kalerkantho

রবিবার। ৫ বৈশাখ ১৪২৮। ১৮ এপ্রিল ২০২১। ৫ রমজান ১৪৪২

‘কালো, তবুও সুন্দর’

মনোবিদ হিসেবে বলছি, আমার শরীরের সবকিছু মিলিয়েই আমি

রাউফুন নাহার    

২ মার্চ, ২০২১ ২০:১৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মনোবিদ হিসেবে বলছি, আমার শরীরের সবকিছু মিলিয়েই আমি

রাউফুন নাহার

‘কালো, তবুও সুন্দর’ প্রথম আলোর এমন শিরোনাম বা লেখার সমস্যার জায়গাটি ঠিক কোথায়, তা উপলব্ধি করা হয়তো আমাদের অনেকের কাছেই কঠিন। কারণ শারীরিক প্রতিচ্ছবির (physical image) ভিত্তিতে নিজেকে বা অন্যকে মূল্যায়ন করার মনস্তত্ত আমাদের একদিনে তৈরি হয়নি। এটি আমাদের হাজার বছরের চর্চা ও অভ্যাসের সাথে সম্পর্কিত। একদিকে আমরা এই লেখাটি বা শিরোনামটির সমালোচনা করছি, আরেকদিকে হয়তো কারো সাথে দেখা হবার পরই বলছি, ‘তুমি মোটা হইসো/ শুকায় গেসো/ কালো হইসো/ ফর্সা হইসো/ সুন্দর হইসো/…ইত্যাদি।

কেন এসব বলছি নিজেকে প্রশ্ন করলে হয়তো ভেতর থেকে উত্তর আসবে, ‘আরেহ আমি কি মিন করে কিছু বলসি নাকি! আমি তো এমনিই বলছি!’ বাস্তবতা হলো আমাদের এমনিই এমনিই বলা অনেক কথাই আরেকজনের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আপাতত ধরে নিচ্ছি প্রথম আলোও আগে পিছে না ভেবে এমনিই এ রকম শিরোনাম করেছে। তাই কারো সমালোচনায় না গিয়ে (কারণ কঠোর বা নেতিবাচক সমালোচনা আমাদেরকে ভুল শুধরানোর চেয়ে ডিফেন্সিভ করে তোলে বেশি), একজন মনোবিদ হিসেবে এই বিষয়টি নিয়ে কিছু বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি এবং নিচের লেখাটি শেয়ার করছি। এই লেখাটি আমার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘ক্রান্তিকালে মনের সুরক্ষা’র ‘মনোযোগী ধ্যান : নিজেকে গ্রহণের কথামালা’ অংশ থেকে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে দিচ্ছি। শারীরিক প্রতিচ্ছবি নিয়ে যারা বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়নের সম্মুখীন হয়েছেন, লেখাটি পড়ে তারা সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত বোধ করবেন।

শারীরিক সৌন্দর্য আসলে কি?
হয়তো আপনার কাছে শারীরিক সৌন্দর্য হলো নিজেরই প্রতিচ্ছবি, নিজের অবয়ব নিয়ে আপনার যে অনুভূতি, যে চিন্তাভাবনা বা ধারণা। কিংবা হয়তো ভাবছেন শারীরিক সৌন্দর্য হলো আপনার ভেতরে আজন্ম লালিত কিছু আকাঙ্ক্ষা, কিছু বিশ্বাস, কিছু দীর্ঘশ্বাস, কিছু ঘটনা, আর দেখতে যেমনটা হওয়া উচিত বলে অনবরত মনে হতে থাকা কিছু কথা। 

শারীরিক সৌন্দর্য আসলে কি?
শারীরিক সৌন্দর্য হলো, সমাজ সংসারের তৈরি করে দেওয়া বিচিত্র কিছু কথার ফাঁদ, কিছু মূল্যায়ন, কিছু সহিংসতা...? আচ্ছা সেসব থাক। এবার একেবারে নিজের কথাই ধরুন। আপনি দেখতে কেমন? নিজের প্রতিচ্ছবির কথা ভেবে কেমন বোধ করছেন? সন্তুষ্ট? অসন্তুষ্ট? সুখী? অসুখী? হতাশ? ভীত? রাগান্বিত? 

আপনি হয়তো সুখকর অনুভূতিগুলোই অনুভব করছেন। বা হয়তো কষ্ট পাচ্ছেন। অথবা সুখ অসুখ মিলিয়ে আপনার মিশ্র কিছু অনুভূতি হচ্ছে। কিংবা আপনার কিছুই মনে হচ্ছে না। এসব শারীরিক সৌন্দর্যের ব্যাপারে আপনি নিরপেক্ষ। নির্বিকার। আসলে যেকোনো কিছুই আপনি অনুভব করতে পারেন। অনুভূতি অনুভব করা তো আর দোষের কিছু নয়? প্রশ্ন একটাই, ভালো আছেন তো! শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে আপনার ভাবনা বা আচরণ দিয়ে নিজেকে বা অন্য কাউকে আঘাত করছেন না তো! 

যদি ভাবনায়, অনুভূতিতে, আচরণে কিছুটা বদল চান, তো চলুন কিছুটা ভিন্নভাবে, ভিন্নপথে শুরু করা যাক। আচ্ছা, আপনি দেখতে যেমন তেমনই নিজেকে গ্রহণ করে নিলে কেমন হয়? কেমন হয় যদি আপনি দেখতে যেমন ঠিক তেমনটা নিয়েই সুখী থাকতে পারেন? কিছুক্ষণ ভাবুন তো!

এমন কোনো সময়ের কথা কি মনে পড়ে যখন নিজেকে আপনার বেশ লেগেছিল, নিজেকে আপাদমস্তক কিংবা তার খানিকটা হলেও আপনি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন? আচ্ছা আপনার শারীরিক সত্তার কোন অংশটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়; যাকে আপনি খুব সহজে গ্রহণ করে নিতে পারেন? কিছুক্ষণ ভাবুন।   

এবারে দেখুন তো নিজেকে আপাদমস্তক গ্রহণ করে নিলে কেমন হয়? হয়তো কঠিন মনে হচ্ছে। হয়তো আপনার কষ্ট হচ্ছে। কিছুটা সময় নিন নিজের জন্য। একটা গভীর নিঃশ্বাস নিন...... ধীরে ধীরে প্রশ্বাস ছাড়ুন......। 

এখন চেহারা বা শারীরিক প্রতিচ্ছবি নিয়ে আমি কিছু কথা বলবো। আপনি সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে পারেন, অথবা চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে শুনে (বা পড়ে) যেতে পারেন। এই উক্তিগুলোর প্রত্যেকটি বাস্তব এবং যৌক্তিক। এই মুহূর্তে কথাগুলো আপনার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কারণ শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে মিথ বা প্রচলিত কথাগুলো বহুবছরের পুরনো। সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে চর্চার প্রয়োজন। তাহলে শুরু করা যাক।

আসুন, নিজেকে বলি-

আমি যেমন তেমনই ঠিক আছি।  
আমি যেমন তেমনই নিজেকে গ্রহণ করে নিচ্ছি। 
আমার শারীরিক প্রতিচ্ছবি, আমার মুখাবয়ব যেমনই হোক না কেন তা গ্রহণযোগ্য।  
যে শরীরের ভেতরে আমার বসবাস তাকে আমি বরণ করে নিচ্ছি।  
নিখুঁত হবার কোনোই প্রয়োজন নেই।   
আমার শরীরের সবকিছু মিলিয়েই তো আমি। 
আমার চেহারা, আমার শারীরিক প্রতিচ্ছবি আমার সাথে মানানসই। 
নিজেকে আমি নিজের পছন্দমতো সাজাই, নিজের মতো করে ভালোবাসি।  
আমি যেভাবে আছি, ঠিক আছি।  
আমি নিজেকে গ্রহণ করে নিচ্ছি। 
এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটি মানুষ গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেকটি মানুষ তার নিজের মতো সুন্দর।
চেহারা বা শারীরিক সৌন্দর্যের ভিত্তিতে মুল্যায়ন করা থেকে আমি নিজেকে মুক্তি দিচ্ছি। 
আমি মুক্ত, আমি মুক্ত, আমি মুক্ত...।

লেখা : রাউফুন নাহার 
শিক্ষক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাবি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা