kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষিজীবী নারীর ভূমিকা

আসমা আক্তার   

২৯ জানুয়ারি, ২০২১ ১৫:৪৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষিজীবী নারীর ভূমিকা

ফাইল ফটো

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সামাজিক কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, অসমতা হ্রাস করা এবং দারিদ্র্য্ নির্মূল করা । আর এত কিছু পরিবর্তন যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ইঙ্গিত করে, তবে তা বাস্তবায়নে অবশ্যই নারী-পুরুষ সবাইকে একযোগে তালে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। ইতিহাস বলে আমাদের দেশ নারীর ক্ষমতায়নকে সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন এই বিষয়টি আজ পৃথিবীতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতিসংঘ নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়টিকে মিলেনিয়াম এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য হিসেবে গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। নারীর অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন গুলো একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেমন - নারী শিক্ষার হার বাড়ানো, তাদেরকে বিভিন্ন সম্মানজনক পেশায় নিয়োগ করা, রাজনীতি ও ব্যবসায় নিযুক্ত হতে উৎসাহিত করা ইত্যাদি।

শিল্পখাতের উৎপাদন ও প্রসারে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমাদের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এ শিল্পখাত থেকে। যেখানে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক নারী কর্মরত রয়েছে। আর কৃষিখাতের উন্নয়নে সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের নারীরা তাদের মেধা, শ্রম এবং সময় ব্যয় করে আমাদের কৃষিকে একটি নির্ভরশীল এবং সম্মানজনক অবস্থানে এখনো ধরে রেখেছে। যা আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন ফরিদপুরের গোবিন্দপুর গ্রামের সাহিদা বেগম। তিনি ৪৩ বছর বয়সী একজন সফল কৃষক এবং উদ্যোক্তা। সাহিদা বেগম পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করে ২.৫ কোটি টাকা লাভ করেছেন ২০২০ সালে। সাহিদা বেগমের ভাষ্যমতে, ৩০ একর জমিতে ১ কোটি টাকা ব্যয় করে ২০০ মণ বীজ সংগ্রহ করেছেন । আর প্রতিমণ বীজ ২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করেছেন । তিনি আরো বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পেঁয়াজ চাষীরা আসেন তার এই পেঁয়াজের বীজ কেনার জন্য। তার তত্ত্বাবধানে উৎপাদিত পেঁয়াজের বীজ এর চাহিদা বেশ ভালো। সাহিদা আরও বলেন, যদি আমার ৫০০ মণ বীজও থাকতো, তবুও তা খুব সহজে বিক্রি হয়ে যেত।

সাহিদা বেগম এর এই সফলতা একদিনে আসেনি। ২০০৪ সালে সাহিদা প্রথম মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন শুরু করেন। সে বছর সে মাত্র ২ মণ বীজ উৎপাদন করতে পেরেছিলেন যা মাত্র ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। পরবর্তী বছর ১৩ মণ বীজ পেয়েছেন। প্রতি মণ বিক্রি করেন ৪০ হাজার টাকা করে। এভাবে লাভ বাড়ার সাথে সাথে তার উৎসাহও আরো বাড়তে থাকে। তাই পরবর্তী বছর তিনি বেশ কিছু জমি ইজারা নেন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করার জন্য এবং উৎপাদন করেন ৩২ মণ বীজ। আর পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি তার উৎপাদন কার্যক্রম আরও বাড়াতে থাকেন।

গত বছর তিনি ১৫ একর জমিতে ১৫০ মণ পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেন। তিনি বলেন, আমি প্রতি বছর চেষ্টা করি নতুন নতুন পেঁয়াজের বীজ আবাদ করতে যাতে কৃষক বাম্পার ফসল উৎপাদন করতে পারে। এখন তিনি বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করেন। যেমন- রাজশাহী তাহেরপুরী, সুপার কিং, সুখসাগর, নাসির কিং এবং হাইব্রিড জাত। সাহিদা বেগম তার নিজ বাড়িতে এই বীজ প্যাকেটজাত করেন তার নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘খান বীজ‘ নামে। এমনকি অনেক ক্রেতা এখান থেকে তা সংগ্রহ করেন। তার তত্ত্বাবধানে উৎপাদিত বীজের গুণগত মান ভালো বিধায় তা শুধু ফরিদপুর অঞ্চল নয় বাংলাদেশের অনেক কৃষক এ বীজ ছাড়া অন্য কোন বীজ আবাদ করেন না।

এলাকার মানুষ বলেন, শস্য সংগ্রহের সময় ৫০ এরও অধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক তিনি নিয়োগ করেন। তিনি একজন অসাধারণ মানুষ। তিনি নিজেও সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি শ্রমিকদের সাথে মাঠে কাজ করেন। তাদের সাথেই একসাথে খাওয়া দাওয়া করেন। এমনকি তিনি শ্রমিকদের জন্য নিজের পরিবারের লোকদের মতো রান্নাও করেন। এই করোনাকালীন সময়ে অনেকেই তাদের চাকরি হারান যারা এলাকায় বিভিন্ন কটন মিলে চাকরি করতেন। তাদেরকে সাহিদা বেগম ৪০০ টাকা বেতনে তার জমিতে কাজ দিয়েছেন। এই সময়ে যা তাদের জন্য বড় পাওয়া। এতকিছুর মধ্যেও সাহিদা বেগম তাঁর দুই কন্যাকে ভালভাবে মানুষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তার এক মেয়ে ব্যাংকার আর ছোট মেয়ে ক্লাস নাইনে পরে । তার স্বামী মোঃ বক্তার হোসেন পেশায় একজন ব্যাংকার। তিনিও সময়-সুযোগ মতো শ্রমিকদের তত্ত্বাবধান করে থাকেন। তার স্বামী বলেন, আমার স্ত্রী সকাল থেকে রাত অবধি পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনে সময় দিয়ে থাকেন। এই বীজ উৎপাদনে যে পরিচর্যা তা একটি শিশুর পরিচর্যায় চেয়ে কম নয়। তাই বছরের-পর-বছর শ্রমিকদের সাথে সাহিদা বেগম অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মেধা ব্যয় করে যাচ্ছেন ভালো বীজ উৎপাদনে।

আজ সাহিদা বেগম অন্য যেকোনো সফল পুরুষ কৃষকের মত তিনিও একজন দক্ষ এবং সফল কৃষক। অনেক শিক্ষিত যুবক ও যুবতী তার পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। তারা তাঁকে প্রশ্ন করে কিভাবে এতো ভালো বীজ তিনি উৎপাদন করছেন । আজ সাহিদা বেগম ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষকদের কাছে একজন আদর্শ ব্যক্তি এবং সফলতার প্রতিরূপ। সাহিদা বেগম আজ শুধু একজন সফল কৃষক নন তিনি একাধারে একজন উদ্যোক্তা, গবেষক, সমাজকর্মী, গৃহিণী, স্ত্রী ও মা। তিনি আজ শুধু ফরিদপুরের গোবিন্দপুর এর নয় পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আমরা জানি, গত কয়েক বছর ধরে বছরের একটা

সময় এই পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে যায়। যার ঝাঁজে পুরো দেশ জ্বলতে থাকে। কারণ পেঁয়াজ আমাদের দেশে খাবার তৈরিতে একটি অপরিহার্য মসলা। সাহিদা বেগমের মত যারা ভালো পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করছেন এবং তা দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহের ব্যবস্থা করছেন তারা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কারণ ভালো বীজ থেকেই ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব। এই ভালো পেঁয়াজের বীজ আবাদ করে এই দেশ একসময় পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে এবং দেশের চাহিদা মিটিয়ে তা বাইরে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে - এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আমাদের যুব সমাজ যাতে চাকরির পেছনে ঘুরে ঘুরে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে এবং তারা যেন উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করে” । এক্ষেত্রে সাহিদা বেগম এর উদাহরণ আমাদের জন্য অনুকরণীয় হবে আশা করি। আমরা নারী আমরা জানি আমরা অনেক কিছুই করতে পারি । কিন্তু সফলতা অর্জন করার জন্য আমাদের নিজেদের লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে আর মনোবল , চেষ্টা , পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকতে হবে। তবেই আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারবো আর দেশ, জাতি , সমাজ, ,পরিবার এবং নিজের জন্য কিছু করতে পারবো।

(লেখক- সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা