kalerkantho

শুক্রবার । ২০ ফাল্গুন ১৪২৭। ৫ মার্চ ২০২১। ২০ রজব ১৪৪২

দুনিয়ার যত দিয়াশলাই প্রদর্শনীর এই আয়োজন

অনলাইন ডেস্ক   

১৯ জানুয়ারি, ২০২১ ০৯:১০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুনিয়ার যত দিয়াশলাই প্রদর্শনীর এই আয়োজন

দুনিয়ায় এই প্রথম দিয়াশলাই ও মোড়ক প্রদর্শনীর এত বড় আয়োজন। এর আগে কখনোই আন্তর্জাতিকভাবে এমন প্রদর্শনী হয়নি। বাংলাদেশ ম্যাচবক্স ক্লাব এর আয়োজক। সঙ্গে আছে অস্ট্রেলিয়ান ম্যাচবক্স কাভার কালেক্টরস সোসাইটি। অনলাইনে এ প্রদর্শনী ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রধান আয়োজক শাকিল হকের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন জুবায়ের আহম্মেদ।

মোট ১৯টি দেশের ৫৪ জন সংগ্রাহক। প্রত্যেকেই প্রদর্শন করছেন নিজেদের দিয়াশলাই। ১৯টি দেশের তো বটেই, সারা বিশ্বেরই সমাজ-সংস্কৃতির খবর মিলছে প্রদর্শনী থেকে। যেমন ধরুন, অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ফিগের কথা। ৬০ বছর ধরে তিনি সংগ্রহ করে চলেছেন। তাঁর সংগ্রহে নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউ গিনির দিয়াশলাইও আছে। তিনি প্রদর্শন করছেন অস্ট্রেলীয় ম্যাচ ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাস এবং সেই সময়ের দুর্লভ কিছু দিয়াশলাই। রাশিয়ার আলেকজান্ডার মুরায়েভ বেশি পছন্দ করেন স্থাপনার ছবিওয়ালা দিয়াশলাই সংগ্রহ করতে। তার সংগ্রহে আছে মস্কো গেট বা লেনিন স্কয়ার। চেক রিপাবলিকের ইয়ারোমির জিন্দ্রা পছন্দ করেন গৃহস্থালিবিষয়ক মোড়ক। হাত ধোয়া, পানি খাওয়া, রুটির টুকরা, তরমুজ ফালি, চায়ের পাত্র প্রদর্শন করছেন এখানে। স্লোভেনিয়ার স্যান্ডি নভিনেচের সংগ্রহটা ভিন্ন ধরনের। তিনি দিয়াশলাই ভাস্কর্য সংগ্রহে রাখেন। কোনোটা রুপার, কোনোটাবা দস্তার। ম্যাচবক্সের গায়ে জাহাজ বা কুকুর দেখা যায়। ভারতের সমির আর্যের সংগ্রহটা দেখার মতো। কারণ তার সংগ্রহে আমাদের জীবনযাত্রা আছে। নামাজ, জেলে, হনুমান, খেজুরগাছ, এক্কাগাড়ি ও বাঘ-হরিণের মোড়ক দিয়েছেন প্রদর্শনীতে।

বাংলাদেশের ছোট্ট মেয়ে গুলনিহাল বেশি সংগ্রহ করে মানুষের মুখাবয়বের মোড়ক। তাঁর সংগ্রহে মাও জেদং, মেরিলিন মনরো, চার্লি চ্যাপলিন, ভ্যান গঘ, লেডি ডায়ানা, রবিঠাকুর, নজরুল ইসলাম প্রমুখের ছবিওয়ালা দিয়াশলাইয়ের বক্স আছে।

আরো কিছু

চেক প্রজাতন্ত্রের ম্যাচ মোড়ক সংগ্রাহকদের ক্লাবের সভাপতি মার্টিন ফ্রান্তেস প্রদর্শন করছেন ১৮ শতকের কিছু দিয়াশলাই। এগুলোর মধ্যে সেকালের পোশাক, অঙ্গ ভঙ্গিমা বা স্থাপনারীতির প্রকাশ আছে। ব্রিটিশ মাইক প্রাইয়র প্রদর্শন করছেন স্প্যানিশ দিয়াশলাই। মাইক সেই ১৯৬৬ সাল থেকে দিয়াশলাই সংগ্রহ করছেন।  তার খালা-খালুর তামাকের দোকান ছিল। সেখানেই তিনি নানা রকমের দিয়াশলাই দেখতে পান এবং তার সংগ্রহের আগ্রহ জন্মে। ১৮৯৭ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যকার স্প্যানিশ দিয়াশলাই সংগ্রহের আগ্রহ তাঁর। সুইডেনের পিটার প্যালসন হাজির হয়েছেন ১৯ শতকের দিয়াশলাই নিয়ে।

১৮৪০ সালের দিয়াশলাইও তার কাছে আছে। ভারতের গোপী ও সৃজন দে প্রদর্শন করছেন চলচ্চিত্র ও বাঘের সিরিজ। সৃজন দে বলছেন, ১৯৩১ সালে ভারতে আলম আরাকে দিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। পরের বছর হয় ‘বিশ্বমঙ্গল’। তখন থেকেই ম্যাচবক্সে জনপ্রিয়তা পায় নায়ক-নায়িকাদের ছবি। চলচ্চিত্রের প্রচার যেমন বেড়েছে, একই সঙ্গে সময়কে ধরে রেখেছে ম্যাচবক্স। ফুল, অগ্নি, ছায়া, চাঁদনি, দিল, রাজকুমার, ফায়ার, শিকারী, শোলে ইত্যাদি আছে তার সংগ্রহে। 

ইরান থেকে রুহুল্লা আসেমি

জনপ্রিয় ম্যাচবক্স ডিজাইনার রুহুল্লা ইরানের একজন নামি সংগ্রাহকও। ইরানের ৫০ শতাংশ দিয়াশলাই তিনি নকশা করেছেন। বিভিন্ন আকার ও প্রকারের ম্যাচবক্স তিনি নকশা করেছেন। ম্যাচবক্সের মোড়কে তিনি পারস্য সভ্যতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ ছাড়া ইরানের জাতীয় ফুটবল দল, মানচিত্র, খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক দার্শনিকদেরও তিনি সম্মান দিয়েছেন। তার সংগ্রহে ভারতের অনেক দিয়াশলাই রেখেছেন, বিশেষ করে তিনি গান্ধীজির ভক্ত।

এবার দেশের কথা বলি

বাংলাদেশের মেসবাহ রনি দেখাচ্ছেন পূর্ব পাকিস্তান আমলের দিয়াশলাই। মুরগি মার্কা, ঘোড়া মার্কা, কাঁচি মার্কা, হরিণ মার্কা, বন্দুক মার্কা, মাছ মার্কা ও প্রজাপতি মার্কা দিয়াশলাই তিনি দেখাচ্ছেন। আমাদের এখানে হাবিব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, প্রসন্ন ম্যাচ ফ্যাক্টরি, আমিন ম্যাচ ওয়ার্কস, ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, সাত্তার ম্যাচ ওয়ার্কস, এ কে খান কম্পানি, দাদা ম্যাচ ওয়ার্কস, হাসান ব্রাদার্স অ্যান্ড কম্পানি, বাংলাদেশ ম্যাচ কম্পানি ইত্যাদি দিয়াশলাই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছিল।

রনির সংগ্রহে বঙ্গীয় দিয়াশলাই কার্যালয়ের দারুণ কিছু সংগ্রহ আছে। এগুলোর একটির নাম মুক্তি সংগ্রাম। অন্যটির নাম স্বাধীনতা, এর গায়ে লেখা—শুধু মুখে নয়, কাজে ব্যবহার করুন। আরেকটি ম্যাচবক্সের নাম মুক্তির পথ। এর গায়ে লেখা—দেশের পয়সা দেশে থাকা, বিদেশিকে দূরে রাখা।

প্রদর্শনী নিয়ে আরেকটু

অংশগ্রহণকারী ১৯টি দেশের মধ্যে জাপান, ভিয়েতনাম, বুলগেরিয়া, ইউক্রেন, সার্বিয়া, পোল্যান্ড, ব্রাজিল, স্লোভেনিয়াও আছে। প্রদর্শনী উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া পোস্ট থেকে স্মারক ডাকটিকিট মুদ্রিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে দিয়াশলাই ইতিহাসের ওপর ১০টি পোস্টকার্ড সেট। বিশেষ ক্যাটালগ, বিশেষ দিয়াশলাই বক্স তৈরি হয়েছে। আগামী বছর একই সময়ে দ্বিতীয় প্রদর্শনী করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন শাকিল।

এবার শাকিলের কথা

১৩০টি দেশের ২০ হাজারের বেশি ম্যাচবক্স আছে শাকিলের কাছে। তিনি বাংলাদেশ ম্যাচবক্স কালেক্টরস ক্লাবের সভাপতি। শাকিলের বাবাও ম্যাচবক্স সংগ্রহ করতেন। তখনকার ম্যাচবক্সগুলোয় ছোট ছোট শিল্পকর্ম থাকত। অষ্টম শ্রেণি থেকেই শাকিলের সংগ্রহ শুরু। ২০১২ সালে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আবার ম্যাচবক্স সংগ্রহের কাজে লেগে যান। একবার ভারতে ১৫ দিনে ২৫২টি ম্যাচবক্স সংগ্রহ করেছিলেন। ইংল্যান্ডে অনেক রকম নিলামঘর আছে। শাকিল সেসব জায়গায় যেতেনও। দেশে আসার পর আবার যোগাযোগ শুরু করলেন। ম্যাচবক্স বিনিময় হতে থাকল বিভিন্নজনের সঙ্গে। এ কাজ তাকে এতটাই পেয়ে বসেছিল যে ২০১৫ পর্যন্ত অন্য কোনো কাজই করেননি। ম্যাচবক্স সংগ্রহের জন্য তিনি একটি ওয়েবসাইট করেছেন। সেটি দেখে ইংল্যান্ড থেকে পল নামের এক লোক ফোন করে বলেন, ‘আমার বাবা ধূমপায়ী ছিলেন আর ম্যাচবক্সগুলো ফেলে রাখতেন। অনেক জমে গেছে। যদি চান তো নিতে পারেন।’

বাংলার রং

২০১৪ সালে সোনারগাঁও হোটেলে ‘ইন্দোনেশিয়ান ন্যাশনাল ডে’ পালিত হচ্ছিল। বের হয়ে আসার সময় এক টেবিলে চারটি ম্যাচ দেখে খোঁজ নিয়ে শাকিল জানলেন, ইন্দো-বাংলা ম্যাচ কম্পানির সিইও হরতনু আছেন এখানে। তার সঙ্গে দেখা করে বললেন, ‘আমি একজন সংগ্রাহক ও নকশাকার।’ হরতনু খুশি হয়ে বললেন, ‘আমি তোমাকে একটা সুযোগ দেব। তুমি আমাদের জন্য ম্যাচবক্স নকশা করো।’ এরপর শাকিল নকশা করে তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি পছন্দ করলেন; কিন্তু বক্স তৈরি হওয়ার আগেই তিনি বদলি হয়ে গেলেন। তার এক বছর পর একটি ফোন পেলেন শাকিল। ওপাশ থেকে একজন বললেন, ‘আমি জামিল গ্রুপ থেকে বলছি, ইন্দোনেশিয়া থেকে হরতনু বলেছেন আপনাকে দিয়ে ম্যাচবক্স ডিজাইন করাতে।’ প্রথমে শাকিল ১২টি বক্স নকশা করেন আর নাম দেন বাংলার রং। এতে বাংলাদেশের জীবনধারা তুলে ধরেন। ভালো সম্মানীও পেয়েছিলেন। এরপর আরো অনেক কম্পানি তাকে যোগাযোগ করতে বলে এবং তিনি ম্যাচবক্স নকশা করতে থাকেন। এ পর্যন্ত দেশে-বিদেশে তিনি ৪০০ ম্যাচবক্স নকশা করেছেন। তিনি ম্যাচবক্সে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চান। তাঁর নকশায় দেশের বিখ্যাত মানুষ, ইতিহাস, শিল্পকর্ম স্থান পায়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনি দৃক গ্যালারিতে দুটি দিয়াশলাই প্রদর্শনী করেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা