kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পথে পথে-৫

শান্তনার জীবনের করুণ গল্প

লায়েকুজ্জামান   

৩০ নভেম্বর, ২০২০ ১৭:১৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শান্তনার জীবনের করুণ গল্প

ছোট বেলায় দাদির কাছে একটি গল্প শুনে বহুদিন আড়ালে অন্তরালে কেদেঁছি। মনে আছে সেই গল্পটিও। বাবা বাণিজ্যে গিয়ে দুর্বিপাকে পড়ে ফিরছেন না অনেক দিন। একমাত্র কিশোরী মেয়ে সুকন্যাকে বাড়িতে রেখে মা গেলেন নদীর ঘাটে। মগ জলদস্যুরা ধরে নিয়ে গেল মা'কে। খবর পেয়ে নদীর ঘাটে গিয়ে সুকন্যার সে কি আহাজারি। তারপর আরো অনেক কথা। সওদাগর কন্যা  সুকন্যার দুখের কাহিনি। এখনো মনে হয় সেই সুকন্যা যেন এ দেশের  কোনও এক নদীর ঘাটে এখনো গড়াগড়ি করে কাদঁছে তার মায়ের জন্য। শিশুবেলায় শোনা সুকন্যার দুখের কাহিনি যেন আজও চোখে ভাসে। 

সিডর বিধ্বস্ত বরগুনার গোড়া পদ্মা গ্রামের শান্তনার কাহিনি শুনে বারবার ছোট বেলায় দাদির কাছে শোনা সেই সুকন্যার গল্পটিই মনে পড়ছিলো। সাগর পাড়ে কেয়া গাছেরর তলে শান্তনার গড়াগাড়ি আর আহাজারির সেই ছবিটি আজও স্মৃতি থেকে মুছতে পারি না। ভুলতে পারি না শান্তনা বৈরাগীর হৃদয় নিংড়ানো কথা গুলো, ‘ভগবান একি করলে আমি এখন কোথায় যাবো? ত্রিভূবনে আমার যে কেউ নেই। ভগবান তুমি মা বাবার সাথে আমাকে কেন নিলে না?’ শান্তনাকে শান্তনা দেবার কোন ভাষা  জগতে আছে কি না জানি না, আমি কোন ভাষা খুজেঁ পাইনি।

২০০৭ সালের নভেম্বর মাস। ১৫ নভেম্বর ঘুর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানে উপকূলীয় এলাকায়। সিডরে বিধ্বস্ত বরগুনায় গিয়েছিলাম  রিপোর্ট করতে। বরগুনা পৌছানোর পর থেকেই মানবজমিনের বরগুনা প্রতিনিধি বন্ধু মুজিবুল হক কিসলু  প্রায় প্রতিটি ঘণ্টা খবর নিয়ে আসছিলেন , কোন এলাকতে বেশি ক্ষতি হয়েছে কোনও এলাকা বেশি বিধ্বস্ত হয়েছে। কোন এলাকায় বেশি মানুষ মারা গেছে। খবরের পর খবর। ঠিক করতে পেরে উঠছিলাম না আগে কোন এলাকায় যাওয়া যায়। সিদ্ধান্ত নিলাম আগে যাবো বেশি দুর্গম এলাকায়। কিসলু বললেন, এখন সব এলাকাই দুর্গম,এমন কি শহরতলী পর্যন্ত। কিসলুর ওপর খানিকটা বিরক্ত হলেও তার কথার সত্যতা পেয়েছি মাঠে নামার পর। 

গোড়া পদ্মা গ্রামের খবর পেলাম চার দিন পর। একেবারে সাগর তীরে ওই গ্রামটি। বরগুনা জেলা সদর থেকে তের কি চৌদ্দ কিলোমিটার হবে। তিন থেকে চার কিলোমিটার যাওয়া যাবে ভ্যানে তারপর পায়ে হেটে এমনটাই জানিয়েছিলেন কিসলু । বরগুনায় এসে প্রতিদিন দু’টি করে রিপোর্ট পাঠাই। অফিসে বলে রাখি একটি রিপোর্ট রেখে দিতে হবে পরের দিনের জন্য। যোগাযোগের যা অবস্থা তাতে সকালে বের হয়ে বিকেলে ফিরে রিপোর্ট পাঠানো অসম্ভব। ফিরতে রাত হয়ে যায়। রাতে রিপোর্ট লিখি। রাতেই সেন্ট করি। রাত তিনটে কোন রাতে চারটেও বাজে। আবার ভোর ৫টায় উঠে গ্রামে যাই। খবরের কোন অভাব নেই। বরগুনার যেখানেই যাই সেখানেই খবর। পথে পথে খবর। বাড়িতে বাড়িতে খবর। সিডরে মৃত্যুর খবর, নটা ঘাস,কলার থোড়, কলার কচিঁ পাতা চিবিয়ে জীবন ধারনের খবর নিজ চোখে দেখেছি । লবন ছাড়া গরম পানিতে মাছ সিদ্ধ খাওয়া ,কাঁচা কলা সিদ্ধ খাওয়া । অবশ্য এগুলোকে আর খবর মনে হয়নি তখোন। খবর ছিলো আরো ভয়ঙ্কর কিছু। ছুটেছি সে গুলোর পেছনে। 

গোড়া পদ্মা গ্রামে পৌছাতে বেজে গেল দুপুর দেড়টা। সাগর তীর থেকে মাত্র শ’পাচেঁক গজ দূরে ওই গ্রামটি। গ্রাম বলে কিছু নেই,আছে গ্রামের চিহ্ন। কাছে গেলে বোঝা যায় একদা এখানে বসতি ছিলো। পুরো গ্রামের ঘরবাড়ি গুলো উড়িয়ে নিয়ে রেখেছে এখান থেকে দেড় থেকে দু’ কিলোমিটার দূরে।  মানুষ গুলো বসে আছে গ্রামের পাশের বেড়ি বাধের ওপর।  জানা গেল গোড়া পদ্মা গ্রামের ৫শ লোকের মধ্যে সিডরে মারা গেছে পচাত্তর জন। 

লেখাটি শুরু করেছিলাম শান্তনাকে নিয়ে। এখানেই দেখা শান্তনার সঙ্গে। শান্তনার কথা শুনতে গিয়ে নোট লেখা বন্ধ হয়ে যায়। কলম আর চলে না। তার অজোর কান্না , আহাজারি আর বিলাপ । বাতাশ ভারী হয়ে ওঠে। ঝড় শুরু হওয়ার প্রায় সাথে সাথে,গ্রামের সকলের আগে ঘর ছেড়ে শান্তনা এবং তার মাকে নিয়ে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেন কমলেশ বৈরাগী। বড় একটি বাবলা গাছ জড়িয়ে ধরে দাড়াঁন তিন জন। হঠাৎ কমলেশ বৈরাগীর মনে পড়ে তার গরু চারটি ছেড়ে আসা হয়নি। দৌঁড়ে যান বাড়ির দিকে। বেড়িবাঁধ থেকে মাত্র এক'শ গজ দূরে বাড়ি। কমলেশ বৈরাগীর ফিরে আসতে দেরি দেখে তার স্ত্রী যান তাকে দ্রুত এগিয়ে আনতে। 

বেড়িবাঁধে গাছ ধরে তখন একা দাঁড়ানো শান্তনা। কমলেশ বৈরাগী স্ত্রীকে নিয়ে ফিরছিলেন বেড়িবাঁধে। শুরু হয়ে যায় আসল ঝড়। আর বেড়িবাঁধে ফেরা হয়নি তাদের। বাঁধ থেকে মাত্র পনের গজ দূরে মৃত্যু হয় তাদের দু’জনের। বেচেঁ  থাকে শান্তনা একা। তের চৌদ্দ বছরের শান্তনার পিতৃকূল মাতৃকূলে নেই কোনও আত্মীয় স্বজন। গোড়া পদ্মা গ্রামে ওর বাবা ছোট বেলায় এসে বসবাস শুরু করে। এখানে জায়গা কিনে বাড়ি করে। সাতআট বিঘা ধানের জমি ও কিনে। স্বচ্ছল সংসার ছিল তাদের। ও গ্রামে আর কোন হিন্দু পরিবার নেই। শান্তনা জানে  তার মায়ের বাবার বাড়ি ছিল বরিশালে। সেখানে কেউ নেই  তাদের। বাবা বলতেন তার আদি নিবাস ছিলো বাগেরহাটে। ছোট বেলায় একই সঙ্গে বাবা মা হরানোর পর পথহারা পথিকের মত ঘুরতে ঘুরতে এসে ঠাই নেয় এখানে। প্রথমে সমুদ্রে মাছ ধরার কাজ করতো। ধীরে ধীরে কিছু টাকা জমিয়ে ফসলী জমি কিনে চাষাবাদ শুরু করে। শান্তনার জন্মের পর আর সমুদ্রে যায়নি।

ঘরে ধান ছিল চাল ছিল। নগদ টাকা ও ছিলো। গোয়ালে গরু ছিল। সিডরের আঘাতে সব শেষ। বাড়ির চিহ্ন টুকু আছে মাত্র। সিডরে আঘাত হানে ১৫ নভেম্বর। শান্তনার সাথে দেখা ২১ নভেম্বর। মাঝে ৫ দিন। কোনও দানা পানি পড়েনি পেটে। ঘরে কোনও খবর নেই,ঘরে খাবার থাকবে কি করে ঘরই তো নেই। গ্রামের কারোই পেটে কিছু নেই। স্বজন হারানো কাউকে শান্তনার বাণী শোনানোর ও কেউ নেই । কে কাকে শান্তনা দেবে? গোড়া পদ্মা গ্রামে এমন একটি পরিবারেও নেই যাদের কোনও স্বজন হারানো যায়নি। 

সিডর কেড়ে নিয়েছে কারো সন্তান কারো স্বামী কারো স্ত্রী কারো বা ভাই কারো বোন। ঘরে ঘরে কান্না। ঘরে ঘরে অনাহার। ক্ষুধার যন্ত্রনা চার দিন পর অনেকের স্বজন হারানো বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছে। দেখলাম স্বামী হারা এক মা তার সন্তানকে সাগর পাড়ের নটা ঘাসের গোড়ার অংশ ছাড়িয়ে দিচ্ছে চিবানোর জন্য তাতে যদি কিছুটা ক্ষুধা কমে। পত্রিকায় গোড়া পদ্মা গ্রামের খবর প্রকাশের পর হেলিকপটার থেকে শুকনো খাদ্য ফেলানো হয়েছিল। 
বরগুনায় থাকতে বারবার মনে হয়েছে,আরেকবার যাই গোড়া পদ্মা গ্রামে,শান্তনাকে দেখে আসি। যাওয়া হয়নি। তারপর অনেক বছর,সিডরের কথা মনে উঠলেই যেন চোখে ভেসে ওঠে শান্তনার আহাজারির কথা। মাঝে মাঝে মনে হয় প্রকৃতি কতই না নিষ্ঠুর। মনে পড়ে শান্তনার শেষ বাক্যটি ‘ভগবান’ তুমি এত নিষ্টুর হলে কি ভাবে? আমি এখন কোথায় যাবো? কার কাছে যাবো?

লেখক-গণমাধ্যমকর্মী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা