kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ‘মাটির ময়না’

দাউদ হোসাইন রনি

১৩ জানুয়ারি, ২০২১ ১০:৫৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ‘মাটির ময়না’

‘মাটির ময়না’ ছবির একটি দৃশ্য

বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র আছে অনেক। কিন্তু মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র হাতে গোনা। অর্জনের দিক থেকে সব ছবিকে ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু একটি চলচ্চিত্র—তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। অবাক করার বিষয় হলো, সেন্সর বোর্ড শুরুতে ছাড়পত্রই দেয়নি এই ছবিকে। বরং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নষ্টের অভিযোগে নিষিদ্ধ করে ‘মাটির ময়না’কে

বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র আছে অনেক। কিন্তু মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র হাতে গোনা। অর্জনের দিক থেকে সব ছবিকে ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু একটি চলচ্চিত্র—তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’। অবাক করার বিষয় হলো, সেন্সর বোর্ড শুরুতে ছাড়পত্রই দেয়নি এই ছবিকে। বরং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নষ্টের অভিযোগে নিষিদ্ধ করে ‘মাটির ময়না’কে। আরো অভিযোগ ছিল, মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যতিক্রমী উপস্থাপন। বিদেশের মাটিতে পুরস্কার পাওয়ার পর মেলে সেন্সর ছাড়পত্র। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার ক্যাটাগরিতে লড়াইয়ের জন্য পাঠানো হয় ছবিটিকে। এটিই বাংলাদেশের প্রথম ছবি হিসেবে অস্কারে লড়ল। অস্কারের শিকে না ছিঁড়লেও বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেল তিনটি ক্যাটাগরিতে—শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর দুটি পুরস্কার ও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার।

২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সমালোচকদের রায়ে সেরা ছবির ফিপরেস্কি পুরস্কার জিতল ‘মাটির ময়না’। বাংলাদেশের আর কোনো ছবি মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র আসরে এত দূর পৌঁছাতে পারেনি। এ ছাড়া মরক্কোর মারাকেশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও পাকিস্তানের কারা চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির পুরস্কার পায় ছবিটি। বিশ্বের মোট ৩৫টি দেশের প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায় ছবিটি। 

২০০৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের চলচ্চিত্র সমালোচক এলভিস মিচেল এই ছবি সম্পর্কে বলেন, “এ বছরের তো বটেই, যেকোনো সময়ের সুন্দরতম ছবির অন্যতম ‘মাটির ময়না’। ভাসা ভাসাভাবে সত্যজিৎ রায় এবং ইরানি পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামির ছবি থেকে ভীষণ অনুপ্রাণিত মনে হয়েছে তারেককে। তাঁর গল্প বলার ধরন ভীষণ অকপট।”

২০০৮ সালে আমেরিকান চ্যানেল টার্নার ক্লাসিক ছবি বিভাগে প্রদর্শন করে ছবিটি। অস্ট্রেলিয়ান টিভি চ্যানেল এসবিএ নিজেদের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সেরা ক্লাসিক ছবির সম্প্রচার করে। সেখানেও প্রদর্শিত হয় ছবিটি। ২০১০ সালে নিউ ইয়র্ক স্টেট রাইটার্স ইনস্টিটিউট বিশ্বের সেরা ক্লাসিক ছবির তালিকা করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে। সেখানেও প্রদর্শিত হয় ‘মাটির ময়না’। দুই বছর আগে তারেক মাসুদের ৬২তম জন্মদিনে গুগল তার হোম পেজে বিশেষ ডুডল করেছে। নীল-হলুদ রঙের মাটির তৈরি একটি ময়নার ছবি দিয়ে ‘মাটির ময়না’ নির্মাতাকে বিশেষ সম্মাননা জানিয়েছে গুগল। এর আগে সত্যজিৎ রায়, আকিরা কুরোসাওয়া, সের্গেই আইজেনস্টাইনের মতো চলচ্চিত্রকারদের একইভাবে সম্মাননা জানিয়েছিল সার্চ ইঞ্জিনটি।

কী আছে তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’য়? কেন তারেক মাসুদ এবং ‘মাটির ময়না’ নিয়ে বিশ্বব্যাপী এত আলোচনা? এর আগে বলে নিতে হবে, তারেক পড়াশোনা করেছেন মাদরাসায়। ছবিটি এক অর্থে তাঁর জীবনেরই গল্প। ভারতীয় পত্রিকা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জীবদ্দশায় তারেক মাসুদ বলেছেন, ‘এই ছবি আমার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ছোটবেলায় আমি যেমন ছিলাম, ছবির মূল চরিত্র তেমনই। আমাকেও এমন একটি মাদরাসায় পাঠানো হয়েছিল, সেখানে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। আমার অভিজ্ঞতার চিত্রই পাবেন এই চলচ্চিত্রে।’

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, এই সময়ে পটভূমিতে যুদ্ধ ও ধর্মের কারণে বিচ্ছিন্ন একটি পরিবারের গল্প ‘মাটির ময়না’। মূল চরিত্র কিশোর আনু। তার বাবা কাজী হোমিওপ্যাথি চর্চা করে। প্রচণ্ড ধর্মান্ধ মুসলিম কাজী। আনুর মা আয়েশা স্বভাবে ডানপিটে ছিল একসময়। বিয়ের পর কাজীর ধর্মান্ধতার কারণে নিজেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে নেয়। আনুর ছোট বোন আসমা। চাচা মিলনের সঙ্গে হিন্দুদের পূজা উৎসব আর নৌকাবাইচ দেখতে যায় আনু। বিষয়টি পছন্দ হয় না কাজীর, ‘হিন্দুয়ানি’ পরিবেশ থেকে উদ্ধার করতে ছেলেকে পাঠিয়ে দেয় মাদরাসায়। নিঃসঙ্গ সহপাঠী রোকনের সঙ্গে আনুর বেশ খাতির হয়ে যায়। এরই মধ্যে শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। চরিত্রগুলোর নিজেদের মনোজগতের সঙ্গে যুদ্ধ আর স্বাধীনতার যুদ্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে। তিন ধরনের পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্ব উপস্থিত এই ছবিতে—নারী-পুরুষ বা অন্দর-বাহির বিষয়ক দ্বন্দ্ব, প্রকৃতি-প্রতিষ্ঠান বিষয়ক দ্বন্দ্ব এবং ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বনাম ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এসব দ্বন্দ্বকে প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালক ব্যবহার করেছেন লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান—লোকগান, ধর্মীয় বাহাস, নৌকাবাইচ, ভাষা ও উচ্চারণ, গ্রামীণ মেলা, নকশি কাঁথা, মাটির তৈরি পাখি, চিত্রকর্ম ও পুঁথিপাঠ। সব মিলিয়ে ‘মাটির ময়না’ হয়ে উঠেছে অনবদ্য এক দৃশ্যকাব্য।

২০১১ সালে মানিকগঞ্জে শুটিংয়ের লোকেশন দেখে ঢাকায় ফেরার পথে আরিচা মহাসড়কে গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর। দেশভাগের গল্প নিয়ে ‘কাগজের ফুল’ নির্মাণের পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। সে সময় তারেক মাসুদ কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘মাটির ময়না’র সাফল্যকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে ‘কাগজের ফুল’-এর। আফসোস, তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর শিগগিরই ফুটছে না ‘কাগজের ফুল’, আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভাগ্যও আর ফোটেনি, সেভাবে হাসেনি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা