kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে

সুমাইয়া জামান    

২২ জানুয়ারি, ২০২১ ১৮:৩৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট আইন ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রণীত হয়। প্রণয়নের শুরু থেকেই আইনটি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক তোলপাড়। এর উত্তর খুঁজতে কিছু জরিপ করা হয়। গণমাধ্যমের দেয়া তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয় ৭৩২টি, এর আওতায় ১ হাজার ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর ২০২০ সালের প্রথম দুই মাসে এই আইনে ১৬৫ মামলায় ৩৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হওয়ার দুই বছরের মধ্যে এ আইনে মামলার সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ হাজার। অর্থাৎ এই আইনে মামলা ও নিষ্পত্তির সংখ্যাটা বেশ ভারী।

সব সময়ই আমরা দেখেছি কোনো একটি অপরাধের সাথে যদি নারীর নাম জড়ায়, অপরাধের চেয়ে ওই নারীর ব্যক্তিগত জীবনই মুখ্য হয়ে পড়ে। মানুষ নারীর ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশ নিজেদের মৌলিক অধিকারের অংশ বলে মনে করে। আর এর বহু উদাহরণ ছড়িয়ে আছে আশেপাশে। জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর ঘটনা সকলেরই জানা। করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তার ব্যক্তিগত জীবন। তার ব্যক্তিগত কিছু ছবি অনুমতি ছাড়াই ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমনকি অনেক গণমাধ্যমকেও সেই ছবি ব্যবহার করতে দেখা যায় অনবরত।

লোকচক্ষুর আড়ালে বহু নারীই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়রানির শিকার। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজের বিশ্বাস নারীর নিজের জীবনের ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়। নারীর যেকোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে যেকোনো পুরুষ হস্তক্ষেপ করতে পারে, এমনটাই চর্চিত এ সমাজে। আর তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী নারী। এমন অবস্থায় ২০১৮ সালে পাস হওয়া ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নারীদের কিছুটা স্বস্তি দেয়। এই আইনে বলা হয়েছে, কারো ব্যক্তিগত বা গোপনীয় কোন তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনায় নারীর মামলার আশ্রয় নেওয়াটা বেশ সহজ হবে। তাছাড়া মানহানির মামলার আশ্রয় নিতে পারেন নারীরা।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আগের তুলনায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়রানির সংখ্যার সাথে সাথে বদলেছে হয়রানির পদ্ধতিও। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সাইবার অপরাধের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি। সেই সাথে পর্নোগ্রাফি, অনলাইনে পণ্য কিনে প্রতারণার শিকার, কপিরাইট লঙ্ঘন ইত্যাদি। তবে এখন এসবের মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে সরাসরি হুমকি; নারীর ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও ফাঁস; অনলাইনে কটূক্তি, অপমানজনক মন্তব্যসহ এই ধরনের অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে অসংখ্য।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এসব হয়রানির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে। তবে এ আইন নিয়ে সচেতনতারও অভাব যথেষ্ট। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পরিচয় গোপন করা প্রায় অসম্ভব। এরপরও ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাম পরিচয়সহ অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ের ওপর অনধিকার চর্চা চলছে। এর বিরুদ্ধে কেউ পদক্ষেপ নিলে ফল কী হতে পারে সে সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা অস্পষ্ট। যদিও বাংলাদেশের মানুষকে বলা হয় ‘শান্তিপ্রিয় ও শান্ত’। মামলা মোকদ্দমার দিকে পারতপক্ষে কম ঘেঁষার চেষ্টাই করি আমরা। সেখানে যদি পরিচয়টা নারী হয়, তবে তো আর কথাই নেই। নারীর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার পথ খোঁজার অধিকার নেই এমনটি বিশ্বাস করে নিয়েছেন এদেশের নারীরাও। তাই ডিজিটাল মাধ্যমে নানান হয়রানির পরও মামলার দিকে ঝোঁকেন খুব কম সংখ্যক নারী।
 
সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের এক জরিপ বলছে, ডিজিটাল মাধ্যমে সাইবার হামলার ভুক্তভোগীদের সিংহভাগই নারী। সাইবার হামলার ৫২ শতাংশ অভিযোগই আসে নারীদের কাছ থেকে, তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ নারীই জানেন না কীভাবে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ২৫ শতাংশ নারী মনে করছেন আইনের আশ্রয় নিয়ে লাভ হবে না। এই জরিপে আরো জানা গেছে, সাইবার হামলার শিকার ৭৪ শতাংশ নারীদেরই বয়স ১৮-৩০ বছরের মধ্যে। আরেকটি তথ্য বলছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মোট মামলার ৭৫ শতাংশই আসে নারীদের কাছ থেকে। অর্থাত্ ভুক্তভোগী যে নারীরাই বেশি তার আরো একটি প্রমাণ এই জরিপ। যদিও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় যেকেউ এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে এখন নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও সাইবার হামলার শিকার হচ্ছেন।

একটি দেশের আইন নির্ধারিত হয় সেই দেশের জনগণের স্বার্থে। তবে আইনের সার্থকতা তখনই, যখন এই আইনের সাথে জনসংযোগ ঘটে, জনগণ নিজের ও জাতির স্বার্থে আইনের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হয়। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মূল বিষয় সম্পর্কে এখনো বাংলাদেশের মানুষ অজ্ঞাত। কারোর ‘ব্যক্তিগত জায়গা’ যে নিজের অনধিকার চর্চা এ বিষয়টি মানতে এখনো প্রস্তুত নই আমরা। বিশেষ করে নারীর যে নিজস্ব পছন্দ, জীবনধারণের অধিকার ও নিজস্ব মতামত থাকতে পারে তা যেন আকাশ-কুসুম ভাবনা। এখনো যেখানে আমরা এমন মানসিকতা থেকে বের হতে পারিনি, সেখানে কেবল আইন ও শাস্তি দিয়ে নারীর সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

এখানে দায় কি সরকারের শুধু একার? না, দায় বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের। প্রতিটি মানুষের আছে নিজস্ব জগত ও পছন্দ। অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ব্যক্তিগত বিষয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন যতদিন জাতি শিখবে না ততদিন নারীরা অপদস্ত হতে থাকবে, আইন তৈরি হতে থাকবে আর গ্রেপ্তার-শাস্তি চলতেই থাকবে।

তাই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সবার আগে নারীকেই সচেতন হতে হবে। যেকোনো ধরণের হয়রানিই অপরাধ এটি মাথায় রেখে ‘মেনে নেওয়া’র প্রবণতা বন্ধ করে প্রতিবাদী হতে হবে। প্রাথমিকভাবে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করা যেতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়রানির শিকার হলে [email protected] অথবা [email protected] এই ঠিকানায় ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন। পুলিশ সদর দফতরের ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে ফোন করেও আপনার অভিযোগের কথা জানাতে পারেন। তাছাড়া পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানাতে চাইলে গুগল প্লে স্টোর থেকে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশনের ‘Hello CT’ অ্যাপ্লিকেশনটি (অ্যাপ) ডাউনলোড করে আপনার অভিযোগ জানাতে পারেন। সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, হটলাইন ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে আপনার কথা বলতে পারবেন। মনে রাখা দরকার, আইন তৈরি হয় কল্যাণের জন্য। আপনার অভিযোগ করার বিস্তৃত পথ খোলা আছে। তাই অযথা হয়রানি ও অপমান সহ্য কেন? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নারীকে নিজের সুরক্ষার সুযোগ দিয়েছে, তা আদায় করা নারীর কর্তব্য। একটি পদক্ষেপও হতে পারে যুগান্তকারী।

(লেখক- শিক্ষার্থী, জেসিএমএস বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা