kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

‘এ বছরের কিছু সিলেবাস পরের বছর পড়ানো গেলেই ক্ষতি পোষানো যাবে’

রাবেয়া সুলতানা পলি   

২৯ অক্টোবর, ২০২০ ১৯:১৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘এ বছরের কিছু সিলেবাস পরের বছর পড়ানো গেলেই ক্ষতি পোষানো যাবে’

ইদানিং নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে। প্রতিদিন আমার শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করি। প্রতিদিন নিজেকে তৈরি করি ভালো কিছু শিশুদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। প্রতিদিন নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে ভাবতে ভালোবাসি। কিন্তু বাস্তবে কি হচ্ছে! 

করোনার কারণে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। সরকার ৫ অক্টোবর  পর্যন্ত ছুটি বাড়িয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির যে অবস্থা তাতে স্কুল খোলার পর আবার এই সংকট কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটা দেখার বিষয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশে মাধ্যমিকে পড়ছে ১ কোটি ৩৪ লাখের মতো ছেলে-মেয়ে। স্কুল আছে ২১ হাজার, যার প্রায় ৯০ ভাগ বেসরকারি। কলেজ আছে সাড়ে চার হাজারের মতো, শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৪ লাখ। বেশির ভাগ বেসরকারি। প্রাথমিক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থী প্রায় পৌনে দুই কোটি, যার সিংহভাগই সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়ে। 

করোনার সংকট কত দিন স্থায়ী হবে, কেউ বলতে পারে না। আবার শিক্ষাকার্যক্রমও দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে না। ঠিক এই রকম একটা সংকটের মধ্যে গত এপ্রিল মাস থেকে রাজধানীর অনেক স্কুল অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। শিশুদের লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনার সেই চেষ্টায় আমরাও শতভাগ ঝাঁপিয়ে পরেছি। উদ্দেশ্য ইলেকট্রনিক সব ডিভাইসের মাধ্যমে শিশুদের কাছে তাদের নিয়মিত পাঠ নিয়ে হাজির হওয়া। মনে পরে মাত্র কয়েকমাস আগেও এই আমরা শিক্ষকরাই অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত বলে এসেছি ইলেকট্রনিকস ডিভাইস থেকে শিশুকে দূরে রাখতে, কেননা এসব শিশুর মেধাকে নষ্ট করে। 

বাদ দেই সেই সব নীতি কথা। এই সংকটময় মুহূর্তে আমাদের আগামী প্রজন্মকে সচল এবং শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত রাখাটাই প্রধান দায়িত্ব। যেহেতু ঢাকার একটি অভিজাত এলাকার স্কুল তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই  অধিকাংশ অভিভাবকরাও বেশ শিক্ষিত এবং মোটামুটি স্বচ্ছল বলতে পারি। তারপরও প্রতিদিনের জুম ক্লাসে মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে মনোযোগী দেখা যায়। অনেকে ক্লাসে জয়েন্ট করেও ডেকে কোনো সারা পাই না প্রতি নিয়ত। হয়ত সংযোগের সমস্যা অথবা ব্যবহৃত ডিভাইটির, নয়তো অভিভাবকেরা বুঝতেই পারছেন না যে, তার শিশুটি সত্যিই ক্লাস করছে কি না! মূল কথা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার্থীরা এক ভয়াবহ শিক্ষা সংকটে আছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে নিয়মিত ক্লাস শেষ করে পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়তো কিছু প্রক্রিয়ায় তাদের ভিন্ন প্রশ্নপত্রে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কিন্তু স্কুলপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বেলায় সেটা কি সত্যিই মূল্যায়ন যোগ্য নাকি আমরাই শিশুকে অসৎ হতে শিক্ষা দিচ্ছি? 

সেদিন এক পরিচিতের বাসায় গিয়ে দেখলাম তার সন্তানটির ২০ নম্বরের ক্লাস টেস্ট দিচ্ছে এবং ক্যামেরার পেছনে থেকে সেই উচ্চ শিক্ষিত (সার্টিফিকেটধারী) মা তার প্রিয় সন্তানটির ২০ নম্বর পাওয়া নিশ্চিত করছেন। এতটুকু বুঝতে পারছি হয়তো বোধশক্তি হারিয়ে ফেলছি কিংবা বোধশক্তি নামক অর্জিত শিক্ষা আমাদের বিপর্যস্ত, ক্লান্ত এবং বিভ্রান্ত। 

দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকার ফলে যে বিষয়টি সব চেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে সেটা হচ্ছে কিভাবে  শিক্ষার্থীদের আট মাসের পড়ালেখার ঘাটতি টা পোষাবে শিক্ষাবোর্ড? আমাদের বিরাট জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ শিক্ষার্থী মূলত শিক্ষা থেকে দূরে ছিল। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রায় প্রতিটি পরিবারকেই তাদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। অনেক পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে, আবার অনেকে তার সন্তানকে অল্প খরচে পড়ানো যায় এমন বিদ্যালয় খুঁজছেন। অনেকে হয়ত তাদের ছোট্ট সন্তানটিকে কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে খাদ্যের অভাবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে মেয়েরা। হয়ত দারিদ্র্যের কারণে বাল্যবিবাহে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে তাদেরও আর স্কুলে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকছে না। 

২০২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের এ ঘাটতি কি আদৌও পূরণ সম্ভব? ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক পড়াগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা খুবই জরুরি। এই ক্ষেত্রে অটোপাশ বা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুসরণ করতে গেলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা এক বিরাট সংকটে পরবে। বিশেষ করে গণিত এবং বিজ্ঞান এর মতো বিষয়। সুতরাং আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এবং মেধার বিকাশ ঠিক রাখতে এ বছরের কিছু সিলেবাস পরের বছরের সিলেবাসের পাশাপাশি পড়ানো গেলেই কেবলমাত্র কিছুটা ক্ষতি পোষানো যাবে বলে আমি মনে করি। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন ভীষণ সংকটে। আমাদের শিক্ষার্থীদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন মজবুত শিক্ষার ভিত্তি এবং শিশুদের উপযোগী সুস্থ পরিবেশ। 

লেখক:
রাবেয়া সুলতানা পলি
জ্যেষ্ঠ শিক্ষক
বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা