kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

জো বাইডেন ও বাংলাদেশের অর্থনীতি : এক নতুন সম্ভাবনা?

মোঃ শামীম মাহফুজ স্নিগ্ধ   

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ২০:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জো বাইডেন ও বাংলাদেশের অর্থনীতি : এক নতুন সম্ভাবনা?

নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামীকাল ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করতে চলেছেন। এ নিয়ে রয়েছে অনেক প্রত্যাশা ও হিসাব-নিকাশ। কোনো সন্দেহ নেই, যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। ব্যক্তিজীবনে বাইডেন বেশ বড় সময় জনসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই বাইডেনের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন। বাংলাদেশও এই পররাষ্ট্রনীতির ব্যতিক্রম নয়। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বরাবরই উষ্ণ। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের পক্ষে নয়। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বাইডেন প্রশাসনের জন্য বেশ গুরুত্ব বহন করবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের জের ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে, এমনকি তাঁদের আধিপত্যের জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন জোট থেকে হুট করে বের হয়ে যাওয়ার যে নজির ট্রাম্প প্রশাসন স্থাপন করেছেন, সেটা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলেনি, বিশ্বে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। দেশকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে বাইডেন প্রশাসনকে এই জায়গাতে বেশ ভালো রকমের পরিশ্রম করতে হবে। 

এইবার আসা যাক বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি পোশাকশিল্পের পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশ রপ্তানি আয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের উষ্ণ সম্পর্কের এক অমূল্য নজির। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে। এসব কৌশলের সফল বাস্তবায়নও লক্ষ করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া অর্থনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। নিয়মিত প্রবৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত অবকাঠামো, রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা এবং করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গৃহীত বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা, এগুলো যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে বিবেচনায় রাখবে বাংলাদেশের ব্যাপারে তাঁদের কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে। 

বিশ্লেষকদের ধারণা, অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাইডেন প্রশাসন যথেষ্ট উদার হবে। ট্রাম্পের রক্ষণশীল নীতি শুধু এশিয়া নয়, পুরো বিশ্বেই প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশও কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নয়। ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে বাইডেন প্যারিস চুক্তি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যুক্ত হতে চান। এটা বেশ ভালো দিক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাইডেন শতদিন মেয়াদি অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি আরো নীতিগত কিছু কৌশলের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এগুলো অনেক দেশের অর্থনীতিতে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে বলেই প্রত্যাশা। এ ছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে এই উদ্যোগগুলো ভালো প্রভাব বয়ে আনবে। 

বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা নিয়ে আবারও ভাবতে হবে। যদিও এই সুবিধা আবার ফিরে পাওয়া খুব সহজ কাজ হবে না। এ জন্য এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। রানা প্লাজা ধসের পরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা তুলে নিয়েছিল। জিএসপি সুবিধা মূলত এক ধরনের বাজার সুবিধা, যেখানে স্বল্পোন্নত দেশ তাদের পণ্য ধনী দেশে আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় পেয়ে থাকে, যা রপ্তানি আয়ের দিক থেকে অনেক বেশি সুবিধাজনক। 

এ সুবিধা বাণিজ্য বৃদ্ধি হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতি চাঙ্গা করে ও দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বাণিজ্য সুবিধা দেশগুলোকে বহুমুখী বাণিজ্যে সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নেও সাহায্য করে। এ ছাড়া দক্ষ জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়েও নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

জিএসপির বার্ষিক প্রতিবেদনের বেশ কিছু অংশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ট্রেড রিপ্রেসেন্টেটিভ জরিপ করে। এতে বেশ কিছু দিক তুলে ধরা হয়। জরিপে দেখা যায়, ২০১৮ সালে জিএসপি সুবিধার আওতায় ২৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য আমদানি করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র সর্বমোট ২৩৮.৪ মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি বুক রিভিউ অনুসারে বর্তমানে ১২০টি দেশ এই জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। 

বর্তমানের চলমান জিএসপির মেয়াদ খুব দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। এ জন্য বাংলাদেশের উচিত এই সুবিধা ফিরিয়ে পাওয়ার ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া। শুধু কূটনৈতিকভাবে অগ্রসর হলে চলবে না, দরকার লবিস্টদের সহযোগিতাও। 

ডেমোক্র্যাট সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগে বেশ উদার। মার্কিন বড় বড় সংস্থাকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। কিছু কিছু ব্যাপার মার্কিন মুলুকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে যেমন- বড় বড় সফল প্রজেক্ট বাস্তবায়ন ও গ্রহণ, ইকোনমিক জোনের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি, রাজনৈতিক স্থিরতা, বিদেশি বিনিয়োগের পর্যাপ্ত সুবিধার সৃষ্টি ও জিডিপির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি। 

বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক উষ্ণ, এ বিষয়ে লুকানোর কিছু নেই। অন্যদিকে টেকসই প্রতিযোগিতা ইনডেক্সে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে বিশ্বে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১১৬তম দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এসব বিষয় খুব ভালোমতো যুক্তরাষ্ট্রের নজরে পড়বে। বাংলাদেশকেও এই ব্যাপার নিয়ে ভাবতে হবে যেন সুবিধার জায়গাগুলো তৈরি করা যায়। 

প্রবাসীদের থেকে আগত রেমিট্যান্স, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল তিনটি চালিকাশক্তির একটি। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয় করে থাকে। গত ২০১৯-২০২০ সালে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২৪১ কোটি মার্কিন ডলার। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উদার অভিবাসননীতি ও অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতার ব্যাপারে চিন্তা করবেন বলে আশা করা যায়। 

দিন শেষে বাংলাদেশকে বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যেতে হবে। নতুন নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ট্র্যাক-১ কূটনীতির পাশাপাশি গণমানুষের কূটনীতি নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে বাংলাদেশের সামনে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। মানবাধিকার ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে ভাবতে হবে। মানুষের কাজের পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এর মাধ্যমেই সম্ভব সফল অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা