kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

বঙ্গবন্ধু ও ওরা চারজন

ড. এস এম মুজিবুর রহমান   

২৭ অক্টোবর, ২০২০ ১৩:০২ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



বঙ্গবন্ধু ও ওরা চারজন

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের ওপর অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে। বাংলার সাধারণ মানুষের গণ্ডি ছাড়িয়ে জগতের বহু সাধারণ ও অসাধারণ মানুষের কাছে তাঁর যে ইমেজ তৈরি হয়েছিল, তারই আলোকে আমি চারজন মানুষের কথা বলব। ষাটের দশকের অশান্ত রাজনীতির ক্রান্তিকাল কাটে আমার ছাত্রজীবনে। কোনো দিন কোনো রাজনৈতিক দলের টিকিট আমি কিনিনি। তবে সর্বদলীয় ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার রাজপথ যখন উত্তপ্ত, তখন লাখো ছাত্র-জনতার মাঝে আমিও একজন ছিলাম। 

একজনের নেতৃত্বে বাংলার মুক্তি আসবে সে বিশ্বাসেই মিছিলে গেছি, স্লোগান দিয়েছি, যোগ দিয়েছি জনসভায়। ৭ই মার্চের সভায় যাব বলে বিকেলের টিউশনি সকালেই সেরে এসেছি। জনসভায় যাতে বসার মতো একটু জায়গা পাই সে জন্য সভা শুরুর অনেক আগেই হলের কয়েকজন ছাত্র-বন্ধুর সঙ্গে রেসকোর্স ময়দানে চলে যাই। বলতে গেলে যথাসময়েই সফেদ পাঞ্জাবির ওপর ট্রেডমার্ক কোট পরে বঙ্গবন্ধু উঠলেন মঞ্চে, পেছনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তত্কালীন শীর্ষস্থানীয় নেতারা। বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের মূল স্থপতি জাতির জনক শেখ মুজিবকে দূর থেকে ওই একবারই আমি দেখেছি। অনেকটা উত্তেজনায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে শুনেছি তাঁর বক্তৃতা। আজ যখন তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করা হচ্ছে, তখন একটি প্রশ্ন আমি সবার কাছে রাখতে চাই—তৎকালীন বিশ্বরাজনীতি, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, সমাজনীতি, সামরিকনীতি, নিরস্ত্র বাঙালি জাতির তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা আর তার সঙ্গে সমর ও কূটকৌশলে বাংলার স্বাধীনতার চূড়ান্ত আন্দোলনকে বেগবান করার যে ঘোষণা তিনি দেন, তার চেয়ে অমোঘ দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা আর দ্বিতীয়টি কী হতে পারত? হঠকারী রাজনীতিকদের অবশ্য তৈরি একটি উত্তর আছে। ১৫ই আগস্টের শেষ রাতে যখন সপরিবারে তাঁর হত্যার খবর বেতারে বারবার ঘোষিত হচ্ছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের পেছনে কিছু লোকের হৈচৈ শুনতে পাই। কেউ কেউ বলছিল, হজ ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এসে কিছু লোক আনন্দ প্রকাশ করছিল। শুনেছি, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হজযাত্রার আগে যাতে হজযাত্রীদের কোনো অসুবিধা না হয়, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই কাঁটাবনের যেখানে জাতীয় জাদুঘর দাঁড়িয়ে, সেখানে তৈরি হয়েছিল হজ ক্যাম্প। হজযাত্রীদের একাংশ আনন্দে মাতোয়ারা। এতেও আমি অবাক হইনি, যেমনটি আজও হই না, যখন শুনি ৭ই মার্চের ঘোষণা বাংলাদেশের মানুষ শুনতে পায়নি! আরো অনেক কথা আগামী দিনেও হয়তো শুনতে পাব, তাতেও আমি অবাক হব না। তবে চারজনের কথা আমার মনে থাকবে সারা জীবন। তাঁরা হলেন :

১. আলমপুরের আনু : ষাটের দশকে যাঁরা বিক্রমপুরের দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত করতেন, আজও তাঁদের আলমপুর লঞ্চঘাটের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। ঢাকা শহর থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামটি তখনকার সময় অজপাড়াগাঁ হলেও তার একটি সম্মান ছিল।

বিক্রমপুরের অনেক রথী-মহারথী এই গাঁয়ে নামতেন, তারপর কেরায়া নৌকায় করে নিজ নিজ গ্রামে চলে যেতেন। আড়িয়ল বিলের ওপর দিয়ে যে কাটা খালটি শ্রীনগরের দিকে চলে গেছে, তার নাব্যতা শুকনো মৌসুমে কমে যাওয়ায় আলমপুরেই লঞ্চগুলো নোঙর করত। হ্যাজাক বাতি জ্বলত সারা রাত। অনেক দোকান থাকায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত থাকত আলমপুরের লঞ্চঘাটটি। আরেকটি বিষয় ছিল লক্ষ করার মতো—সারি সারি কেরায়া নৌকা বাঁধা থাকত এই লঞ্চঘাটে। যাত্রীরা লঞ্চঘাটে নেমে এসব কেরায়া নৌকায় করেই চলে যেত হাঁসাড়া-মাওয়া-দোহার-লৌহজংসহ নানা জায়গায়। এই এক কেরায়া নৌকার মাঝি আনু আমার আলোচনার প্রথম মানুষ। আনুর আসল নাম আনোয়ার না আয়নাম তা কেউ বলতে পারত না। সত্যি কথা বলতে কী আনু নিজেও জানত না তার আসল নাম কী। সহায়-সম্পত্তি বলতে এই কেরায়া নৌকা ছাড়া তার আর কিছু ছিল না বলে সরকারি কোনো কাগজপত্রে আনুর অন্য কোনো লৌকিক নাম ছিল না।

সহায়-সম্পত্তি কিছু না থাকলেও আনুর জীবনের একটি ছোট্ট ইতিহাস আছে। স্থানীয় শেখরনগর হাটে বিনয় ঘোষের মিষ্টির দোকানে ফাইফরমাশ খাটত আনু। ছোটবেলায় মা-বাবা মারা যাওয়ার পর নানির কাছে থাকত আনু। নানিও যখন গেল, তখন বিনয় ঘোষের মিষ্টির দোকান আর শেখরনগর লঞ্চঘাটের এক কোনা হয়ে গেল আনুর দিন-রাতের আশ্রয়স্থল। এরই মধ্যে সম্ভবত পোলিও রোগে আনুর বাঁ হাতটি প্রায় অবশ হয়ে গেল। স্কুল থেকে বিনয়ের দোকানে যখন যেতাম মিষ্টি খেতে আনুকে দেখতাম দৌড়ে দৌড়ে এক হাতেই কাজ করছে। ‘কিরে আনু, কেমন আছস?’ জিজ্ঞেস করলে আনু একগাল হেসে বলত, ‘খুব ভালো আছি রফিক ভাই (এটা আমার ডাকনাম)’। জগতের সবচেয়ে সুখী মানুষ বলে আনুকে মনে হতো আমার। ১৯৬৫ সালে স্কুল পাস করে ঢাকায় কলেজে পড়তে গেলাম।  ছুটিছাটায় বাড়ি আসতাম। এরই মধ্যে আনুর জীবনেও একটি পরিবর্তন এসেছে। দোকানে দোকানে কাজ করে আনু যা টাকা-পয়সা বাঁচিয়েছিল তা দিয়েই পুরনো একট কেরায়া নৌকা কিনেছে। তারপর লঞ্চঘাটে নেমে আনুকেই নিয়ে যেতাম আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। মাত্র দুই অক্ষরের সরল নামের এই মানুষটিকে একসময় আমার অসাধারণ মনে হয়েছে।

২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি নরপশুরা যখন ঢাকার মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশু যে যেদিকে পারে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। পালিয়ে আসা অসহায় মানুষের এই ঢলের একাংশ আলমপুর লঞ্চঘাটে এসে জড়ো হয় নদী-নালা-বিল পার হয়ে। গ্রামবাসীর সহযোগিতায় আমরা কজন অসহায় মানুষের আপাত খাবার ও রাতে শোয়ার ব্যবস্থা করি। যারা টাকা-পয়সা সঙ্গে আনতে পেরেছিল, তারা কেরায়া নৌকা করে নিজ নিজ স্থলে চলে যায়। যারা খালি হাতে এসেছিল, তাদের নিয়ে একটু সমস্যায় পড়ে গেলাম। দরিদ্র কেরায়া মাঝিরা বিনা পয়সায় যাত্রীদের কোথাও নিতে চাচ্ছিল না। এগিয়ে এলো আনু। বলল, ‘রফিক ভাই, আমি পার করুম এই মানুষগুলোকে। ছিন্নগরে (শ্রীনগরে) পৌঁছাইয়া দিতে পারলেই এরা যার যার জাগায় চইলা যাইতে পারব। বিপদের দিনে এই মানুষগুলোর উপকার করতে পারলে আল্লায় পরকালে সুখ দিব।’ আমার উত্তরের আশায় না থেকেই আনু উপস্থিতদের উদ্দেশে বলল, ‘আপনেরা কোনো চিন্তা করবেন না, এই যামু আর আমু।’ বলেই আনু নৌকা ছেড়ে দিল। আজ ৩৩ বছর পর আমার মনে হয়, এই বাংলাদেশে আনুর মতো একজন মাঝির দরকার, যিনি অসহায় বাঙালি জাতিকে পরম মমতায় পারাপার করবেন। 

এপ্রিলের মাঝামাঝি এলেন মকবুল ভাই। বোটানিতে ডিগ্রি নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। স্বাধীনচেতা একজন মানুষ। মানুষের উপকার করে বেড়াচ্ছেন। বললেন, রফিক পরাধীন দেশে অনার্স পরীক্ষা দিয়েছ, স্বাধীন দেশে রেজাল্ট পাবে। প্রসঙ্গত বলে রাখছি, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আমার অনার্স (পদার্থবিদ্যা) পরীক্ষা দিয়েছি, ব্যাবহারিক পরীক্ষা তখন বাকি। মকবুল ভাই বললেন, ক্যাপ্টেন হালিম স্থানীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, চলো তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি কিভাবে আমরা এগোতে পারি। একদিন তিনি ক্যাপ্টেন হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এসে বললেন, ভারতে না গিয়েও আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারি, ক্যাপ্টেন হালিম তাঁকে এ কথাই বলেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও রসদ জোগাড় করা, রাতবিরাতে তাদের আশ্রয় দেওয়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কাজে আমাদের একটি সংগঠন দরকার। এই চেতনা থেকেই আমরা ১০-১২ জনের একটি দল তৈরি করে ফেললাম। দালাল পেটানোর কাজটিও ছিল এই দলের অন্যতম কর্মসূচি। পেটানোর কাজে আমাকে বাদ দেওয়া হলো আমার নরম মনমানসিকতার জন্য।

এখন প্রশ্ন হলো, তহবিল জোগাড় করা, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খাবারদাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজে বিশ্বস্ত একজন মাঝির দরকার। প্রথমেই আনুর কথা মনে হলো। মকবুল ভাইকে নিয়ে আনুর সঙ্গে কথা বললাম। শুধু বলল, ‘দুইটা হাত ভালো থাকলে আমি যুদ্ধে যাইতাম; এই নৌকায় কইরা আপনাগো পারাপার করতে তো পারব। শেখ মুজিব কইছে, যার যা কিছু আছে তা নিয়ে তৈরি থাকো। আমার তো একটা হাত ভালো আছে, আমি তা লইয়াই তৈরি আছি।’ আনুর চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে। সেদিন থেকেই আনু আমাদের প্রায় প্রতিদিনের সঙ্গী। আমরা যা খাই আনুও তা-ই খায়। কোনো কিছুতে ওর কোনো অভিযোগ নেই। আনুকে নিয়েই আমরা দক্ষিণ বিক্রমপুরের গ্রামগুলোতে যোগাযোগ করতাম বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে। 

জুলাই মাসের এক রাতে আমরা হাঁসাড়া যাচ্ছিলাম এক কাজে। আমরা কজন ছইয়ের ভেতরে। আনু খালি গায়ে নৌকা বাইছে। মাঝে মাঝে ঠাটা চমকাচ্ছে। লক্ষ করলাম, ডান হাতে বৈঠা ধরে বাঁ হাতের ক্ষীণ চাপে নৌকা বাইতে আনুর বেশ কষ্টই হচ্ছিল। বললাম, আনু চলো আখক্ষেতের ওই পাশটাই নৌকা থামিয়ে একটু জিরিয়ে নেই। আনু কথা শুনল। হঠাত্ করেই একে একটা প্রশ্ন করলাম, আনু দেশের জন্য এত কষ্ট করছ, দেশ স্বাধীন হলে কী করবে? আনুর উত্তর—‘রফিক ভাই, আমার এই জগতে কেউ নাই। ঠিকানা নাই বইলা সংসার করতে পারলাম না। দেশ স্বাধীন অইলে, শেখ মুজিব যদি রেডিওতে ডাক দেয়, তোমাদের যা যা আছে তা লইয়া দেশের কাজ করতে অইব, তখন আমি আমার ডাইন আত (হাত) দিয়া মাটি কাটুম, রাস্তা বানামু সবাইর লগে।’ বললাম, শেখ মুজিব যদি সেই ডাক দিতে না পারেন? আনু কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারল না। আনুর নৌকায় অবাক করা এক জিনিস আবিষ্কার করলাম একদিন। ছইয়ের ভেতর গোঁজা এরিনম্যুর তামাকের একটি কৌটা। জিজ্ঞেস করলাম, আনু এই দামি তামাক কবে খেল? আনু বলল, কী যে কন ভাই, আমি ওই তামুক খামু ক্যা? একদিন এক সাহেব এটা কইরা খাইছিল। তামুক শেষ অইলে আমারে এটা দিয়ে দ্যায় সাহেব। ওইটার মধ্যে আমি একটা জিনিস রাখছি! এরপর কোনো কথা বলল না আনু। আমি বললাম, বুঝেছি বিয়ের বাজারসদাই করতে শুরু করেছ!  আনুর ওই একই উত্তর, কী যে কন ভাই, এই ল্যাংড়ারে মাইয়া দিব কে? যার চাল-চুলা নাই, দুই আত মাটি নাই, তারে কে বিয়া করব? এরপর কৌতূহলবশেই এরিনম্যুরের কৌটাটি আমি হাতে নিলাম। ওর অনুমতি নিয়ে ওটা খুললাম। পলিথিনের টুকরায় মোড়ানো সংবাদপত্র থেকে কাটা একটি ছবি—ছবিটি শেখ মুজিবের। বঙ্গবন্ধু হত্যার ২৯ বছর পর একটা কথাই আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধু, বাংলার আনুরা নানা দুর্যোগে তোমাকে রক্ষা করবে। নিজে ভিজবে, কিন্তু তোমাকে আগলে রাখবে যক্ষের ধনের মতো।

আনুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা ১৯৭৬ সালের জুন মাসে। বৃত্তি নিয়ে পিএইচডি করতে যাব বিলেতে। গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি বাবার সঙ্গে দেখা করতে। আগের মতোই লঞ্চঘাটে নেমে আনুর খোঁজ করলাম। পেয়েও গেলাম। বয়স ২২-২৩ হবে আনুর। কিন্তু অনেকটা দুর্বল মনে হলো ওকে। এ কথা, সে কথা হলো ওর সঙ্গে। একসময় কিছুটা চুপ মেরে গেল সে। তারপর হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করল, শেখ মুজিবকে যারা মারল তাদের বিচার অইব না রফিক ভাই?

২. বিলেতের লেডি রবিনসন : ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সস্ত্রীক পাড়ি জমালাম ইংল্যান্ডে। ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি পিএইচডি করার জন্য। লন্ডনে পৌঁছার পর ব্রিটিশ কাউন্সিলের সপ্তাহব্যাপী লন্ডন দেখার আয়োজনে যোগ দিলাম। একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। তখন কোনো অধিবেশন না থাকায় পার্লামেন্টের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো সবাইকে। সন্ধ্যাব্যাপী চলল ওই দর্শন। বিকেলে হাউস অব লর্ডসের আমন্ত্রণে অন্যান্য দেশ থেকে আগত কমনওয়েলথ স্কলারদের সঙ্গে গেলাম রয়াল গিল্ড হলে। শুনেছি, বিদেশের নামিদামি লোকজনকে হাউস অব লর্ডসে রিসেপশন দিয়ে থাকে। নিজেকে ধন্য মনে হলো। যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। হাউস অব লর্ডসের অন্যতম কর্ণধার ডেইম (লেডি) রবিনসন সাদরে আহ্বান জানালেন সবাইকে। তারপর তিনি সবাইকে অনুরোধ করলেন পাশের হলঘরে খাবার খেতে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আসা শিক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তা—যাঁর নাম মনে নেই এখন, তাঁর সঙ্গে আলাপ হলো। গাড়ল এই কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ মোটেই এগোচ্ছিল না আমার। ফাঁক খুঁজছিলাম ভদ্রলোকের জলো কথাবার্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার। সুযোগ এসে গেল। ডেইম রবিনসন স্কলারদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, মাঝেমধ্যে পানীয়ে চুমুক  দিচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই আমার দিকে তাকালেন তিনি। আমিও সপ্রতিভ পায়ে এগিয়ে গেলাম তাঁর দিকে। বুকে বাংলাদেশের নাম আঁটা দেখে অতি নরম অথচ আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, ওয়েলকাম টু গ্রেট ব্রিটেন! প্রতি উত্তরে তাঁকে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর আমার ও আমার স্ত্রীর কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না লন্ডনে আসার পর সে কথা জিজ্ঞেস করলেন। এজাতীয় ছোটখাটো বিষয়ে কিছুক্ষণ আলাপ হলো। হঠাত্ করেই ভদ্রমহিলা একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন, ধীর গলায় বললেন, আমি তোমাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, মনে কিছু নেবে না। তারপর একটু থেমে ডেইম রবিনসন শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা শেখ মুজিবকে মারলে কেন? কী অপরাধ করেছিল এই মহান মানুষটি তোমাদের কাছে? আমি থতমত খেয়ে কিছু বলার আগেই তিনি দৃঢ় গলায় আবার প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করলেন আমাকে, তোমরা শেখ মুজিবকে যদি খেতে দিতে না পারতে, তবে ওই মানুষটিকে আমাদের এই ছোট্ট দ্বীপটিতে পাঠিয়ে দিতে! বিরাট মাপের এই মানুষটিকে আমরা আমাদের ছোট দেশটায় জায়গা করে দিতাম। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। কী উত্তর দেব আমি? আমার ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি বললেন, মি. রহমান মনে রেখো, যে জাতি তার মহত্ সন্তানদের সম্মান দেয় না, বরং অসম্মান করে, তাদের কোনো উন্নতি হয় না। ইতিহাসে তারা অপাঙক্তেয়ই থেকে যায়। জগতের কাছে আমরা অপাঙক্তেয়ই থেকে যাচ্ছি।

৩. আমেরিকান অধ্যাপক রবিনোভিচ : ১৯৭৩ সালে মাস্টার্স পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরপরই বাইরে লেখালেখি করছি গবেষণা সহকারী হিসেবে পিএইচডি করার জন্য। মার্কিন মুলুকের নামকরা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও চিঠি পাঠিয়েছি। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক লিউ রবিনোভিচ ধর্মে ইহুদি। উত্তরে আমাকে লিখলেন, প্রথম ছয় মাসের খরচাপাতি যদি চালিয়ে নিতে পারো তবে আমরা তোমাকে অনুদান দিতে পারি। সঙ্গে একাডেমিক প্রগ্রামের কিছু খবরাখবর। চিঠির একেবারে শেষের প্যারায় লিখেছেন, তোমার নাম দেখে মনে হচ্ছে, তোমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তোমার বংশীয় সম্পর্ক রয়েছে। যদি থাকে, আর যদি তাঁর সঙ্গে কোথাও দেখা হয় তবে বলো, আমি ও আমার সহকর্মীরা তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে এশিয়ার রাজনীতিতে এক আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখেছি। আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা করি। চিঠির উত্তরে লিখেছি, শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার কোনো বংশীয় সম্পর্ক নেই, তোমার মতোই তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। তাঁর বদৌলতেই আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে রবিনোভিচ আমাদের সম্পর্কে কী ধারণা করলেন সেটা আমার জানা নেই।

৪. নেলসন ম্যান্ডেলা : বিশ্বের রাজনীতির জগতে জীবন্ত কিংবদন্তি হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা। ২৭ বছর সশ্রম কারাবরণ করে নিজের জীবনের উজ্জ্বল সময় তিনি কাটিয়েছেন অন্ধকার কারাগারে। কারো সঙ্গে আঁতাত করেননি তাঁর দেশের মানুষের মুক্তির প্রশ্নে। যেমনটি করেননি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব। দুজনের জীবনে মিল রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। বছর কয়েক আগে ম্যান্ডেলা আসেন বাংলাদেশে, মূল উদ্দেশ্য চিন্তাচেতনায় তাঁর সতীর্থ শেখ মুজিবের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানানো। আপনাদের অনেকেরই মনে আছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘রাজা-বাদশাহ অথবা সেনাপতিরা ইতিহাস সৃষ্টি করে না, ইতিহাসের মূল নায়ক দেশের আপামর জনতা। শেখ মুজিব ছিলেন সেই আপামর জনতার প্রতিনিধি।’

ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ম্যান্ডেলা ওখানে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্ষদের দেওয়া সম্মানের জবাবে কৌতুক করে বলেছিলেন, অশীতিপর, কর্মহীন এক বৃদ্ধ, যাঁর গলায় ঝুলছে দেশদ্রোহের মামলা, তাঁকে সংবর্ধনা দিয়ে আপনারা না আবার বিপদে পড়ে যান! আজ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো একই কথা বলতেন।

সব শেষে বলতে চাই, ইতিহাস পদার্থবিদ্যার কেলাস (কৃস্টাল) সৃষ্টির মতো। তড়িঘড়ি করে সৃষ্ট কেলাস যেমন সহজেই ভেঙে যায়, ইতিহাসও তেমনি তড়িঘড়ি সৃষ্ট হয় না। সময়ই নিয়ন্ত্রণ করে ইতিহাসের দায়িত্ব ও ভিত্তি। সত্যকে কিন্তু কালের জন্য আড়াল করা যায়, ধ্বংস করা যায় না। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার জনক নিকোলাস কোপার্নিকাস গাণিতিক নিয়মে যখন আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তি তৈরি করেন, তখন চার্চ ও ধর্মান্ধরা প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে যাওয়ার কারণে কোপার্নিকাসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। এরপর ৩০০ বছর ধরে এই সত্যকে বুকে ধরে রেখেছিল তাঁর অনুরাগীরা। সময়ের অমোঘ রায়ে ৫০০ বছর পর নিকোলাস কোপার্নিকাস ও তাঁর সত্যবাণী সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত আর চার্চের কূপমণ্ডূকতা হয়েছে ধিক্কৃত। তাই বলছি, ইতিহাসের রায় বড় কঠিন, ইতিহাস বানাবেন না কেউ, পারলে ইতিহাস সৃষ্টি করুন। সঙ্গে এটাও বলি, জাতির ক্রান্তিকালে, যাঁরা অকুতোভয়ে এগিয়ে এসেছেন, অনেকে দেশমাতৃকার ডাকে জীবন দিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে দিতে হবে যথাযথ সম্মান। তা না হলে ডেইম রবিনসনের উচ্চারণ—যে জাতি তার মহত্ সন্তানদের সম্মান দেয় না, বরং অসম্মান করে, তাদের কোনো উন্নতি হয় না, ইতিহাসে তারা অপাঙক্তেয়ই থেকে যায়।

লেখক : ওমানের সুলতান কাদুম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা