kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

এ কে এম আতিকুর রহমান   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৩:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

এই মাসের প্রথম দিন এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুতির মাধ্যমে দেশের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে। সামরিক নেতারা ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা এই কর্মটি করেছেন। অন্যদিকে মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশন সামরিক বাহিনীর উত্থাপিত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে তাঁদের দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যে উদ্দেশ্য আর কারণেই হোক, সামরিক বাহিনী অং সান সু চি ছাড়াও তাঁর দলের অন্য প্রবীণ নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে।

আমরা জানি যে ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরিসমাপ্তিতে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। সেই সময় ইউ নু নতুন সরকারকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্টবিরোধী পিপলস ফ্রিডম লীগের (এএফপিএফএল) নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৮ সালে অন্তঃকলহে এএফপিএফএলের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিলে প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনী মিয়ানমারের রাজনীতিতে প্রবেশ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জেনারেল নে উইনকে মিয়ানমারের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়। ১৯৬০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইউ নু জয়লাভ করলে জেনারেল নে উইন তাঁর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। তবে মিয়ানমারের আকাশ থেকে মেঘের আনাগোনা দূর করা যায়নি, একদিন হঠাৎ করেই নেমে আসে বজ্রঝড়। ১৯৬২ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল নে উইন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে নেন। সম্ভবত এটিই ছিল মিয়ানমারের জনগণের গণতান্ত্রিক পরিবেশে সরকার নির্বাচিত করার অধিকারের সফল সমাপ্তি।

‘গণতন্ত্রের বিকাশে শৃঙ্খল’-এর নামে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ২০১১ সালে অনেক সংস্কার আনে, যদিও ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধান সামরিক বাহিনীকে জাতীয় সংসদে ২৫ শতাংশ আসন এবং সংবিধান পরিবর্তন করার নিখুঁত কর্তৃত্বের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। অং সান সু চিসহ রাজনৈতিক নেতাদের অবাধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা ছিল। সামরিক সরকার রাজনৈতিক নেতাদের মানবিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে দিচ্ছিল না। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যমান দৃশ্যপটের পরিবর্তন শুরু হয়, অন্তত বিশ্বকে দেখাতে যে সামরিক সরকার মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে ইচ্ছুক। তারা মিসেস সু চি এবং অন্য নেতাদের মুক্তি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে সু চি মিয়ানমারের ৫০ বছরের সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গঠন করেন।

সু চি সরকারের পাঁচ বছর এমনভাবে কেটে গেছে যে সামরিক বাহিনী যদিও আড়ালে থেকে তাঁর সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছিল, তবে তাদের চোখ বন্ধ রাখেনি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনীতিবিদরা আশাবাদী ছিলেন যে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। কিন্তু জনগণের দুর্ভাগ্য এই যে গণতন্ত্র সম্ভবত মিয়ানমারের সামরিকবাদী পরিবেশে লালিত-পালিত বা বিকশিত হওয়ার উপযুক্ত নয়। মিয়ানমারের জনগণ যখন আকাশে একটি নতুন সূর্য দেখতে শুরু করে, তখনই সঞ্চিত মেঘ আবারও সেই সূর্যটিকে আচ্ছাদিত করে দিচ্ছে, যা বিশ্বের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষের পীড়ার কারণ। যদিও গত নভেম্বরের নির্বাচনে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছে (৪৭৬টি আসনের মধ্যে পেয়েছে ৩৯৬টি), তবে ইউনিয়ন সলিডারিটি ও ডেভেলপমেন্ট পার্টির (পেয়েছে মাত্র ৩৩টি আসন) মতো সামরিক বাহিনীর সমর্থিত দলগুলো ওই নির্বাচনকে প্রতারণামূলক বলে অভিযোগ করে। নির্বাচনে জয়ী হওয়ায় এনএলডির পাঁচ বছরের জন্য পরবর্তী সরকার গঠনের কথা ছিল। কিন্তু এনএলডির জয়ের পর থেকেই সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা বিরাজ করছিল এবং অবশেষে তা-ই ঘটে গেল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সু চির দল এনএলডির নির্বাচনে জয়লাভ এবং দ্বিতীয়বারের মতো আরো শক্তিশালী হয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়াটাই সেনাবাহিনীর জন্য অভ্যুত্থান আবশ্যক হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনী এমন কিছুর আশঙ্কা করছিল যে ভবিষ্যতে এনএলডি সরকার সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম টানতে পারে, বিশেষ করে সংসদে তাদের নির্ধারিত আসনসংখ্যা হ্রাস করতে পারে। সুতরাং তারা ঝুঁকি নিতে চায়নি। এখন, এমনকি তারা যদি আগামী দুই, তিন বা পাঁচ বছরের মধ্যেও নির্বাচনের আয়োজন করে, যেমন জান্তা সরকার ঘোষণা করেছে, তাহলে সে রকম কোনো পরিবর্তনের আশঙ্কা থাকবে না।

এরই মধ্যে এক বছরের জন্য সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে গণশোভাযাত্রা আর প্রতিবাদ মিছিল মিয়ানমারে প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলনকারীরা অং সান সু চিসহ গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের মুক্তি দাবি করছে। পুরো মিয়ানমারেই সামরিক সরকারবিরোধী সমাবেশ ও মিছিল থেকে রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির জন্য জোরদার দাবি জানানো হচ্ছে। সামরিক সরকারের প্রধান বলেছেন যে তাঁরা সংবিধান অনুসরণ করবেন এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য শিগগিরই একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেবেন। আমরা জানি, অতীতেও বহুবার তাঁরা এ ধরনের প্রতিশ্রুতির কথা উচ্চারণ করেছিলেন।

কোনো সন্দেহ নেই, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মিত্র রয়েছে, বিশেষ করে চীন, যারা রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে। রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের গণহত্যায় সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি জানা সত্ত্বেও আসিয়ানের বেশ কয়েকটি সদস্য দেশ মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান আমাদের কাছে এরই মধ্যে স্পষ্ট। মিয়ানমারের মিত্রদের কাছে রোহিঙ্গা ইস্যু একটি ছোটখাটো ইস্যু, যা মিয়ানমারে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার তুলনায় মোটেই গুরুত্ব রাখে না। সংগত কারণেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের কৌশলগুলো নির্ধারণের সময় এই বাস্তবতাটি ভুলে যাওয়া উচিত হবে না।

আমরা জানি, ক্ষমতা দখলকারী সামরিক প্রধান সিনিয়র জেনারেল অং মিন হ্লাইং দেশের শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদের একজন, যাঁদের রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের জাতিগত নির্মূলকরণে ভূমিকা থাকার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্য সব জেনারেলও বর্তমানে তাঁর সঙ্গে ক্ষমতায় রয়েছেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি থেকে আমরা বুঝতে পারছি, রোহিঙ্গা সংকটের কোনো ইতিবাচক ফল শিগগিরই আসবে বলে মনে হয় না। অং সান সু চির বেসামরিক সরকার যে কাজটি করেনি, তা আমরা সামরিক সরকারের কাছ থেকে কি আশা করতে পারি? সামরিক সরকার সত্যি যদি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়াটি শুরু করে, তবে সেটি হবে একটি অলৌকিক কাজ।

আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার আনা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘটিত রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত মামলাটির ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, ২০ জানুয়ারি ২০২১ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আইসিজের এখতিয়ার নিয়ে মিয়ানমার প্রাথমিক আপত্তি জানিয়েছিল। অর্থাৎ ওই ঘটনাটি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের ঠিক দুই সপ্তাহ আগের। আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই আপত্তিতে মিয়ানমার উল্লিখিত মামলার শুনানি আইসিজে করতে পারে কি না এবং গাম্বিয়া মামলাটি আনতে পারে কি না, সেসব প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ওই মামলার প্রাথমিক শুনানির সময় অং সান সু চি আন্তর্জাতিক আদালতেও অনুরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। সন্দেহ নেই, এখন নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পুঁজি করে মিয়ানমার বিচারপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার জন্য আরো একটি সুযোগের সন্ধান করবে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বরাবরই যা তারা করে আসছে। তবে গণহত্যার বিষয়ে জাতিসংঘের কনভেনশনের সংশ্লিষ্ট বিধান মতে যেকোনো রাষ্ট্রকেই অন্য কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে গণহত্যার জন্য মামলা আনার অনুমতি দেয়, এমনকি ওই রাষ্ট্রটি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও।

এটি সত্য যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রত্যাবাসন চুক্তি করেছিল, যদিও গত তিন বছরে এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। মিয়ানমার সব সময়ই প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির করে আসছে। আজ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছা বা আন্তরিকতার কোনো চিহ্ন দেখতে পাইনি। তারা শুধু টালবাহানা করেই যাচ্ছিল, এমনকি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অজুহাতে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাটিও স্থগিত করে দেয়।

বলা হয়ে থাকে, কোনো দেশ তার প্রতিবেশী পরিবর্তন করতে পারে না। মিয়ানমার বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং সেটি হোক না গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার বা সামরিক সরকার পরিচালিত, সে প্রতিবেশী হিসেবেই থাকবে। এরই মধ্যে সামরিক সরকারের প্রধান জেনারেল অং মিন হ্লাইং ঘোষণা করেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আমাদের যে ভরসা জাগে না, যদিও দুই দেশের মধ্যে সংলাপ শিগগিরই আবার শুরু হবে—এই প্রত্যাশায় বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে যাচ্ছে। যা হোক, আমাদের শুধু এতটুকুই প্রত্যাশা (সব সময়ই যা করে আসছি) শিগগিরই রোহিঙ্গারা নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে নিজেদের গৃহে ফিরে যাবে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা