kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

তুমিও চলে গেলে পিকু!

অনলাইন ডেস্ক   

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০৯:২৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



তুমিও চলে গেলে পিকু!

বিশ সালটা অনেক দাগ রেখে গেল। কিন্তু পিকুকেও তুলে নেবে? মুক্তধারা প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী ছিল সে। পুরো নাম সজীব সাহা। সালেহ শফিক ওর বড় ভাইয়ের সহপাঠী ছিলেন।

শিবের গীত

নটর ডেম কলেজে কার্তিক স্যার জ্যামিতি পড়াতেন। কড়া স্যার। তুখোড় মাথা। পাপ্পু একদিন বলল, ‘জানোস কার্তিক স্যার আমার বাবারে চেনে। যাবি স্যারের বাসায়?’ আমি ভাবলাম, স্যারের সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো করা গেলে হাই বেঞ্চে দাঁড়ানো থেকে রেহাই মিলতে পারে। পরে আমিই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পাপ্পুকে এক বিকেলে স্যারের বাসায় নিয়ে গেলাম। নটর ডেম কলেজের কিছুটা উত্তর দিকে ভাড়া বাসায় থাকতেন স্যার। ওই গলিরই একটা বইয়ের দোকান থেকে আমরা তিন গোয়েন্দার বই ভাড়া নিতাম। পাঁচ দিনে এক টাকা।

দরজা খুলে স্যার ভ্রু কোঁচকালেন। তবে তিনি কিছু বলার আগেই পাপ্পু বলল, ‘স্যার, চিত্তরঞ্জন সাহা আমার পিসেমশাই।’

কোন চিত্তবাবু?

পুঁথিঘর-মুক্তধারার মালিক।

তাইলে তুই কি জওহরের ছেলে?

জি স্যার।

আয় আয় ভিতরে আয়। তোগো ফ্যামিলি দেশটারে কত কিছু দিল। জানোস তো, বইমেলাটাও শুরু করছিল তোর পিসা। একাত্তরে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ মুক্তধারা গড়েছিল। শরণার্থী লেখকদের ৩২টি বই বের করেছিলেন চিত্তবাবু। আরে চিত্তবাবু তো বই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তোরা যে সব হরলাল রায়ের এইম ইন লাইফ পড়ে ডাক্তার হতে চাস? বইটা কে বের করছেন? সত্যেন সেনের মসলার যুদ্ধ, মহাবিদ্রোহের কাহিনির মতো শক্তিশালী বই কে বের করছেন? কৃষণচন্দরের উল্টোগাছের গল্প পড়েছস? এই দেশে তো এখনো (১৯৯০ সাল) রাজাকারদের বিচার চাওয়া যায় না। আর চিত্তবাবু একের পর এক মুক্তিযুদ্ধের বই করতেছেন! মজার বিজ্ঞান শেখানোর রাস্তাও বের করছেন মানুষটা। আহা নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে এসে কী কাণ্ডটাই না করে চলেছেন! আইচ্ছা তোরা কোন গ্রুপে জানি?

গ্রুপ ফাইভ স্যার (নটর ডেমে তখন বিজ্ঞান শাখায় সাতটি গ্রুপে প্রায় ৮০০ ছাত্র ছিল, কে কোন আসনে বসেছে তা দেখে বোঝা যেত—কার কত রোল নম্বর)।

আইচ্ছা কী খাবি?

না স্যার, কিছু না। আমরা আপনারে প্রণাম করতে আসছিলাম।

আরে জওহরের বেটা, কয়টা বিস্কুট আর চা খা।

চা-টা খেয়ে আমরা বিদায় নিলাম খুশিমনে। পরের দিন স্যারের ক্লাস ছিল না। তার পরের দিন স্যার ক্লাসে ঢুকে কাকে কাকে যেন খুঁজলেন? তারপর বললেন, রোল নম্বর টোয়েন্টি সেভেন আর ফিফটি ওয়ান খাড়া। আমি আর পাপ্পু দাঁড়ালাম। স্যার বললেন, স্ট্রেইট লাইনের থার্ড থিওরিটা ক। আমরা দুজনই পারলাম না এবং হাই বেঞ্চে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলাম।

দুপুরবেলা

মুন্সীগঞ্জের আব্দুল্লাপুর থেকে ঢাকায় এসেছি। চাচার বাসায় থাকি। বাসাটির দেয়াল আর পুঁথিঘরের দেয়াল একই। ওরা বের হয় ফরাশগঞ্জের মূল রাস্তা ধরে (লোকে বলে এটাই ঢাকার প্রথম পাকা রাস্তা) আর আমরা বের হই মোহিনী মোহন দাস লেন দিয়ে। ছোট চাচা দু-চার দিনের ভেতরই বের করে ফেললেন উল্টোদিকের লালবাড়ির ফতেহ আলীও নটর ডেমে ভর্তি হয়েছে আর পুথিঘরের পাপ্পুও। পাপ্পুর সঙ্গেই পরিচয় করালেন প্রথম, দেয়ালের ওপাশ থেকে শুধু মাথাটাই দেখা যাচ্ছিল (যাঁরা খান জয়নুলের ১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন দেখেছেন তাঁরা ওই দেয়াল-পরিচয়ের রংরস ধরতে পারবেন)। ঠিক হলো কাল থেকে আমরা একসঙ্গে কলেজ যাব। সকালে  ফতেহ আলীও যোগ দিল। আমরা তিনজন ফরাশগঞ্জ থেকে ১০ টাকা ভাড়ায় কলেজে গেলাম। বিকেলে ফিরে পাপ্পু ওদের ছাদে ব্যাডমিন্টন খেলার দাওয়াত দিল। সদর দরজাটা লোহার, তারপর খালি পাকা অল্প পথ, এরপর কাঠের সিঁড়ি, একটা বারান্দা, তারপর একটা কাঠের মেঝের ওপর পুঁথিঘরের অফিস, এরপর দুই ভবন সংযোগকারী প্যাসেজ, তারপর একটা পাকা সিঁড়ি, তা দিয়ে উঠে গেলে পাপ্পুদের বসার ঘর। ঘরটায় বেতের চেয়ার-সোফা। আমি বসলাম। পাপ্পুর মা খুব পরিপাটি। কিছু খাবার দিয়ে গেলেন। তারপর একটি ১০-১১ বছরের মোটা গোলগাপ্পা ছেলে এসে বলল, ‘দাদা আপনাকে ডাকছেন।’ এটাই পিকু। ভালো নাম সজীব সাহা। পিকুর সঙ্গে সেদিন আর বেশি কথা হয়নি। জানলাম, ও পাপ্পু মানে রাজীব সাহার ছোট ভাই। ওরা দুই ভাই-ই শুধু, বোন নেই কোনো। পিসেমশাই, পিসিমা আর পাপ্পুদের পরিবার একসঙ্গেই থাকে। সবাই মিলে বেশ ছিমছাম পরিবার। এর পর থেকে পুঁথিঘর গেলে নিচতলায় পাপ্পুর পড়ার ঘরেই বসতাম বেশি। শাহীন, হাতিল মাসুম, ছোট মাসুম, অসীম, রবিনসহ অনেক বন্ধু হলো আমার। পিকুর সঙ্গে খুব দেখা হতো না। কাকিমা ওপরে ডাকলে কখনো-সখনো সে এসে টুকটাক কথাবার্তা বলত। গোলগাল ছেলেটা ছিল ভারী মিষ্টি দেখতে। কলেজ শেষ হলে পাপ্পু চলে গেল ভারতে পড়তে। আমি জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হলাম। বাসায় গেলে দেয়ালের ফোকর দিয়ে মাঝেসাঝে পিকুর সঙ্গে কথা হতো। সাধারণ সব কথা—কী করছ? কেমন আছ? কাকিমার শরীর ভালো? ইত্যাদি।

প্রগাঢ় অন্ধকার

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আরো বেশি বন্ধু পেলাম। ডিপার্টমেন্টের, পার্টির, হলের ইত্যাদি। আমার তখন ফুরসত কম কলেজের বন্ধুদের মনে করার। শুক্রবারে গিয়ে গদির (চাচার হলুদের আড়ত ছিল) সরকারের কাছ থেকে আড়াই শ টাকা নিয়ে আসতাম। চাচাকে দেখা দিতে চাইতাম না। সে জন্য তিনি অনুপস্থিত থাকেন এমন সময়েই যেতাম। আমার বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার আগেই পাপ্পু বাণিজ্যবিষয়ক লেখাপড়া করে ফিরে এলো। কাজ নিল তখনকার (৯৯ সাল) ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায়। আমি তারেক মাসুদের প্রডাকশন বয়। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনও করি। আমার আবার ফুরসত কমে গেল। পাপ্পুর বিয়েতে গিয়ে পরে আবার পিকুকে দেখলাম। বেশ বড়সড় মানুষ হয়ে গেছে পিকু। কথা খুব বেশি হয়নি। বন্ধুদের হাই-হ্যালো করে গোশত চিবিয়েই সময় কাটালাম। এর পরপরই সম্ভবত পাপ্পু কানাডা চলে গেল। পিসেমশাই মারা গেলেন ২০০৭ সালে। তার আরো অনেক দিন পর ২০১০ সালে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় কাজ করি। আমাদের ফিচার সম্পাদক মুনির রানার ঘরে দেখলাম পিকুকে। পিকু তার লেখা বই নিয়ে এসেছে। সম্ভবত রিভিউ করাতে চাইছিল। সেদিনও বেশি কথা বলার সুযোগ হলো না। তারপর ২০১৬ সালের কোনো একসময়ে মুক্তধারায় সত্যেন সেনের ‘অভিশপ্ত নগরী’ খুঁজতে যাই। তত দিনে ওদের আগের ভবন বিক্রি হয়ে গেছে। ওরা চলে এসেছে প্যারিদাস রোডে। ‘অভিশপ্ত নগরী’ খুঁজতে গিয়ে জানলাম পিকু মুক্তধারার হাল ধরেছে। সে প্রকাশনা সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী। কিন্তু সেবারও দেখা হলো না। এরপর আরো অনেক দিন গেল। গেল ডিসেম্বরের শেষের দিকে মেসেঞ্জারে দেখি পাপ্পু লিখেছে, ‘তুমি যদি পিকুকে নিয়ে কোনো লেখা লিখতে পারো আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।’ আমি বললাম, ‘পিকুর নম্বরটা দাও।’ পাপ্পু বলল, ‘তুমি বোধ হয় জানো না পিকু মারা গেছে।’

লেখকের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা

ড. আশরাফ সিদ্দিকী স্যারের মতো প্রজ্ঞাবান লেখক ও গবেষক এখন বড্ড বিরল। আমাদের বাংলা সাহিত্যের তারকারা শুধুই হারিয়ে যাচ্ছেন। আমরা প্রকাশকরাও এক বিশাল শূন্যতার ভেতর দিয়ে তরি টেনে নিচ্ছি। উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালে ড. আশরাফ সিদ্দিকী স্যার যখন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন, তিনি প্রথম মুক্তধারার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহা ১৯৭২ সালে একাডেমির মাঠে যে সামান্য ৩২টি বই নিয়ে বসে পড়েছিলেন, সেই উদ্যোগকে আরো এগিয়ে নিতে কয়েকজন প্রকাশক একত্র করে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।

স্যার, আপনি ভালো থাকুন।

সজীব সাহা

প্রধান নির্বাহী, মুক্তধারা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা