kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ৯ মার্চ ২০২১। ২৪ রজব ১৪৪২

বিজয়ের নয়, বিশ্বজয়ের পতাকা

মাসুদ পারভেজ

১২ জানুয়ারি, ২০২১ ১৭:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিজয়ের নয়, বিশ্বজয়ের পতাকা

ছবি : মীর ফরিদ

যা দিতে পেরেছে কেবল ২০১৯-এর বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। ৯ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্কে ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরা অধিনায়ক আকবর আলীর সঙ্গে তাই অনন্য ‘আকবর দ্য গ্রেট’ বিশেষণও মানিয়ে গেছে দিব্যি। পরের চার বছরের জন্য যুব ক্রিকেটের বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় উঠেছে তরুণ এই সম্রাটের সুযোগ্য নেতৃত্বেই

বিশ্বের কত মাঠেই না ক্রিকেটে লাল-সবুজের বিজয় নিশান উড়েছে! তবু ক্লাসের ফার্স্ট বয় আর ভালো ছাত্রের তফাতটা রয়েই যাচ্ছিল। টুকরো টুকরো সাফল্যে গলায় বিজয়মাল্য উঠছিল ঠিকই; কিন্তু এর কোনোটিই যে বিশ্বজয়ের পতাকা ওড়াচ্ছিল না। ক্রিকেটাররাও বিজয়ী বীর হিসেবে নানা সময়ে চিহ্নিত হয়ে এসেছেন, তবে দিগ্বিজয়ীর আসনে চড়ে বসতে পারছিলেন না। সে জন্য যে চূড়ান্ত বিজয়ের রাজমুকুট মাথায় শোভা পেতেই হতো।

অজেয় সেই আকাঙ্ক্ষাই কি না এমন সময়ে পূর্ণতার সৌধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল, যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী প্রায় সমাগত। শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে মাঝবয়সী দেশ ‘ফিফটি’তে পৌঁছার ঠিক আগে ক্রিকেটের সেই ভালো ছাত্র সবাইকে পেছনে ফেলে প্রথম হওয়া কীর্তির নাগাল পেয়ে গেল। বিশ্বজয়ের গৌরব আর সৌরভে মাখামাখি হলো ১৬ কোটির এই ভূখণ্ড। 

যেখানে ক্রিকেটের সাফল্যে রঙিন হয় মানুষ, আবার ব্যর্থতায় হয় ব্যথিতও। জীবনের সব রং মিশে থাকা খেলাটির সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও মাহমুদ উল্লাহরা একেকজন তাই কখনো কখনো হয়ে ওঠেন সেই স্বপ্নযানও, যেটিতে ভর দিয়ে সাফল্যের শেষ চূড়ায় পৌঁছে যাওয়ার আশায় থাকেন ক্রিকেটামোদীরা। এমন নয় যে তাঁদের হাত ধরে সাফল্য আসেনি। যদিও এর কোনোটিই চূড়াছোঁয়া নয়। ২০১৫-তে তাঁরা বাংলাদেশকে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে গেছেন বটে; কিন্তু সেটি তো আর বিশ্বজয়ের অনির্বচনীয় অনুভূতির স্বাদ দিতে পারেনি।

যা দিতে পেরেছে কেবল ২০১৯-এর বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। ৯ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্কে ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরা অধিনায়ক আকবর আলীর সঙ্গে তাই অনন্য ‘আকবর দ্য গ্রেট’ বিশেষণও মানিয়ে গেছে দিব্যি। পরের চার বছরের জন্য যুব ক্রিকেটের বিশ্ব শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় উঠেছে তরুণ এই সম্রাটের সুযোগ্য নেতৃত্বেই। সুবাদে ‘রেইনবো নেশন’ নামে পরিচিত দেশটির ছবির মতো ছোট্ট এক শহরের সেই মাঠটি যেন হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিরকালীন এক তীর্থভূমিও।

যদিও পৃথিবীর কত মাঠই না যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেটতীর্থের মর্যাদা পেয়ে এসেছে। সেই ১৯৯৭ থেকে শুরু। ফাইনালে কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জিততেই মালয়েশিয়ার কিলাত ক্লাব মাঠ এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে পুণ্যভূমির স্বীকৃতি পেয়ে যায়। এরপর লম্বা বিরতি দিয়ে হলেও রূপকথার মতো একেকটি ক্রিকেট সাফল্য আরো অনেক ভেন্যুকেই তা এনে দিয়েছে। ১৯৯৯-এ প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে পাকিস্তান বধ কাণ্ডের সেই নর্দাম্পটনও তো সে রকমই এক মাঠ। কিংবা ওয়েলসের কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন, যেখানে ২০০৫ সালে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়ার মতো দলেরও দর্প চূর্ণ করেছিল বাংলাদেশ। এই তালিকায় অবধারিতভাবেই উঠে আসে ত্রিনিদাদের পোর্ট অব স্পেনের কুইন্স পার্ক ওভাল এবং গায়ানার ব্রিজটাউন। ২০০৭-এ ত্রিনিদাদের জয়ই বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল একরকম। এরপর গায়ানায় তখনকার ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর দল দক্ষিণ আফ্রিকাকে সুপার এইটে হারানো। ২০১৫-র অ্যাডিলেডও বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে, যেখানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছিল মাশরাফি বিন মর্তুজার দল।

কিন্তু শেষ বিচারে এর কোনোটিই পারেনি চূড়ান্ত সাফল্যের দুয়ার খুলতে। আইসিসি ট্রফি জয় তখনকার প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে অতুলনীয় সাফল্য ছিল। এত বছর পর পেছনে ফিরে দেখলে সেটি শুধুই ছিল বিশ্ব আসরে অংশ নেওয়ার ছাড়পত্র। সেই বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে হারে হারে ব্যতিব্যস্ত বাংলাদেশকে খালি হাতে না ফেরার তৃপ্তিই কেবল দিয়েছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়। কার্ডিফের সেই অবিস্মরণীয় জয় কিংবা ত্রিনিদাদ ও গায়ানার কীর্তি ওই সময়ের বাংলাদেশ দল বিবেচনায় বীরত্বসূচকই ছিল। পরাক্রমশালী দলগুলোকে নাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরেকবার জানান দেওয়া গিয়েছিল অ্যাডিলেডে ২০১৫-র বিশ্বকাপেও।

ইতিহাস সেসব সাফল্য সোনার অক্ষরে লিখেও রেখেছে। যদিও এর প্রতিটিই এক ধাপ পেরিয়ে আরেক ধাপে পা রাখার চিহ্নই আঁকতে পেরেছে কেবল। তা ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় দল বিশ্ব ক্রিকেটে ভালো ছাত্রের স্বীকৃতি পেলেও কখনো ‘ফার্স্ট বয়’ হওয়ার সম্ভাবনা জাগাতে পারেনি, যেটি পেরেছিল বাংলাদেশ যুব দল। যুব ক্রিকেটে বরাবরই সমীহ জাগানো শক্তি তারা। ২০১৬ সালে নিজেদের মাটিতে যুব বিশ্বকাপে চূড়ান্ত সাফল্যের খুব কাছাকাছিও গিয়েছিল। কিন্তু সেমিফাইনাল থেকে বিদায়ের বিষাদে ডুবতে হয় তাদের। বারবার এ রকম হতাশার গল্পে তাই দক্ষিণ আফ্রিকায় সব শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে আকবর আলীরা তেমন মনোযোগ কাড়তেও পারেননি। সেই তাঁরাই পরে হয়ে যান সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। দেশকে আর কে কবে বিশ্বকাপ ট্রফি এনে দিতে পেরেছে! পচেফস্ট্রুমের সেনওয়েস পার্কও তাই হয়ে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবুজতম তৃণভূমি!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা