kalerkantho

সোমবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩০ নভেম্বর ২০২০। ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

বাংলাদেশের ভোটে বিলেতি হাওয়া

মোস্তফা মামুন   

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০২:২৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলাদেশের ভোটে বিলেতি হাওয়া

ইংল্যান্ডের একটি নির্বাচন কাভারের সুযোগ হয়েছিল। এর প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতাই এমন অদ্ভুত যে এখনো ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। আমি নিশ্চিত যে অন্য কেউ এসে যদি এসব গল্প আমাকে শোনাত, কোনো রকম তদন্ত না করেই বলে দিতাম, গুল মারছে।

নির্বাচনের দিনের ঘটনা। হোটেলের রিসেপশনে সবচেয়ে কাছের ভোটকেন্দ্রের লোকেশনটা জানতে চাইলাম। রিসেপশনিস্ট একটু অবাক, ‘তুমি কি ভোটার?’

‘না।’

‘তাহলে ভোটকেন্দ্র দেখতে চাইছ কেন?’

‘বুঝতেই তো পারছ, সাংবাদিক। একটু তোমাদের দেশের ভোট দেখতে চাইছি।’

‘ঠিক আছে দেখো।’

‘কেন্দ্রটা কোথায়?’

‘আমি তো ঠিক জানি না।’

‘বলো কী?’

আমার অবিশ্বাস দেখে সে বিস্মিত। হোটেলে চাকরি করে। ওর ভোটকেন্দ্রের ঠিকানা জানতে হবে কেন বুঝতে পারছে না। তবু আমার মরিয়া ভাব দেখে বলল, ‘দাঁড়াও দেখি জানা যায় কি না?’

ফোনে একের পর এক নানাজনের সঙ্গে কথা বলে। দেখা গেল, ওরাও কেউ জানে না।

‘এরা সব অকর্মা’, ‘হোটেলের বাইরে দুনিয়ার কোনো খোঁজ রাখে না’—মনে মনে এ রকম কিছু কথা বলে বাইরে বেরিয়ে দেখলাম বার্মিংহাম শহরের কেউই আসলে দুনিয়ার, মানে ভোটের খোঁজ রাখে না। অন্তত জনাদশেক লোককে জিজ্ঞেস করলাম, কয়েক কিলোমিটার ঘুরলাম, ভোটকেন্দ্র তবু মিলল না। গুগলে চেষ্টা করলাম, নেয়ারেস্ট সেন্টার সার্চ দিয়েও খুব সুবিধা করা গেল না। তবু ওদের নির্দেশিত পথেই শেষ পর্যন্ত একটা কেন্দ্রের খোঁজ মিলল। আর অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, আগেও একবার এই কেন্দ্রের কাছে গিয়ে ফিরে এসেছি। কেউ একজন আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল; কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি কর্মী নেই, পুলিশ নেই, মানুষ নেই দেখে ভাবলাম, হতেই পারে না। ভুল ঠিকানা দিয়ে দিয়েছে।

এটাই ভোটকেন্দ্র। সেখানে অদ্ভুত রকম সমাদর। দিব্যি ভেতরে ঢোকা গেল। কেন্দ্রের মানুষেরা যখন জানলেন আমি একজন সাংবাদিক, তখন প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ভীষণ আন্তরিক। বোঝা গেল, ভোটার যেমন আসে না, সাংবাদিকও তেমন এরা দেখে না। সাংবাদিকরা ভোটকেন্দ্রে যায় জাল ভোট দেওয়া দেখতে, কর্মীদের মাস্তানির খবর বের করতে। এর কিছুই নেই যেখানে, সেখানে সাংবাদিকদের কাজ কী!

ওদিকে ভোটার নেই বলে ওদের প্রশ্ন করার অনেক সুযোগ; কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে আবিষ্কার করলাম, আমি ওদের ইন্টারভিউ করছি না। ওরাই বরং আমার ইন্টারভিউ করছে। আমাদের দেশে ভোট কেমন? প্রচারণার ধরনটা কী রকম? এর দু-একটা কাহিনি শুনে এমন উৎসাহ যেন আমার মতো মজার গল্পকারকে জীবনে দেখেনি। ওদের তুলনায় আমাদের ভোটের গল্প এত বিপরীতধর্মী এবং এত বিনোদনময় যে বাইরের মানুষের কাছে থ্রিলার উপন্যাসের মতো লোভনীয় মনে হতেই পারে।

ও, হ্যাঁ, ঘণ্টা দুয়েক থেকে কিছু ভোটার দেখেছিলাম। এর প্রায় সবাই-ই বয়স্ক মানুষ, বুড়ো-বুড়ি। ওদেরই দেশ নিয়ে কিছু ভাবনা আছে বলে মনে হলো।

এসব দেখতে দেখতে আফসোস হচ্ছিল, আমাদের দেশে কবে এ রকম দিন আসবে। ভোট নিয়ে কাটাকাটি-হানাহানির বদলে এমন শান্তিপূর্ণ হবে সব কিছু।

কল্পনাও করিনি কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশও বিদেশ হয়ে যাবে। আমাদের এখানেও এখন কেউ ভোট দিতে যায় না। কেন্দ্র কোথায় এই খোঁজও তেমন কেউ রাখে বলে মনে হয় না।

শান্তির কথা। সরকারি দল, তাদের সমর্থকরাও শান্তি পাচ্ছেন নিশ্চিত। ভোটে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই জয়—এত শিওর সাকসেস থিওরি বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কোনো দিনই ছিল না; কিন্তু এই শান্তির পেছনেও একটি অশান্তি দেখতে পাই। বিএনপি বা বিরোধী দল নয়, সরকারি দলের জন্যই।

ঢাকার আসনে ভোট পড়েছে ১০ শতাংশের সামান্য বেশি। যত দোষই থাকুক, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সমর্থন তো আর ১০ শতাংশে নেমে যায়নি। সাধারণ বিশ্বাস, ওদের কোর ভোট আছে অন্তত ৩০ শতাংশ; তাই যদি ধরি, তাহলে আওয়ামী লীগের ২০ শতাংশ সমর্থকও ভোট দিতে যায় না। এভাবে যদি চলে, যদি ওদের জানা থাকে যে আমাদের ভোটের দরকারই নেই, তাহলে একটা বিচ্ছিন্নতাবোধ ওদের মধ্যে তৈরি হতে বাধ্য। ওরা ভোট দিতে আসছে না মানে দলের এই কাজকে ঠিক সমর্থন করতে পারছে না। এই সাময়িক সমর্থনহীনতা স্থায়ীভাবে সরিয়ে দিতে পারে। সমর্থকরা কিছু চায় না, চায় শুধু গুরুত্ব। ভোটের বাজারে নিজের ভোটারদের গুরুত্বহীন করে তোলার মাসুল আওয়ামী লীগকে দিতেও হতে পারে।

সমর্থকরা কখনোই কোনো দলের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বরং কর্মীরা। এরাই মাঠে-ঘাটে মারামারি-ধরাধরি করে দলের আওয়াজ উঁচু করে রাখে। কয়েক মাস আগে তেমনই একজন মাঠের কর্মীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সরকারি মাঠপর্যায়ের সামান্য কর্মীরাও এখন অসামান্য শক্তির অধিকারী। জানি বলে হাসিমুখেই বললাম, ‘সময় তো নিশ্চয়ই ভালো যাচ্ছে।’

‘ভালো আর কোথায়? টাকা-পয়সা নেই।’

‘বলো কী? শুনি তো সব টাকা এখন তোমাদেরই।’

‘আরে না, আগে একটা নির্বাচনী মিছিল-মিটিংয়ে গেলে পেতাম পাঁচ-সাত শ। এখন এক-দুই শ। তা-ও কোনো কোনো সময় মেলে না। বিরোধী দল মাঠে নেই তো। আমাদের তো এমন কোনো গুরুত্ব আর নেই।’

সাধারণ কর্মীর সাধারণ বয়ানের মধ্যে অসাধারণ একটা রাজনৈতিক ভাবনার সূত্রও আছে। বিরোধী দল যখন মাঠে নেই, তখন শক্তি দেখানোর বা ওদের ঠ্যাঙানোর দরকার নেই। খামাখা কর্মী পোষার দরকার কী! কর্মীদের গুরুত্ব কমছে। কমে কমে একসময় হয়তো গুরুত্বহীনতা আর উপার্জনহীনতার দুঃখে কর্মীই আর থাকবে না।

এবার রইলেন নেতা। এটা ভালো কথা যে তাদের দুর্দিন এখনো আসেনি। সুদিনই বরং। সরকারি দলের টিকিটটা পেয়ে গেলেই চলছে। নির্বাচনে শক্তি বা টাকার খরচও তেমন হচ্ছে না। কিন্তু ওই যে, বাঁকা চোখে এর মধ্যেও দুর্দিন দেখতে পাই। যাকে দেব সেই জিতবে—এই সমীকরণে দলের কাছে সত্যিকারের নেতাদের গুরুত্বও কমছে। জনপ্রিয়, জিততে পারে—এ রকম মানুষের বদলে নিজের গোষ্ঠীর অক্ষম লোকরাই মনোনয়ন বাগিয়ে নিচ্ছেন। দক্ষ-ত্যাগী নেতারা পেছনে পড়ে উৎসাহ হারাচ্ছেন। হয়তো নিখোঁজই হয়ে যাচ্ছেন। এখন দরকার নেই, কিন্তু একদিন দরকার পড়তে পারে, তখন হয়তো এঁদের মিলবে না।

সমস্যা আরো একটা। পত্রপত্রিকায় খবর হচ্ছে, নেতাদের চেয়ে আমলারাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এঁরাই সরকারকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটাও বোধ হয় এ জন্য যে এঁরা ঠিক ভোট পেয়ে জিতে আসছেন না। এঁদের পেছনে সে রকম কোনো জনসমর্থনের শক্তি নেই বলে প্রশাসন পাত্তা দিচ্ছে না। বিরাজনৈতিকীকরণের যে ভয় নেতারা দেখান, সেটা তো উল্টা পথেই হয়ে যাচ্ছে।

ইংল্যান্ডের সেই নির্বাচনেরই আরেকটি ছবি। একজন এমপি প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণা সরেজমিন দেখতে ওর সঙ্গী হওয়ার আগ্রহ হলো। ইংল্যান্ডের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছোট ভাই ফারহান মাসুদ ওর যোগাযোগ দক্ষতায় ম্যানেজ করে ফেলল এক ডাকসাইটে সাবেক মন্ত্রী স্টিফেন টিমসকে। একসময়ের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ভদ্রলোকের নির্বাচনী এলাকায় দেখি গুটিকয়েক তরুণ প্রচার শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। আমি যে আসছি সেই খবর দেখা গেল ওরা খুব ভালো জানে। জন নামের একজন বলল, ‘স্টিফেন আমাকে বলেছে তোমার কথা। তুমি একটু অপেক্ষা করো। সে আসবে।’

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর হঠাৎ জন বলে, ওই যে আসছে...

একটা আবাসিক এলাকায় দাঁড়িয়ে বলে জনবিরল রাস্তা। গাড়িটাড়ি তো দেখা যাচ্ছে না। দূরে দু-একজন মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে ঘোরাফেরা করছে।

জন বলল, ‘ওই যে তাকিয়ে দেখো... আসছে।’

এবার ভালো করে তাকাই। দেখি লম্বামতো একজন মানুষ, কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে এক মনে হেঁটে আসছে। ইনিই! টনি ব্লেয়ার সরকারের মন্ত্রী। একা।

তাড়াতাড়ি ছবি তুলতে গেলাম মোবাইল বের করে। জন হাসল, ‘চিন্তা কোরো না। ও আসার পর তুমি যেমন চাও তেমন ছবি তুলতে পারবে।’

জনকে বলতে পারলাম না, আমার পোজ দেওয়া ছবি না—এই ছবিটাই দরকার। একটি এলাকার চার-পাঁচবারের এমপি একা একা হেঁটে নির্বাচনী প্রচারে আসছেন—ছবি না থাকলে এটা যে দেশের কাউকে বিশ্বাস করাতে পারব না।

ওয়েস্ট হ্যামের সেই সন্ধ্যার একাকী এমপির ছবি মনে খুব রেখাপাত করেছিল। আর ভাবছিলাম, কোনো দিন কি আমাদের দেশে এই দৃশ্য রচিত হবে।

এখনকার নির্বাচনী হালচাল দেখে দেখে কিন্তু ক্ষীণ আশা জাগছে। সমর্থক-কর্মীরা যেভাবে আস্তে আস্তে আগ্রহ হারাচ্ছে এবং সরে যাচ্ছে, তাতে কে জানে সেই দিন হয়তো দূরে নয়।

পার্থক্য এই যে বিলেতি এমপির একাকিত্বটা ত্যাগের প্রতীক। আর আমাদের নেতার একাকিত্ব পরিত্যক্ত হওয়ার প্রতীক।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা