kalerkantho

শুক্রবার । ২০ ফাল্গুন ১৪২৭। ৫ মার্চ ২০২১। ২০ রজব ১৪৪২

দিলু ভাইয়ের জন্যই আজ আমি সাংবাদিক হতে পেরেছি

আতাউর রহমান কাবুল   

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০৫:৫০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



দিলু ভাইয়ের জন্যই আজ আমি সাংবাদিক হতে পেরেছি

২০০৬ সালে বারডেম থেকে রামপুরার বাসায় ফেরার পর দিলু ভাই ও ভাবীর সঙ্গে তোলা ছবি

আমার দেখা একজন চমৎকার মানুষ ছিলেন খ্যাতিমান অভিনেতা, নির্দেশক-পরিচালক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান দিলু ভাই। হঠাৎ ফুসফুসের সংক্রমণজনিত জটিলতায় ভুগে সবার মায়া ত্যাগ করে মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল পৌনে ৭টায় তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

দিলু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় সম্ভবত ২০০৩ সালের দিকে। তিনি তখন দিলকুশার পূর্বাণী হোটেলের ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানেজার। জনকণ্ঠের প্রদায়ক হিসেবে পূর্বাণী হোটেলের বৈচিত্র্যময় ইফতার নিয়ে একটা প্রতিবেদনের জন্য তথ্য আনতে গিয়েছিলাম ওনার কাছে। পরিচয়ের পর দীর্ঘক্ষণ কথা বলে বুঝলাম, তিনি আমাকে অত্যন্ত পছন্দ করেছেন। ওই হোটেলের মালিক মাহবুবুর রহমান জয়নালের উদ্যোগে ছোটদের প্রতিষ্ঠান 'টোনাটুনি'র প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি। তখন ঢাকায় সপ্তাহব্যাপী টোনাটুনি উৎসব হবে। ভারত থেকে সন্দ্বীপ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মাধবী মুখার্জি, মমতা শংকর, হারাধন ব্যানার্জি, শোভা সেন, তপেন চট্টোপাধ্যায়, বৈশাখী ঘোষ, গৌতম ঘোষ, হৈমন্তী শুক্লাসহ অনেক গুণী শিল্পী বাংলাদেশে আসবেন। আমাকে অফার করলেন এই ইভেন্টে জনসংযোগের কাজে জয়েন করতে।

আমি তখন বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী সম্পাদক। পাশাপাশি প্রথম আলো, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, বাংলার বাণী, যুগান্তর, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সসহ বিভিন্ন পত্রিকায় ফ্রিল্যান্সিং লেখালেখি করি। থাকি হাতিরপুল ভূতের গলির এক মেসে। দিলু ভাইয়ের মতো খ্যাতনামা একজন অভিনেতার সঙ্গে কাজ করব এই খুশিতে সানন্দে রাজি হয়ে চাকরিতে যোগ দিলাম। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করার পর সম্ভবত সেটা আমার দ্বিতীয় চাকরি ছিল। হোটেল পূর্বাণীতেই অফিস। আমার মূলত কাজ ছিল মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে। কয়েক দিন পর পর আয়োজন করতাম সংবাদ সম্মেলন। এ ছাড়া বিদেশি অতিথিদের কাগজপত্র ঠিক করার জন্য সচিবালয়েও যেতে হতো।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার অল্প কয়েক দিনের মধ্যে আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠলেন দিলু ভাই। তিনি আমাকে দারুণ স্নেহ করতেন। আমার রুম ছিল হোটেল পূর্বাণীর চার তলায়। অথচ দ্বিতীয় তলায় দিলু ভাইয়ের রুমে এসে বসে থাকতাম সারাক্ষণ। দুপুরে আমাকে নিয়ে অফিসার্স ক্যান্টিনে লাঞ্চ করতেন। 

টোনাটুনি উৎসবের কাজে প্রায়ই যেতে হতো সচিবালয়ে। তখন সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিলেন সেলিমা রহমান। ওই মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা নিজামুল কবির ভাই অনেক সহযোগিতা করেছেন। সচিবালয়ে গেলেও দেখতাম সবাই দিলু ভাইকে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে যেত।

একটা পুরনো প্রাইভেটকার ছিল দিলু ভাইয়ের। তিনি সেটা নিজেই চালিয়ে আমাকে নিয়ে সচিবালয়ে যেতেন। অফিস শেষে প্রায়ই তিনি আমাকে গাড়িতে করে মেসের কাছাকাছি নামিয়ে দিতেন। আমি তখন হাতিরপুল ভূতের গলিতে থাকি। একদিন পরিবাগ পর্যন্ত গিয়ে গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। আশপাশে কোথাও গ্যারেজ নেই। অগত্যা আমি আর দিলু ভাই সেই প্রাইভেটকার ঠেলে ঠেলে আশপাশে গ্যারেজের সন্ধান করতে লাগলাম। আরেক দিন বেইলি রোড এলাকায় গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মতো লোকের এ রকম ভাঙ্গাচোরা গাড়ি কেন জানতে চাইলাম। হেসে কী জবাব দিয়েছিলেন মনে করতে পারছি না।

টোনাটুনি উৎসব উপলক্ষে বর্ণাঢ্য স্মরণিকা বের হবে। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অভিনয় করার স্মৃতি নিয়ে সাক্ষাৎকার নিতে একদিন দিলু ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন চিত্রনায়িকা ববিতার গুলশানের বাসায়। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ উদ্বোধন করেছিলেন টোনাটুনি উৎসব। এরপর পাঁচ দিন অনুষ্ঠান হলো জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে। ভারত থেকে বিশাল এক গ্রুপ সেলিব্রিটি এলেন। সাফল্যের সঙ্গে উৎসব শেষ হলো। কিন্তু দিলু ভাই আমাকে টোনাটুনির চাকরিতে রেখে দিলেন। 

একদিন নৃত্য পরিচালক তামান্না রহমানের নির্দেশনায় সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত 'তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম'-এর নৃত্যনাট্য হচ্ছিল শিশু একাডেমি মিলনায়তনে। সুর করেছিলেন দিলু ভাইয়ের বন্ধু প্রয়াত সুরকার, পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই। আলোক প্রক্ষেপণের কাজে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত তাপস রায়। পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায় চমৎকার চমৎকার রিপোর্ট বের হলো। কিন্তু টোনাটুনি তথা পূর্বাণী হোটেলের মালিক মাহবুবুর রহমান জয়নাল সাহেব আমার ওপর বেজায় চটলেন। ডেইলি স্টার পত্রিকায় দিলু ভাইয়ের নাম এসেছে, কিন্তু জয়নাল সাহেবের নাম নেই কেন জানতে চাইলেন। এটা ঠিক যে সাংবাদিকরা দিলু ভাইকে চিনতেন,  জয়নাল সাহেবকে সে রকম চিনতেন না। তা ছাড়া সাংবাদিকরা নিউজ করেছেন সরাসরি অনুষ্ঠান দেখে। এতে আমার কোনো হাত ছিল না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। রাগ করে চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। পাওনা বেতনও আনতে গেলাম না। দিলু ভাই বুঝিয়ে-শুনিয়ে একদিন বেতন নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

২০০৪ সালে একদিন জানলাম, আমার দেশ নামক একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা বাজারে আসছে। সেখানে জয়েন করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যোগাযোগের কোনো মাধ্যম পাচ্ছিলাম না। একদিন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক রাশিদুন্নবী বাবু ভাইয়ের কাছে গিয়ে ফিরে এলাম। তিনি জানালেন, নিয়োগ শেষ। বাবু ভাইয়ের ছোট ভাই আমাদের জুনিয়র বন্ধু, ভূতের গলি এলাকায় একসঙ্গে থাকি। তবুও কাজ হলো না।

পরে একদিন হোটেল পূর্বাণীতে গিয়ে দিলু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে বললাম, 'আমার দেশ' পত্রিকায় জয়েন করতে চাই। পত্রিকার মালিক বিএনপির মোসাদ্দেক আলী ফালু। এনটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমান বাপ্পী অন্যতম পরিচালক। আমাকে সেখানে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সঙ্গে সঙ্গে বাপ্পী সাহেবকে ফোন দিলেন দিলু ভাই। আমার সম্পর্কে, আমার কাজ সম্পর্কে বেশ প্রশংসা করলেন। দিলু ভাইয়ের কথামতো একদিন বাপ্পী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম কারওয়ান বাজার বিএসইসি ভবনের এনটিভি অফিসে। রিসিপশন থেকে বাপ্পী ভাইকে ফোনে জানানো হলো, আমাকে পূর্বাণী হোটেলের মুজিবুর রহমান দিলু ভাই পাঠিয়েছেন। বাপ্পি ভাই আমাকে একই বিল্ডিংয়ের ১১ তলায় রাশিদুন্নবী বাবু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে বললেন।

আমি বাবু ভাইয়ের কাছে গেলাম। দেখলাম অফিস ডেকোরেশনের কাজ করছেন কাঠমিস্ত্রিরা। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ দেখছেন : প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। এনটিভির বাপ্পী সাহেবের কথা বলায় উনি বললেন, তাহলে তো আপনার সঙ্গে বসে কথা বলতে হয়। এরপর আমাকে নিয়ে তাঁর রুমে গেলেন। পাশের রুমে বসতেন সম্পাদক আমানুল্লাহ কবীর। বায়োডাটা রেখে দিলেন : পরে জানাবেন বললেন। এর কয়েক দিন পর বাবু ভাই নিজেই আমার নম্বরে ফোন করে জানান, আমার চাকরি হয়েছে আমার দেশে। জয়েন করতে চাইলে যেন নিয়োগপত্র নিয়ে যাই। এরপর জয়েনিং লেটার নিয়ে যোগদান করলাম ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে। দীর্ঘ বছর ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা করার অভিজ্ঞতা থাকলেও এই প্রথম কোনো জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক হিসেবে জয়েন করলাম। ওই সময় মাসিক সায়েন্স ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী সম্পাদকের পদটি ছেড়ে দিলাম।

'আমার দেশ' পত্রিকায় জয়েন করে দিলু ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল প্রতিনিয়ত। তাঁর রামপুরার বাসায় প্রায়ই যেতাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০০৫ সালে দিলু ভাই ভারতে যাওয়ার পর গুলেন বারি সিনড্রোম (জিবিএস) রোগে আক্রান্ত হলেন। ভারতের উডল্যান্ড হাসপাতাল থেকে ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে আনা হলে সব কাজ ফেলে তাঁকে দেখতে ছুটে গেলাম। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অ্যাপোলো হাসপাতাল খুঁজে বের করে মনিটরে দেখলাম, চোখের পলকও ফেলছেন না আমাদের সদা হাস্যময় ও প্রাণচঞ্চল দিলু ভাই! ভাবি রানী রহমানসহ তখন আমাদের সে কী কান্নাকাটি। এরপর সাড়ে আট মাসের মতো বারডেম হাসপাতালের আইসিইউতে থেকে কিছুটা সুস্থ হলেন তিনি। ওই সময়টা প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টে ছিলেন তারা। ছেলে অয়ন রহমান, অতুল রহমান ও মেয়ে রিমঝিম- সবাই বেশ ছোট। আমি বারডেমের আইসিইউতেও দেখতে যেতাম। ভাবিকে নিয়ে সচিবালয়ে গিয়েছিলাম আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানাতে। সুস্থ হওয়ার পর দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন তিনি। তাদের বাসায় আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আমি ছিলাম তাঁর পরিবারের সদস্যের মতো।

বেশ কয়েক বছর হলো দিলু ভাই শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে জয়েন করেছেন। এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ইমামুল কবীর শান্ত সাহেব তাঁর বন্ধু। কিছুদিন আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। ওই সময় প্লাজমা ম্যানেজ করার জন্য এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে আমাকে ফোন দিয়েছেন বারবার। দিলু ভাইয়ের তখন সে কী পেরেশানি। শান্ত সাহেব মারা যাওয়ার পর তিনি খুব ভেঙে পড়েন।

ভাবি রাণী রহমানকে তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তাকে রানির মতোই দেখতেন। ভাবির রান্না করা খাবার প্রায়ই ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে লিখতেন, 'আমার রাণী আমার জন্য রান্না করেছে'। আমি মজা করে লিখতাম, আপনি ভাগ্যবান এক রাজা। আপনার পুরো মাথাটাই কপাল!'

আমার চাকরির ব্যস্ততা এবং চলমান বাস্তবতায় বেশ কয়েক বছর ধরে দিলু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। কিন্তু দিলু ভাই আমাকে ভুলেননি। প্রায়ই ফোন করতেন, উত্তরার বাসায় যেতে বলতেন। অথচ যাওয়া হয়নি। মৃত্যুর আগেও তিনি আমাকে স্মরণ করেছেন। তাঁর বড় ছেলে অয়ন রহমান জানাল, হাসপাতালের আইসিইউতে গিয়েও দিলু ভাই নাকি বলেছেন, কাবুলকে বলো আমার অসুস্থতার বিষয়টি মিডিয়ায় ভালোভাবে তুলে ধরতে। জীবনে তো কাউকে ঠকাইনি, কারো সঙ্গে বাটপারি করিনি। এ যাত্রায় আমি আর বাঁচব না। আমি বাঁচব আর মাত্র দুই দিন। সবাই যেন আমার জন্য দোয়া করে।' এর ঠিক দুই দিন পর তিনি চলে গেলেন।

পরম শ্রদ্ধেয় দিলু ভাই,
কান্নায় চোখ ভেসে যাচ্ছে আমার। আর লিখতে পারছি না। আপনার কথা বলা, হাসি, স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভাসছে। আপনার সঙ্গে কেন আমার পরিচয় হয়েছিল? কিভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ভাবতেই পারছি না। দিলু ভাই, আপনি যে কত ভালো মানুষ ছিলেন তা আপনি নিজেই জানেন না। প্রচারবিমুখ, প্রচণ্ড অভিমানী, নিরহংকার, প্রাণবন্ত, সাদা মনের মানুষ আপনি আমাদের মাঝে সারা জীবন বেঁচে থাকবেন। আপনার জন্য আজ আমি সাংবাদিক হতে পেরেছি- এটা আপনি নিজেও কি জানতেন? আপনি সেদিন গুরুত্বসহকারে ফোন না করলে আমার হয়তো সাংবাদিকতায় আসা হতো না। হয়তো বা অন্য কোনো পেশায় চলে যেতাম। এ কথা কোনো দিন আপনাকে হয়নি বলা।

মহান আল্লাহ পাকের কাছে কায়মনোবাক্যে একটাই প্রার্থনা, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের সবার প্রিয় দিলু ভাইকে কবুল করুন। তাঁর কবরকে বেহেশতের বাগান বানিয়ে দিন। পরিবারের প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন।

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা