kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৬ নভেম্বর ২০২০। ১০ রবিউস সানি ১৪৪২

ফুটবলের এই উপহার অনেক রঙিন

ইকরামউজ্জমান   

১৭ নভেম্বর, ২০২০ ০২:৪২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফুটবলের এই উপহার অনেক রঙিন

মাঠে ফুটবল অনুপস্থিত ছিল আট মাস। খেলা আবার ফিরে এসেছে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে সীমিত দর্শক নিয়ে। মাঠে দর্শকের আগমন অনেক বড় আবেগ ও ইতিবাচক দিক। তবে এই বিষয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন স্বাভাবিকতায় ফুটবলের মাঠে আগমন হয়েছে আন্তর্জাতিক খেলায় বিজয়ের স্বাদ উপহার দিয়ে। যে জয়ের জন্য দেশের ফুটবল ভক্ত ও অনুসারীরা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে। আমরা মাঠে দেখেছি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও জয়ের ক্ষুধা—যেটি তাদের ফিটনেস, স্কিলে দুর্বলতা, পর্যাপ্ত অনুশীলনে ঘাটতিকে যথেষ্টভাবে সামাল দিয়েছে! বিশ্বাস আর দৃঢ় মানসিকতার থেকে তো বড় কিছু হতে পারে না! বিশ্বাস তো বলেছে, অবশ্যই নেপালের বিপক্ষে জয় সম্ভব শতভাগ উজাড় করে খেললে। দেশকে সত্যিকার অর্থে কিছু দিতে চাইলে। গোলের খেলা ফুটবল। বাংলাদেশ জাতীয় দল মাঠে সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছে বলেই বিজয়ী হিসেবে মাঠ থেকে ফিরে এসেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ফুটবল ফেডারেশন ফিফার দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচকে তাঁর সম্মানে উৎসর্গিত করেছে। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়লাভের আবেদন, গুরুত্ব ও মর্যাদা অন্য রকম। জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে ফুটবলের এই উপহার অনেক বেশি রঙিন ও উজ্জ্বল। জাতির জনকের তো প্রাণের খেলা ছিল ফুটবল।

ক্রীড়াঙ্গনের কঠিন সময়ে জয়ের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। এই জয় অনেক বড় অনুপ্রেরণা কয়েক মাসের ফুটবল ক্ষতিকে মেরামত করে পুনরায় সচল করার জন্য। বাংলাদেশের ফুটবলের অগ্রযাত্রা অনিবার্য। করোনায় পিছিয়ে পড়া অবস্থার পুনরুদ্ধারের চিন্তা-ভাবনা এবং পাশাপাশি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কাজ শুরু করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি মানেই মাঠে মাঠে ফুটবলময় প্রহর। দেশে ফুটবলের জয়। জয় ফুটবলের মানবিকতার। ফিফার র্যাংকিং সমীহ পর্যায়ে এগিয়ে আনার স্বপ্ন জয়ের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সব মহলের ঐকান্তিকতায় সম্ভব। জেলায় জেলায় ফুটবল উৎসব। জেলা ফুটবলের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দিন। স্বাধীনতাপূর্ব কালে এ দেশের তৎকালীন জেলা ও মহকুমা শহরে ৬০-৭০ বছর আগেও নিয়মিতভাবে ফুটবল ছিল। বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। সঠিক নেতৃত্বে ফুটবলও এগোবে। স্বপ্ন দেখতে হবে। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। তবে বাস্তবতাবর্জিত নয়।

মাত্র দেড় মাস আগে কাজী সালাউদ্দিন চতুর্থবারের মতো ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার পর যেভাবে পুরো টিম নিয়ে বাস্তবতার আলোকে সঠিক সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফুটবলকে মাঠে ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা উল্লেখ করার মতো। ফুটবল ফেডারেশন চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছে। নেপাল আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ফুটবল শুরু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে! ফুটবলের ক্ষেত্রে সুযোগ্য নেতৃত্ব, বিভিন্ন মহলের সহযোগিতা, গ্রহণযোগ্যতা, ফিফা ও এএফসির সঙ্গে সুসস্পর্ক এবং তাদের আস্থা অর্জন করাতে অনেক কাজই সহজ হয়েছে। যতটুকু জানি গত নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই মুজিব জন্মশতবার্ষিকীতে ফুটবলে স্মরণীয় কিছু করার গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করেছেন কাজী সালাউদ্দিন। ভাবেননি তিনি আবার রিটার্ন করতে পারছেন কি পারছেন না এসব কিছু। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জন্মশতবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে হবে। ক্রীড়ানুরাগী জাতির জনক তো সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন মনেপ্রাণে আজীবন ক্রীড়াপিপাসু ও ক্রীড়া মানসিকতাবান্ধব একজন উদার হৃদয়ের ব্যক্তিত্ব। ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ দুর্বলতা। খেলা, খেলোয়াড়, সংগঠক, ক্লাব এবং সাধারণ ক্রীড়ামোদী মহল তাঁকে সব সময় টেনেছে। নিজে স্কুলজীবেন খেলেছেন। তাঁর প্রিয় খেলা ফুটবল। তাঁর আব্বাও ফুটবল খেলতেন। মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলেন। কিশোর মুজিবুর রহমান শুধু স্কুলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি, ভালো দল গঠনের জন্য শিক্ষকদের সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন। স্কুলপর্যায় ছাড়াও তৎকালীন মহকুমায় শিল্ডের খেলায় তিনি স্কুল দল নিয়ে অংশ নিয়েছেন। এসব জেনেছি তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বপ্রথম ঢাকা স্টেডিয়ামে ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশের মধ্যে প্রথম ফুটবল ম্য্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রদর্শনী ম্যাচের উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু শুধু ম্যাচ উদ্বোধন করেননি, মাঠে বসে পুরো খেলা দেখেছেন। উৎসাহিত করেছেন খেলোয়াড় ও সংগঠকদের। খেলায় রাষ্ট্রপতি একাদশ ২-০ গোলে পরাজিত করেছিল মুজিবনগর একাদশকে। বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই রাষ্ট্রীয় কাজে ভীষণ ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভেবেছেন। ভেবেছেন প্রিয় খেলা ফুটবলকে নিয়ে। ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে তাঁর ভিশন ছিল, স্বপ্ন ছিল। বঙ্গবন্ধু সব সময় খেলোয়াড় ও সংগঠকদের সময় দিয়েছেন। বিদেশে যাওয়ার আগে সব সময় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অবগত করেছেন।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ১৯তম মারদেকা ফুটবলে অংশ নেয়। এই দলের অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগে ফুটবল দল দেখা করেছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু সেদিনের স্মৃতিচারণা করে একটি দৈনিকে লিখেছেন, ‘আমাদের দেখামাত্রই বঙ্গবন্ধু তালি বাজিয়ে বললেন, আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। বাংলাদেশ ফুটবল আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে যাচ্ছে। দোয়া করি তোদের জন্য। সব খেলোয়াড়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করলেন বঙ্গবন্ধু।’

১৯৭৫ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ২১তম মারদেকা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী ফুটবল দল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেশ ছাড়ার আগে দেখা করেছিল। এই দলের অধিনায়ক ছিলেন কাজী সালাউদ্দিন, বর্তমানে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি। তিনি সম্প্রতি একটি দৈনিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা লিখেছেন। কোনো ফুটবল দলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এটি ছিল শেষ সাক্ষাৎকার। তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে ছবিও তুলেছিলেন। অধিনায়ক কাজী সালাউদ্দিনকে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘ভালো খেলিস, দেশের মান-ইজ্জত রাখিস।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে চাচা।’

এই হৃদয়বান মানুষটি সব সময়ই স্মরণীয় হয়ে আছেন ফুটবলজগতে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা