kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অটো উত্তীর্ণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা বাদ পড়েছে

এ কে এম শাহনাওয়াজ

১৬ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৪৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অটো উত্তীর্ণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা বাদ পড়েছে

এই করোনাকালে পৃথিবীর সব দেশের মানুষ নানা ধরনের সংকটে পড়েছে। অসুস্থতা ও চিকিৎসাজনিত সংকট তো রয়েছেই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা আনুষঙ্গিক সংকট। এর মধ্যে বড় দুটি সংকট হচ্ছে অর্থনৈতিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়। প্রথম দিকে আতঙ্কে ও বাস্তবতায় সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। ঘরবন্দি হয়ে পড়ে দেশবাসী—বিশেষ করে নাগরিক জীবন। দিন এনে দিনে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ চরম হতাশায় পড়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য। মিল-কারখানায় তালা ঝোলে। সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বিদেশের সঙ্গে। এমন অবস্থায় আমাদের দেশ ভেঙে পড়েনি। এর দুটি কারণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এই যে সরকারপক্ষ বলছে, দেশে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। এর বাস্তবতা লক্ষ করেছি কভিডকালে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অসাধারণ নেতৃত্বগুণ। সময়মতো পর্যাপ্ত রিলিফ ওয়ার্ক করেছেন। অনেকের হায় হায়-এ কর্ণপাত না করে পোশাক কারখানাগুলো খুলে দিয়েছেন। মালিকরা লক্ষ রেখেছেন স্বাস্থ্যবিধি মানার দিকটি। ফলে এত এত পোশাক কারখানার লাখ লাখ শ্রমিকের মধ্যে আমরা তেমনভাবে কভিড সংক্রমণের কথা শুনিনি। পথঘাটে মানুষ বেরিয়ে পড়েছে। জীবন অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এ দেশে কভিড মহামারির রূপ পায়নি। আমরা মনে করি, সরকার কভিড মোকাবেলায় অনেকটা সফল হয়েছে। এমন এক বাস্তবতায় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মানুষদের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিশেষ পদ্ধতিতে অটো পাসের ফর্মুলার কথা শুনে দারুণ হতাশ হতে হয়েছে।

সরকারের চমৎকার পথচলায় অমন বিতর্কের কাঁটা বিছানোর প্রয়োজন কেন পড়ল বুঝতে পারলাম না। এমনিতেই ধর্ষণ-সন্ত্রাসের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে সারা দেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলছে। এ সময় এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে বেশ অনেকটা সময় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে শেষে এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে, যাকে সুচিন্তিত বলার কোনো কারণ নেই। সচেতন মানুষের ধারণা, এই সিদ্ধান্ত সরকারকে কিছুটা সমালোচিত করবে।

সিদ্ধান্ত যদি এমনই হবে, তাহলে তিন-চার মাস অপচয় করা হলো কেন? আমরা বুঝি কভিডের কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও তাঁর সহযোগীরা নির্ভাবনায় বসে ছিলেন না। যথেষ্ট চাপের মধ্য দিয়ে তাঁদের সময় কাটছে। তাঁরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন একটি ভালো উপায় বের করতে। এ দেশে তো একটি প্রবণতা রয়েছে, ক্ষমতাবানরাই সব বিষয়ে জ্ঞানী হয়ে থাকেন। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনরা অবদান রাখার খুব বেশি সুযোগ পান না। আমি জানি না এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার বদলে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এইচএসসি পরীক্ষার ফল নিরূপণ করে সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হলো কেন! এর চেয়ে কি ভালো কোনো বিকল্প ছিল না?

এই সিদ্ধান্তে সুফল ভোগ করবে শুধু কম মেধাবী, কম মনোযোগী ফেল করা শিক্ষার্থীরা। তারা সরকারি সিদ্ধান্তে মিষ্টি বিতরণ করবে। কিন্তু শোকের ছায়া নামবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে। কভিড পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে তো ওদের গলায় গিলোটিন দেওয়া যেতে পারে না! এটি ১৯৭১ পরিস্থিতি নয়, যেখানে করণীয় কিছু ছিল না। এখন সরকারি নির্দেশেই সব স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়েছে। মিল-কারখানা চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হয়েছে। পূর্ণোদ্যমে চলছে অফিস-আদালত। নগরের রাস্তা আবার যানজটে মন্থর হয়ে গেছে। চাইলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল-কলেজও খুলে দেওয়া যেতে পারে বলে অনেকের অভিমত। অবস্থা অনেকটা এমনই। কিন্তু এখানে এসেই সরকারকে ব্রেক কষতে হয়েছে। এতে যদি শিক্ষার্থীরা সংক্রমিত হয়ে পড়ে, তবে সে দায় সরকারের ঘাড়ে পড়বে। এতে তৈরি ক্ষোভ প্রশমিত করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এমন ভাবনা অবাস্তব নয়। কিন্তু তাই বলে লাখ লাখ ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার পথ দুর্গম করে দেওয়া যায় না। কেন নয় সে কথায় আসছি।

প্রথমে বিবেচনায় রাখা উচিত এসএসসি ও এইচএসসির শিক্ষা বাস্তবতা এক নয়। অর্থাৎ এক ভার বহন করে না। পড়ালেখার ধারাটা এইচএসসিতে এসে এক ধাপ উঁচুতে উঠে যায়। তাই এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের আলোকে এইচএসসির অটো উত্তীর্ণ করে দেওয়াটা ন্যায়ানুগ হতে পারে না। সবচেয়ে জরুরি বিষয়টিকে সম্ভবত আমাদের নীতিনির্ধারকরা বিবেচনায় রাখেননি। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এইচএসসি পাস করে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবে। শুধু ভর্তি নয়, যারা ভালো ফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে তারাও অন্ধকার দেখবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত ভর্তির জন্য জিপিএ ৪ থেকে ৪.৫ চাওয়া হয়। কখনো কিছুটা কম জিপিএও চাওয়া হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে আবেদন করতে লাগে এসএসসি ও এইচএসসিতে কমপক্ষে জিপিএ ৪.২৫ আর স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে জিপিএ ৩.৫। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ফর্মুলা মতো জেএসসি আর এসএসসির ফলাফল গড় করে এইচএসসির ফলাফল তৈরি হলে সম্ভাবনাময় অনেক শিক্ষার্থী দারুণ সংকটে পড়বে।

বিজ্ঞ ক্ষমতাবানরা পিইসি ও জেএসসি নামে দুটি পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছেন। এ থেকে কতটা বেশি জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তা রিভিউ করে দেখেছেন কি না জানি না। তবে বাস্তবে আমরা দেখেছি, এই দুই পরীক্ষা আশীর্বাদ হয়েছে গাইড বইয়ের প্রকাশক ও কোচিং ব্যবসায়ীদের। আর টাকা যাচ্ছে অভিভাবকদের পকেট থেকে। এখন পর্যন্ত এই দুই পরীক্ষার সার্টিফিকেট উচ্চশিক্ষার ভর্তিযুদ্ধে এবং পরবর্তী সময়ে চাকরির প্রতিযোগিতায় ভূমিকা রাখে না বলে এর ফলাফলের ব্যাপারে তেমন সতর্ক থাকে না শিক্ষার্থী—যতটা এসএসসি ও এইচএসসির ক্ষেত্রে থাকে। এখন ধরি, একজন মেধাবী শিক্ষার্থী অসুস্থতা বা অন্য কোনো দুর্বিপাকে জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে অনেক কষ্টে। হয়তো ফলাফলে সে জিপিএ ৩.৫ পেয়েছে। যেহেতু এই ফলাফলের পরবর্তী মূল্যায়ন নেই, তাই এই ফলাফলকে সে ধর্তব্যের মধ্যে রাখেনি। এই শিক্ষার্থী এসএসসিতে জিপিএ ৪ বা ৪.৫ পেয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে নামার জন্য তার লক্ষ্য থাকবে এইচএসসিতে ভালো একটি ফল করা। কারণ ভর্তি পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল থেকে কিছু নম্বর যোগ হয়। আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দুই থেকে পাঁচ নম্বরের ব্যবধানে একজন কামিয়াব হতে পারে, আর অন্যজন ছিটকে পড়তে পারে। অটো পাসের গোলকধাঁধায় পড়ে জেএসসি ও এসএসসির ফলাফলের গড়ে এইচএসসির যে রেজাল্ট দাঁড়াবে তাতে সমসংকটের অসংখ্য শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র তার নাগরিককে এমন শাস্তি দিতে পারে না। এখন সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী আদালতের দ্বারস্থ হলে জানি না পরিণতি কী দাঁড়াবে।

দীর্ঘদিন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পেণ্ডুলামের মতো দুলিয়ে অমন একটি মূষিক প্রসব করল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সব কিছু যখন স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়েছে, তখন কি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সতর্কতার সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া যেত না? এ বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক কলেজ শিক্ষক ও অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের উত্তর, সরকার যখন পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলেছিল, তখন থেকেই তাঁরা প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলেন। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী পড়ায় মনোনিবেশ করেছিল। তাঁরা দেখিয়েছিলেন নিজ কলেজ এবং কাছাকাছি স্কুলগুলোতে সহজেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে যথেষ্ট দূরত্বে পরীক্ষার্থীদের বসানো যেত। পরীক্ষা নেওয়ার লোকবলেরও অভাব হতো না। প্রয়োজনে সেই সব স্কুলের শিক্ষকদেরও পরীক্ষা পরিচালনায় যুক্ত করা যেত। দুই পত্রের জায়গায় এক পত্রে এবং সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে এক সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া শেষ করা যেত। কারণ এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা সুযোগ থাকতেও না নেওয়াটা আমি কোনোভাবেই ন্যায়সংগত বলতে পারব না। হ্যাঁ, কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে, যারা কভিড বা অন্য কোনো কারণে অসুস্থ, শুধু তাদের জন্য ঐচ্ছিক হিসেবে অটো পাস ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। ভালো ফলের জন্য তারা চাইলে ড্রপও দিতে পারে, যা সব সময়ই করা হয়।

একজন শিক্ষক জানালেন, এখন বিভিন্ন উপজেলায় বিজ্ঞান মেলা চলছে। সেখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য করা হচ্ছে বিজ্ঞান মেলায় আসার জন্য। এবার উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির আবেদন কোনো কোনো কলেজ অনলাইনে সম্পন্ন করতে পারলেও বেশির ভাগ কলেজে শিক্ষার্থীদের একাধিকবার সশরীরে যেতে হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সেখানে সামনে আসেনি। আমাদের প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের জড়ো করে যদি বিজ্ঞান মেলা করা যায়, ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে, তাহলে আরো বেশি নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা নেওয়া যেত না কেন? মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, উচ্চ মাধ্যমিকে যারা বিভাগ পরিবর্তন করতে চায় বা যারা ফেল করার কারণে পরীক্ষায় অংশগ্রহণে অযোগ্য হয়েছিল, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। আশা করছি সেখান থেকে একটি ভালো সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসবে।

আমরা জানি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাজ্ঞজনেরা যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে এই পরীক্ষা মোকাবেলা সংকট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা রেখেই বলব, এইচএসসি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের জন্য খুব প্রয়োজন এই পরীক্ষার ফল। আমরা মনে করি, কভিড সত্ত্বেও ১৯৭১-এর যুদ্ধকালের মতো সময় নয় যে অমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা একটি দুর্বল ফায়সালার ফর্মুলায় সবাইকে সার্টিফিকেট বিতরণ করা হবে। মেধাবী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া কঠিন হবে। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় কোনো চিন্তার অবকাশ থাকলে বিজ্ঞজনেরা সেদিকে যেন নজর দিতে পারেন।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]
 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা