kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

পথে পথে-৪

শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হলো ফরিদ ভাইকে

লায়েকুজ্জামান   

২২ নভেম্বর, ২০২০ ১৭:২৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হলো ফরিদ ভাইকে

ফরিদ ভাই সমাজটা বদলাতে চেয়েছিলেন। সে জন্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি পারেননি। সমাজ তাকে থামিয়ে দিয়েছে। থেমে যেতে বাধ্য করেছে। জন্ম পরিচয় শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দিয়েছে আত্মহননের পথে। প্রতিভাবন মানুষ-একজন কলেজ শিক্ষক ফরিদ ভাই গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। জন্মের দোষ তার নয়। মা যৌনকর্মী ছিলেন এটা তো ফরিদ ভাইর অপরাধ নয়। লেখাপড়া শিখে সরকারি কলেজের শিক্ষক হয়েছিলেন তিনি। তারপর একদিন অপবাদে, নিজেকে নিজেই শেষ করে দিলেন।

ফরিদ ভাইর মৃত্যু দিনটা মনে আছে, স্পষ্ট। প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনা। খবর পেলাম ফরিদ ভাই নিজ বাসায় গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। হাতে অনেক কাজ, সব ফেলে ছুটে গেলাম ফরিদ ভাইর বাসায়। ঘরে তখন পুলিশ, ফরিদ ভাইয়ের নিথর দেহটা মেঝেতে শোয়ানো। গলায় ফাসঁ নেয়ার দাগ। লাশটা দেখে ভেতরটা তোলপাড় হয়ে গেল। বেরিয়ে এলাম। বাসার নিচে এসে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। বোধশূন্য অবস্থা আমার। ফিরে এলাম। 

ফরিদ ভাই আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত বড় ভাই। সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো। ফরিদ ভাই ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের নেতা। আমাদের দু’জনের  রাজনীতি,দল ও আদর্শ ভিন্ন থাকলেও মতের মিল ছিল এক জায়গায়, তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন,সমাজটা বদলানো দরকার। এ বিশ্বাস আমারও। ফরিদ ভাই ছিলেন মেধাবী মানুষ। পড়াশোনা করতেন। দু’এক বেলা না খেয়ে থেকে টাকা জমিয়ে বই কিনতেন। পড়া শেষে ডেকে বইগুলো আমাকে দিতেন। ফরিদ ভাই মনে করতেন আমি হয়তো তার সম্পর্কে জানি, জানার পরও তার সম্পর্কে নিবিড় ভাবে মেলামেশা করি, হয়তো এ কারণে অতিরিক্ত স্নেহ করতেন আমাকে। আসলে আমি তার সম্পর্কে জেনেছি আরো অনেক পরে। ফরিদ ভাইর জন্ম পরিচয় জানার পরও তার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ কমেনি বরং শ্রদ্ধা আরো বেড়েছিল। 

ফরিদ ভাই ছিলেন এক যৌনকর্মীর সন্তান। তার জন্ম পতিতালয়ে। যৌন কর্মীরাও সন্তান ধারণ করেন। সন্তান মেয়ে হলে খুশি হন তারা। মেয়ে বড় হলে তাকেও লাগিয়ে দেন নিজের পেশায়। তবে ছেলে সন্তান হলে বড় বিপদে পড়েন যৌনকর্মীরা। ছেলেদের কোথায় রাখবেন। ছেলে বড় হলে তার কি পরিচয় হবে? পিতার নাম পাবেন কোথায়? এমন নানা যন্ত্রনার কারণে যৌনকর্মীদের কাছে ছেলে সন্তান মানেই এক দুসংবাদ। ফরিদ ভাইর জন্মের পর তার মা শহরের  এক লোকের কাছে দিয়েছিলেন তাকে। ওই পরিবারের পরিচয়েই বড় হচ্ছিলেন ফরিদ ভাই। তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। ছিলেন ক্লাসের ফার্স্টবয়। চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে জীবনে আরো একটি বড় বাঁক আসে। যার ঝুঁকি সামলানও মুশকিল ছিল। 

যে পরিবারের পরিচয়ে বড় হচ্ছিলেন প্রায় একই সঙ্গে মৃত্যু হয় পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর। এরপর ফের পরিবার বদল করতে হয় তাকে। জন্মদাত্রী মা ফরিদ ভাইকে রাখেন আরেক পরিবারের কাছে। যৌনকর্মী মা মাসে মাসে পড়াশোনাসহ খাওয়ার খরচ দিয়ে যেতেন। এ ভাবে ফরিদ ভাই এক সময়ে জেনে যান তিনি যৌনকর্মীর সন্তান। এরপর বিষয়টি ছড়ায় সমাজে। তবে অদম্য ফরিদ ভাই দমে যাননি। জেলা শহরের পড়াশোনা শেষ করে এসে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

রাজনীতি ছাড়েননি। এক সময়ে জাসদ রাজনীতির ভাঙাগড়ার কারণে কিছুটা নিরাশ হয়ে পড়েন। বিসিএস দিয়ে চাকরি পান শিক্ষা ক্যাডারে। চাকরির পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর একদিন আমাকে খুঁজে বের করে দীর্ঘ আলোচনা করলেন,চাকরিতে যোগ দেবেন কি না? অনুরোধ করলাম চাকরি যোগ দিতে, যদিও এর কয়েক বছর পর আমি নিজেও ওই একই পদে চাকরি পেয়ে যোগ দিইনি। সে অন্য বিষয়। ফরিদ ভাই যোগ দিলেন। ঢাকা কলেজে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে। এরপর আর দেখা হয়নি,মৃত্যুর খবর পেয়ে দেখা হলো লাশের সঙ্গে। পরে শুনেছি। ফরিদ ভাই প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন একই কলেজের এক শিক্ষিকাকে। 

এক সময়ে তার স্ত্রী জেনে যায় ফরিদ ভাইর জন্ম পরিচয়। এ নিয়ে ঝগড়া হয়। যৌনকর্মীর সন্তান বলে স্ত্রী চলে যান। স্ত্রী ঘটনাটা বলে দেন কলেজে। তার জন্ম পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে কলেজে তার সহকর্মীদের কাছে। আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন ফরিদ ভাই। খুব মনে পড়ে ফরিদ ভাইকে। তিনি সমাজটা বদলাতে চেয়েছিলেন, পারেননি। গতকাল নিজরে বইয়ের আলমারি খুজঁতে গিয়ে ফরিদ ভাইর দেয়া একটি বই হাতে পড়ল। চে গুয়েভারার ডায়েরি। বইটি তিনি দিয়েছিলেন,বইটির প্রথম সাদা পৃষ্টায় ফরিদ ভাই নিজ হাতে লিখে দিয়েছিলেন‘ জীবন মানেই শত-শত বাধা, থমকে গেলে হেরে যাবে’। আমি চলমান নাকি থমকে গেছি- নিজেই বুঝতে পারি না,তবে জন্ম পরিচয় ফরিদ ভাইকে থমকে দিয়েছে। তথাকথিত সমাজ তাকে থামিয়ে দিয়েছে। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় ফরিদ ভাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা