kalerkantho

রবিবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৫ রজব ১৪৪২

ইতিহাসে এটি প্রথমবার ঘটল

ড. কাকন নাগ, প্রধান নির্বাহী, গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১৪:২০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইতিহাসে এটি প্রথমবার ঘটল

আপনাদের চ্যালেঞ্জগুলো কী ছিল?
শুরুতে চ্যালেঞ্জ ছিল ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্ট। আমাদের একটা ডেভেলপড টিম ছিল। টেকনোলজিও নিজেদের। অবকাঠামোও তৈরি ছিল। বাইরে থেকে বিভিন্ন কেমিক্যাল, রি-এজেন্ট ইত্যাদি আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লেগেছে। যে সমস্যাটি আগে কল্পনাও করিনি, সেটি পরবর্তী সময়ে প্রকট হয়ে দেখা দিল। দেশে বসে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাই যে বড় কিছু করতে পারেন, সেটা বাংলাদেশিরাই যেভাবে পারে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এটাই বড় বাধা।

ডি৬১৪জি নিয়ে কাজ করার বিশেষ কারণ আছে?
যখন কাজ শুরু করি তখন ডি৬১৪জি স্ট্রেইনটির (করোনা ভাইরাসের বিশেষ ধরন, এটি ১০ গুণ বেশি সংক্রামক) ইনফেকশন রেট অলরেডি বাড়তে শুরু করেছে। আমাদের আগে মডার্না, ফাইজার, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা কাজ শুরু করেছিল। তখন এটি খুবই নগণ্য মাত্রায় ছিল। ফলে তখন এটা নিয়ে কাজের সুযোগ তাদের ছিল না। তারা কিছুটা আগে শুরু করাতে আমরা তাদের তথ্যও পেয়েছি। এই স্ট্রেইনটি যে এত প্রকট আকার ধারণ করতে যাচ্ছে, সেটা আমরা আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম। ফলে এটা নিয়ে এগিয়েছি। পরে বিসিএসআইআর করোনার জিনোম সিকোয়েন্সের যে ডাটা প্রকাশ করেছে সেখানেও দেখা গেল, শতভাগ নমুনায় ডি৬১৪জি।

এই টিকা সবখানে সমান কার্যকর?
আমরা যে স্ট্রেইনের কথা বলছি, সেটি পুরো দুনিয়ায়ই ছড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি টেক্সাসের একটি পাবলিকেশনে দেখানো হয়েছে, সেখানে শতভাগ নমুনা ডি৬১৪জি। ভারত, ইতালি ও স্পেনেও ডি৬১৪জির প্রার্দুভাব দেখা গেছে। ফলে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, আমাদের টিকা সবখানেই সমান কার্যকর ও নিরাপদ হবে।

প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন?
আমরা আর্থিকভাবে সরকার বা কোনো সংস্থার কাছে সাহায্য চাইনি। এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে কাজ চলছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর খুব দ্রুততার সঙ্গে অডিট সম্পন্ন করেছে। উত্পাদনের লাইসেন্সও দিয়েছে। এখন বিএমআরসি অনুমোদন দিলেই সামনে এগোনো যায়।

এটা সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে?
হ্যাঁ। ঠিক এই ডিজাইনে আর কোনো ভ্যাকসিন পাবেন না বিশ্বে। আমরা যখন একটা মাইলস্টোনে পৌঁছব তখন এই প্রযুক্তি সরকারের কাছে হস্তান্তর করে দিতে পারব, যাতে দ্রুততার সঙ্গে সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করা যায়। জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার টেকনোলজি চাই।’ আমার খুব কষ্ট লেগেছে। কারণ টেকনোলজি নিয়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এখনো বলছি, সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা যদি এগিয়ে আসে তাহলে প্রযুক্তি দিতে আমরা আগ্রহী।

আপনাদের টিকা বাজারে আসতে কত দিন লাগবে?
আসলে এর সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি জড়িত। চীনা সরকার একটি ভ্যাকসিনকে ফেজ-ওয়ান আর টু ট্রায়াল করেই উন্মুক্ত করে দিয়েছে। রাশিয়া ও ভারতের ক্ষেত্রেও কিন্তু তাই হয়েছে। এ ধরনের জরুরি অবস্থায় দেশের প্রয়োজনে দেশি প্রযুক্তি এগিয়ে নেওয়ার জন্য স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ ও ডিসিশন— গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। সে রকম হলে হয়তো আমরা মার্চের মধ্যে টিকা পেতে পারি। আবার একেবারে স্ট্যান্ডার্ড প্রসেসে এগোলে ট্রায়ালের সময়কাল অনূর্ধ্ব ছয় মাস।

আগে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি নাগাদ বাজারে আনার কথা বলেছিলেন
দুঃখজনক হলো, আমরা আজ পর্যন্ত ফেজ ওয়ানই শুরু করতে পারিনি। এই দুর্ভাগ্য আমাদের, নাকি জাতির? আমাদের দুই সপ্তাহ পরে জার্মানির কিউরভ্যাক ঘোষণা দিয়েছিল। এখন তারা ফেজ থ্রির শেষ পর্যায়ে। অথচ তখন দুই সপ্তাহ এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও আমরা আজ তাদের চেয়ে চার মাস পেছনে। যেখানে অনুমোদনের দরকার পড়ছে সেখানেই ঠেকে যাচ্ছি। অথচ আমরা বিজ্ঞানীরা যদি আমেরিকা বা কানাডায় বসে কাজ করতাম আর গ্লোব আমাদের সঙ্গে কোলাবরেশন করত তাহলে কিন্তু ব্যাপারটা অন্য রকম হতো। সবাই ধন্য ধন্য করত। আমার সহকর্মীরা প্রায়ই বলেন, গ্লোবের সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হলো আমাদের ভেন্যুটা হয়ে গেছে বাংলাদেশ!

আপনারা তো সাহসটা করেছেন
এত দিন অন্যরা উদ্ভাবন করেছে আর বাংলাদেশ সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাই ভেবেছে। আমরা এই প্রথম খুব চ্যালেঞ্জিং টিকা উদ্ভাবনের ডিসিশন নিয়েছি। এটা বাংলাদেশ থেকে চাঁদে যাওয়ার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যখন প্রথম ঘোষণা দিলাম তখন মানুষের বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল। কাজটি এত চ্যালেঞ্জিং বলেই এত অবিশ্বাস। বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে একটা ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে এই টিকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের খসড়া তালিকায় আমাদের দুটি টিকার নাম আছে, ইতিহাসে এটি প্রথমবার ঘটল।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : পিন্টু রঞ্জন অর্ক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা