kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

'করোনা পরিস্থিতি থেকে আমরা যা শিখলাম'

অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন    

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০১:৫৪ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



'করোনা পরিস্থিতি থেকে আমরা যা শিখলাম'

অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন

কভিড-১৯ বিশ্ব মহামারি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কোন দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কেমন হাল তা প্রকাশ পেয়েছে। উন্মুক্ত হয়েছে সকল অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার স্তর। প্রকাশ্যে উন্মুক্ত হয়েছে এ সংক্রান্ত সকল দুর্নীতি। জানা গেছে, কতটা অদক্ষ জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সত্যিকার অর্থে একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। কভিড-১৯ প্রমাণ করেছে যুদ্ধ ও কূটরাজনীতির সক্ষমতার জন্য সকল দেশ যতটা সময় ও অর্থ ব্যয় করে, স্বাস্থ্যসেবার জন্য ততটা আগ্রহী নয়। 

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত না থাকলে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা কাজে আসে না
উন্নত রাষ্ট্রগুলো অস্ত্র উদ্ভাবন, তৈরি, ক্রয় ও বিক্রয়ে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। অথচ এই রাষ্ট্রগুলো মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছে না। স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ সবচেয়ে কম থাকে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত না থাকলে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতাও যে খুব একটা কাজে আসে না সেটা প্রমাণ করেছে সার্স-কোভ-২ ভাইরাস। বিশ্বে সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ও শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ আজ পর্যুদস্ত এই অতি ক্ষুদ্র অণুজীব করোনাভাইরাসের কাছে। বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রগুলো এখন করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, চীন, রাশিয়া, জার্মানি এসব দেশের মধ্যে এখন কে কার আগে করোনা টিকা আবিষ্কার করে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ব জয় করবেন তার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সংক্রমণ রোধে সফল দেশগুলোও এখনো দাবি করতে পারে না তারা সংক্রমণ থেকে শংকামুক্ত, কারণ করোনা পুনরায় ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ পুনঃসংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। জাপান, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কিছু রাষ্ট্র করোনার শুরুতে অর্থাৎ এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সংক্রমণ কার্যক্রম শুরু করে বেশ শক্তভাবে সংক্রমণ দমনে সফলতা দেখিয়েছে।  

স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ ও চিকিৎসা কর্মসূচিতে সফল ভিয়েতনাম
এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত ভিয়েতনামে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৬৮ জন, সুস্থ ২২৪ জন এবং একজনও মারা যাননি। তবে ১৬ এপ্রিল থেকে নতুন করে সংক্রমণ। (সূত্র :  ওয়ার্ল্ডমিটার)। ভিয়েতনাম সম্পর্কে বলা হচ্ছে, সরকারিভাবে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ ও রোগের চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করার যে কর্মসূচি ভিয়েতনাম বহুদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে আসছে, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সেটি বড় কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি একজন বিদেশি করোনা রোগী শনাক্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ইমারজেন্সি এপিডেমিক প্রিভেনশন সেন্টার সক্রিয় করে। ১ ফেব্রুয়ারি একজন ভিয়েতনামী নারীর করোনা শনাক্ত হল প্রথম অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ। তৎক্ষণাৎ প্রধানমন্ত্রী এটাকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেন। বিমান চলাচল সীমিতকরণসহ সীমান্তে কড়া নজরদারি ও ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। ব্যাপক আকারে সংক্রমণ ঠেকাতে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যাপক প্রচারে নামে সরকার। পাশাপাশি দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে পরীক্ষা করা শুরু করে। আর কভিড-১৯ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আগেই পর্যায়ক্রমে তারা গোটা দেশটাই লকডাউন করে দেয়। করোনা সতর্কতা নিয়ে ভিয়েতনামের আরো বহু কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। 

যথেষ্ট সাফল্য দেখিয়েছে কিউবা
করোনা সংকটে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে কিউবা। করোনার জন্য কিউবা আলোচনায় এসেছে প্রধানত দুটি কারণে। এক. করোনা নিয়ন্ত্রণে তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভূমিকা। দুই. একটি ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রের করোনা মোকাবেলায় পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে মেডিক্যাল টিম প্রেরণ এবং ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করা। এশিয়ার সফল দেশগুলোর মতো যদিও তারা দ্রুত লকডাউনের ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ পর্যটন তাদের আয়ের অন্যতম উত্স হওয়াতে তারা পর্যটক আগমন নিয়ন্ত্রণ করেছে বেশ দেরিতে। ততদিনে ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পরে। তথাপি, কিউবা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেকটা সক্ষম হয়েছে তার জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে।

ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
অন্যদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ রাষ্ট্র হলো যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে করোনাভাইরাসকে মোটেও গুরুত্ব দেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনের বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাস সম্পর্কে তথ্য দেয়ার পরও কিছু ভাইরাস বিশেষজ্ঞসহ নীতিনির্ধারকেরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। যদিও তারা এই ভাইরাস সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কিন্তু তারা প্রস্তুতি নেননি। এ ধরনের মহামারি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র অপ্রস্তুত, এই কথা জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব সতর্কবাণী গ্রাহ্য করেননি। ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ২২ জানুয়ারি ট্রাম্প বলেছিলেন, বিষয়টি বেশ ভালভাবেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের টুইট, ‘আমাদের দেশে মাত্র ১১জন আক্রান্ত এবং তারাও সেরে উঠেছেন’। ২৫ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প বললেন, যুক্তরাষ্ট্রে করোনা বেশ ভালভাবেই নিয়ন্ত্রণে আছে। এভাবে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন এবং ৯ মার্চ তিনি বললেন, এটা সামান্য ফ্লু, দু’দিনেই চলে যাবে। অথচ তখন করোনা ভাইরাস দু-চার জন করে বাড়ছে আর ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে জুড়ে। আর বর্তমানে করোনা আক্রান্তে ও মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এক নম্বরে অবস্থান করছে।

অথচ ট্রাম্প ওই সময় একদিন বলেছিলেন, এটা কোনো সংকটই নয়, এটা সাধারণ ফ্লুর মতো। পরদিনই তিনি আবার বললেন, এখন ভয়াবহ সংকটের সময়। এ ধরনের বক্তব্য সংকট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সিটিউট অফ এলার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক এবং করোনার টাস্কফোর্স বিশেষজ্ঞ ডা. ফাউসি ফেব্রুয়ারিতেই সামাজিক দুরুত্ব মেনে চলার বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনোই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি যখন নিউ ইয়র্কে ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত, ৬৭২ জন মানুষ মারা গেছে, তখনও ট্রাম্প বলছেন, দুই সপ্তাহের লকডাউনের প্রয়োজন নেই। এভাবে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন প্রচুর সময় নষ্ট করায় সেখানে ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপর তো তিনি নিজেই আক্রান্ত হলেন। সে নিয়ে নানা ঘটনা তো বিশ্ববাসী দেখল। 

ইতালির অভিজ্ঞতা তিক্ত
অন্যদিকে ইতালির চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত বলে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ইতালির হাসপাতালগুলোও এ ধরনের মহামারি মোকাবেলার ক্ষমতা রাখে না। সুরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণ ও সরঞ্জামের তীব্র সংকট। পর্যাপ্ত ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী নেই। একইভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভেন্টিলেটর না থাকাতে চিকিৎসকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে কার আগে কাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। 

লকডাউন না করেও সফল তাইওয়ান
সম্পূর্ণ লকডাউন না করেও সফল হয়েছে তাইওয়ানের মতো দেশ। অথচ চীনের সঙ্গে নিকট সংশ্লিষ্টতার জন্য তাইওয়ানকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা মনে করা হচ্ছিল। মাত্র ২৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটির প্রায় ০.৮৫ মিলিয়ন নাগরিক চীনের মূল ভূখন্ডে বসবাস করে। এরা চীনা নববর্ষে চীন থেকে তাইওয়ানে বেড়াতে আসেন। ফলে এ আশংকা অমূলক ছিল না যে এসময় করোনার প্রাদুর্ভাব বেশি হবে। কিন্তু Warldometer- এর তথ্য অনুযায়ী ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ৪৩৮ জন, সুস্থ হয়েছে ২৫৩ জন মারা গেছে মাত্র ৬ জন। লকডাউন না করেও তাই সফল তাইওয়ান।

তাইওয়ানের কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের মূলে রয়েছে তাদের সার্স সংকটের অভিজ্ঞতা। ২০০২-০৩ সালের ওই মহামারিতে দেড় লাখের বেশি মানুষকে কোয়ারেন্টিনে রাখতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা এমন সংকটের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি জনস্বাস্থ্য রেসপন্স মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করে। অভিজ্ঞতা থেকে তারা আসন্ন সংকটকে দ্রুত উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং মহামারির প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাগুলো সক্রিয় করে তুলে।

সাফল্য দেখাতে পারেনি ভারতও
জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহতম রাষ্ট্র ভারত করোনা প্রতিরোধ নিয়ে সাফল্য দেখাতে পারেনি। তবে ভারতের মধ্যে একমাত্র কেরালা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে কিছুটা প্রশংসিত হচ্ছে এবং ‘কেরালা মডেল’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। গণহারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন রাখা, আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা লোকজনকে দ্রুত খুঁজে বের করা, দীর্ঘ সময় কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থার পাশাপাশি হঠাত্ লকডাউনের কারণে আটকে পড়া হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা ও কয়েক লাখ শ্রমিকের কাছে নিয়মিত খাবার পৌঁছানো এবং দরিদ্রসীমার নিচে জীবনযাপন করা পরিবারদের জন্য খাবার বিতরণ ব্যবস্থার মতো মানবিক উদ্যোগের কারণেই প্রশংসিত হচ্ছে কেরালা। তাছাড়া ছোট ছোট ‘কিওস্ক’বা স্টলের মাধ্যমে স্বল্প খরচের করোনা টেস্টের ব্যবস্থাও করা হয়েছে সেখানে। এসব ব্যবস্থা নেয়ার কারণে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলো তারা। ফলে সংকোচ, লোক লজ্জার ভয় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মানুষও আরো বেশি করে এগিয়ে এসে নিজেদের পরীক্ষা করিয়েছেন। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী শারীরিক দুরুত্ব মেনে চলেছেন। অবশ্য কেরালার অধিক শিক্ষার হার এবং দীর্ঘদিনের কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনের পরিবেশ মানুষকে সচেতন করতে সহায়ক হয়েছে। কেরালার মডেল মূলত সফল অর্থনৈতিক-স্বাস্থ্য-সামাজিক এই তিনটির মিলিত ফসল।

করোনা থেকে আমরা যা শিখলাম
করোনা প্রতিরোধে বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান করোনা প্রতিরোধে উপরোক্ত সফল ও ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর তুলনামূলক আলোচনা থেকে আমরা কি কি শিক্ষা লাভ করতে পারি তা আলোকপাত করা যেতে পারে।

প্রথমত : বিশ্বমানের চিকিৎসা দেওয়া হয় এমন রাষ্ট্রগুলোর প্রণীত স্বাস্থ্যনীতি এবং এই নীতির আলোকে গড়ে তোলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রোগ প্রতিরোধ বিশেষ করে মহামারি ব্যবস্থাপনা বেশ অপ্রতুল। তাই ব্যাপক করোনা সংক্রমণে এসব রাষ্ট্রের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত : চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতার জন্য ঠিকমত চিকিৎসা দেওয়া যায়নি বেশ কয়েকটি দেশে। পাশাপাশি অন্যান্য রোগের চিকিৎসা সেবাতেও সংকট দেখা দিয়েছে। শুধু কভিড-১৯ নয়, অন্য রোগের চিকিৎসাও অনেকেই নিতে পারেননি বা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন।

তৃতীয়ত : চিকিৎসা উপকরণ, সুরক্ষা সামগ্রী ও ওষুধের প্রকট সংকট দেখা দিয়েছে। শুরুতেই পরীক্ষা কার্যক্রম চালাতে না পারার অন্যতম কারণ কীট সংকট। ভেন্টিলেটরের সংকটে কোথাও কোথাও চিকিৎসকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে কাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, আর কাকে রাখবেন না। এটা পরিষ্কার যেসকল রাষ্ট্র তাদের স্বাস্থ্যনীতিতে রোগ নিরাময়ের চেয়ে রোগ প্রতিরোধকে প্রাধান্য দিয়েছে তারা সংক্রমণ রোধে এগিয়ে আছে।

চতুর্থত : যে রাষ্ট্রগুলো চীনে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পরপরই বিদেশ ফেরতদের কোয়ারেন্টিন করতে পেরেছে, গণহারে পরীক্ষা করে সংক্রমিতদের শনাক্ত করে বিচ্ছিন্ন রাখতে ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পেরেছে, সংক্রমিতদের সংস্পর্শে আসা সকল মানুষকে দ্রুত খুঁজে বের করে কোয়ারেন্টিন করতে পেরেছে এবং জনসমাগম আটকে দিয়ে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পেরেছে সেসব রাষ্ট্র সংক্রমণ রুখতে পেরেছে। অন্যদিকে সময় ক্ষেপণ করে তথা সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে দেওয়ার পর লকডাউন করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।

পঞ্চমত : করোনাভাইরাসে সংক্রমিতদের মধ্যে অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত রোগীরাই মূলত জটিলতায় ভুগে মারা যাচ্ছে। ইতালির হেলথ ইন্সটিটিউট-এর দেওয়া তথ্য বলছে, কভিড-১৯-এর কারণে ১৭ মার্চ পর্যন্ত সেখানে যত লোক মারা গেছে তাদের ৯৯ ভাগের অন্য শারীরিক সমস্যা (ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ ইত্যাদি) ছিল। অন্যদিকে তরুণদের চেয়ে বয়স্কদের মৃত্যুর হার বেশি। এ তথ্য দুটি বিষয়ে সামনে নিয়ে এসেছে। 

এক. এ ধরনের মহামারি থেকে বাঁচতে হলে নিরোগ দেহ চাই। 
দুই. মানবদেহকে রোগ প্রতিরোধে সক্ষম রাখতে হবে। এমনকি হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলার প্রশ্নটিও উঠে এসেছে। বস্তুত যারা অন্য রোগে ভুগছিলেন না এবং যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী তারা করোনায় আক্রান্ত হলেও দ্রুত সেরে উঠেছেন। করোনা এই শিক্ষাই দিচ্ছে, রাষ্ট্রগুলোকে স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম লক্ষ্য রাখতে হবে নাগরিকদের রোগ প্রতিরোধক্ষম ও রোগমুক্ত সুস্থ সবল রাখা।

ষষ্ঠত : করোনাভাইরাস অকার্যকর ও বাজারকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতা, এটা সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। গত ২০ বছরে করোনাভাইরাস গোত্রের অন্যান্য বেশ কয়েকটি ভাইরাস বিভিন্ন দেশে সংক্রমিত হয়েছে। যেমন সার্স, মার্স, ইবোলা, জিকা ইত্যাদি। তার মধ্যে SARS-COV-2 নতুন আরো একটি। এই ধারণা অনেকটা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, সার্স-এর পরিবর্তিত রূপের করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা আছে। SARS-COV-2 কে সার্স-এর আরেকটা রূপ মনে করা হচ্ছে। তাই সার্স-এর প্রতিষেধক আবিষ্কার হলে কভিড-১৯-এর প্রতিষেধক আবিষ্কার অনেক সহজ হতো।

একইভাবে উন্নত দেশগুলোতে সুরক্ষা সামগ্রী, চিকিৎসা উপকরণ ও ভেন্টিলেটরের ভয়াবহ সংকটও মুনাফাকেন্দ্রিক উত্পাদন ব্যবস্থার ব্যর্থতাই প্রকাশ করে। করোনার থেকে আমরা এই শিক্ষাই পেলাম যে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে নয়, রাষ্ট্রের তদারকিতে ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সপ্তমত : বায়ু দূষণের সঙ্গে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের মৃত্যু ঝুঁকি বৃদ্ধির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি কয়েকটি গবেষণার। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আমেরিকার Harvard ইউনিভার্সিটি, ইতালির ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা, ডেনমার্কের আরহুস ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি। এসব গবেষণার ভিত্তিতে বিবিসি বলছে স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ও ফ্রান্সের ৫৬টি প্রশাসনিক এলাকায় মৃত্যুহার বেশি। এর মধ্যে পাঁচটি অঞ্চলে মৃত্যু হার ৭৮ শতাংশ যে অঞ্চলগুলো বেশি বায়ু দূষণের শিকার।

করোনা ধনী-গরিব বা সাদা-কালো মানছে না। অথবা ধনী দেশ, গরিব দেশ মানছে না। ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে ধর্ম বা জাতির শ্রেষ্ঠতার দম্ভ। করোনার আরেকটা বার্তা হলো, শুধু নিজে সুস্থ থাকলে হবে না, অন্যকেও সুস্থ থাকতে হবে। নাহলে অন্যের ভাইরাস দশজন ঘুরে তাকেও আক্রান্ত করবে। করোনার থেকে আমরা আরো জানলাম যে, জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত না হলে ব্যক্তি বিশেষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তাও থাকে না। তেমনি দুনিয়ার সকল দেশের জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই মানব প্রজাতির নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

অষ্টম : করোনার আরেকটি শিক্ষা হল জনগণকে আস্থায় না নিয়ে মহামারি মোকাবেলা করা সম্ভব হয় না। কেননা জনগণের পূর্ণ সহযোগিতা ছাড়া সরকারের একক প্রচেষ্টায় করোনার মতো মহামারি মোকাবেলা সম্ভব নয়। আর সরকারের পদক্ষেপের ওপর আস্থা থাকলে তা বাস্তবায়নে জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে আসে। যেসব রাষ্ট্র সফল হয়েছে সেসব রাষ্ট্রের নাগরিকগণ সরকারের পদক্ষেপসমূহে আস্থা স্থাপন করে তা বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকা সুচারুভাবে পালন করেছে।

পরিশেষে বাংলাদেশেও আমরা কম শংকিত নই। বিশেষ  করে করোনা কেলেঙ্কারিতে স্বাস্থ্য বিভাগে ব্যপক রদবদল হয়েছে। ইতিমধ্যে করোনা পরীক্ষা ও দূর্নীতি নিয়ে দেশের করুণ চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। আমাদের আরও সতর্কতামূলকভাবে চলাফেরা ও করোনাকে সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। শুধু সরকারের দিকে চেয়ে থাকলে হবে না ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের করোনার এ সংকট মোকাবেলায় আরো অধিক সচেতন হতে হবে। অনেকের আশংকা প্রথম ঢেউ শেষ হয়ে গেছে দ্বিতীয় ঢেউ আসবে না। কিন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই দেখিয়েছেন যে দ্বিতীয় ঢেউ কিছু ক্ষেত্রে ঘটেছে।

করোনার সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য কার্যকর ভ্যাকসিন আসা পর্যন্ত আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এর মাঝে আমাদের একটু সহনশীলতা ও নিয়মনীতি মেনে চলতে হবে। অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে নিয়মগুলো রপ্ত করতে হবে এবং পালন করতে হবে। ততদিনে হয়ত মানব জাতি মুক্তি পাবে করোনাভাইরাসের অভিশপ্ত দিনগুলো থেকে।

লেখক : শিশুরোগ ও শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
সাবেক অধ্যাপক ও পরিচালক
ঢাকা শিশু হাসপাতাল।
ইমেইল : [email protected]

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা