। দুলালের পক্ষে তো আর শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
 
২০০৮ সালের পর ফরিদপুরের রাজাধিরাজ বনে গিয়েছিলেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যার আত্মীয়, হয়তো খন্দকার মোশাররফ হোসেন ভেবেছিলেন, তার ক্ষমতার সূর্য কোনো দিন অস্ত যাবে না। থোড়াই কেয়ার একটা ভাব জন্মেছিল তার ভেতরে। গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি শক্ত’, ঠিক সেই রকম মোশাররফ হোসেনের ভাই বাবর খন্দকার হয়ে উঠেছিলেন মহারাজা। বাবর এসে একের পর এক আওয়ামী লীগ নেতাদের দল থেকে তাড়াতে শুরু করলেন, অথচ বাবর নিজে করতেন বিএনপি। যা হোক, আল্লাহর মাইর দুনিয়ার বাইর। শেখ হাসিনার কাছে যে আীত্মী-অনাত্মীয় সব সমান তিনি তা প্রমাণ করে দিলেন। পতন হয়ে গেল বাবর সাম্রাজ্যের। তখন ছিলাম সকালের খবরে-ফরিদপুরের রাজনীতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছিলাম। শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশাররফ হোসেনের রাজাকার মোটাতাজাকরণ প্রকল্প'। এর জন্য বহু খেসারত দিতে হয়েছে। 
ব্যক্তিগত খেসারতের কথা না-ই বললাম। একপর্যায়ে ফরিদপুরের মানুষ মোশাররফ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। তার পতনও হয়েছে। এখন খন্দকার মোশাররফ নেই, তার ভাই বাবর খন্দকার নেই, খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সাঙ্গপাঙ্গও নেই। ফরিদপুরের আওয়ামী রাজনীতির ময়দান তো এখন ত্যাগী নেতাদের দখলে। এখন কেন টেন্ডারবাজি হচ্ছে? দুদিনের ক্ষমতায় ত্যাগীরা ভোগী হয়ে উঠলেন? শুনলাম টেন্ডারের ভাগ সবাই নিচ্ছেন। বোকা কয়েকজন সামনে পড়ে ভাগাভাগি করে, রাতের আঁধারে সবাইকে ভাগ পৌঁছে দিচ্ছেন। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে ত্যাগী আর ভোগীর প্রশ্ন তুললেন কেন? 

বলতে পারতেন, মোশাররফ হোসেনের লোকেরা খাচ্ছে-আমরাও খাব। আমাদের খাবার সুযোগ দিন। মোশাররফ হোসেন দলের পুরনো নেতাদের বাদ দিয়ে বিএনপির লোককে দলে ভিড়িয়েছে কথা মিথ্যা নয়, সত্য। আপনারা ত্যাগীরা কী করছেন? ছাত্রলীগের সভাপতি করলেন এমন একজনকে, যার আপন ভগ্নিপতি ছাত্রদলের সভাপতি, তার বাবা কোন রাজনীতি করেন তা-ও সবাই জানেন, আবার সে বিবাহিত বলেও অভিযোগ আছে। এ নিয়ে ত্যাগীরা কেউ তো টুঁ শব্দটি করলেন না? মোশাররফ হোসেন নেই; কিন্তু তিনি যেসব রাজাকারের বংশধর ও বিএনপিকে ক্ষমতায় দলে এনেছিল, তারা সবাই তো ত্যাগীদের সঙ্গে। সংগঠনের এত নেতাকর্মী বাড়ি ছাড়া হলো, গ্রেপ্তার হলো ছোট আজম-মির মাছিমের ছেলেরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে? 

তাহলে টার্গেট কি শুধু দলের নেতাকর্মীরা? পুলিশ প্রশাসনের বিষয়ে না হয় কিছু বলা যাবে না, বললে দেখা যাবে কোনো মামলায় হান্দায়ে দিয়েছে। খন্দকার মোশাররফের সময়ে ঠিকাদারি কাজ ভাগ করতেন কে? সবাই জানে? এখন দেখছি তথাকথিত ত্যাগীরা তার সঙ্গে বৈঠক করেন, তাকে আবার ঠিকাদারি কাজের ইজারা দিয়েছেন। তাহলে কী হলো? আমরা বোকারা যারা নেচেছিলাম-উল্লাস করেছিলাম, এবার বুঝি সত্যিকারের নেতাদের কাছে ক্ষমতা আসবে? তার তো নমুনা দেখছি। বরং দল এখন বিভক্ত চার ভাগে? 

অন্যদিকে ফরিদপুরের বাইরের মহা ক্ষমতাধর কয়েক নেতা ঈগলের মতো চোখে তাকিয়ে আছে ফরিদপুরের দিকে। তারা ভাগ বসাতে চান? প্রখ্যাত গায়ক নচিকেতা তার একটি গানের প্রাক-ভূমিকায় বলেছেন, তিনি একবার কলকাতার সড়ক দিয়ে যাচ্ছেন। তাকিয়ে দেখেন তার এক পরিচিতজন গায়ে রং মেখে সড়কে নাচছেন? নচিকেতা জানতে চাইলেন, নাচছিস কেন? জবাবে যুবক জানাল পল্টাদা হেরে গেছেন? পল্টুটা কী ছিল? শালা চোর ছিল। লাল্টুটা জিতে গেছে? তাহলে লাল্টুটা কী? শালা তো মহাচোর। তাহলে তুই নাচছিস কেন? এবার যুবক বলল, মাইরি আমি অভ্যেসে নাচি? ফরিদপুরে এ যেন চোর-মহাচোরের খেলা। আমরা শুধু অভ্যাসে নাচছি?

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা