kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সমাজ পরিশুদ্ধ হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে

আলী হাবিব

৭ অক্টোবর, ২০২০ ১১:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সমাজ পরিশুদ্ধ হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে

লিখে আর কতটুকু বলা যায়, যখন ‘ধর্ষণ বর্বরতায় স্মম্ভিত দেশ’, যখন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাসে ধর্ষিত নববধূ, নারকীয় বর্বরতায় যখন নারীর অধিকার ও সম্মান ভূলুণ্ঠিত, যখন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হতে হয় বিধবাকে, তখন কোথায় লুকাব মুখ? কী দিয়ে মুছব এই অসম্মানের গ্লানি? এ কোন বিরুদ্ধ সময় পার করছি আমরা। একের পর এক এসব কী ঘটছে দেশে? এমনিতেই করোনার কারণে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। কর্মহীন হচ্ছে মানুষ। অর্থনীতি আগের অবস্থায় নেই। এই ক্রান্তিকালে কিছু মানুষ কী করে এমন পশুত্বের পরিচয় দেয়!

গত মাসের শেষ শুক্রবারে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক তরুণী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। ওই তরুণী তাঁর স্বামীকে নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ধর্ষণে অভিযুক্ত সবাই ছাত্রলীগের কর্মী বলে খবরে প্রকাশ। সারা দেশ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল এই এক ঘটনায়। এর পরপরই অন্য একটি মামলার আদালতের এক রায়ে আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। ভুক্তভোগী এক নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন মাগুরার মুখ্য  বৈচারিক হাকিম। মামলার রায়ে ভুক্তভোগী নারীর সম্মান রক্ষার্থে প্রতীকী নাম ব্যবহার করেন তিনি। দেশের বিচারব্যবস্থায় বিচারপ্রার্থীর নিজ নামের পরিবর্তে প্রতীকী নামে রায় ঘোষণার প্রথম দৃষ্টান্ত এটি। রায়ে ভুক্তভোগী মেয়েটির প্রকৃত নাম উল্লেখ না করে প্রতীকী নাম হিসেবে ‘কল্প’ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতীকী নাম ব্যবহার করে রায় দিয়ে ভুক্তভোগী নারীর সামাজিক সম্মান রক্ষা করলেন বিচারক; কিন্তু সমাজে তো তার কোনো প্রতিফলন দেখতে পেলাম না আমরা। কী ঘটল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে? এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল করে দেওয়া হলো। আবার দেশব্যাপী তোলপাড়। গ্রেপ্তার করা হলো অভিযুক্তদের। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন আবার আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা। একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে বেগমগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতাদের হাত ধরে আওয়ামী রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। দলে কোনো পদ-পদবি ছিল না তাঁর। দলীয় পরিচয়েই জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ঘটনায় যখন দেশ তোলপাড়, তখনই পাশের জেলা লক্ষ্মীপুরে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হলেন এক বিধবা। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের ভিডিও প্রকাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এবার অভিযুক্ত শ্রমিক লীগের এক নেতা। কী করে সম্ভব?

দলের কোনো নেতা বা কর্মীর অপকর্ম ধরা পড়ার পর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়; কিন্তু দল থেকে বহিষ্কার করলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। ছাত্রলীগের ঐতিহ্যের কথাও তো নতুন করে বলার নয়। বাংলাদেশের সব ইতিবাচক রাজনৈতিক অর্জন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের হাত ধরে। ভাষা আন্দোলন থেকে উনসত্তরের গণ-আন্দোলন, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ—দেশের রাজনীতিতে অবিস্মরণীয় সব স্বর্ণালি অর্জন। দেশের ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগ। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে যে আওয়ামী লীগ, সেই দলটি টানা তিন দফা সরকারে। সেই দলের পরিচয়ে কী করে এসব ঘটনা ঘটে? দায় কার? দায়িত্ব কে নেবে। শুধু যে আওয়ামী লীগের শাসনামলেই এসব ঘটনা ঘটছে, তা নয়। অতীতেও তো এমন ঘটনা ঘটেছে।

একেবারে স্পষ্ট করেই তো বলে দেওয়া যায়, সমাজের এমন অধঃপতিত অবস্থা এক দিনে তৈরি হয়নি। সালিসের নামে সিলেটে নূরজাহান নামের এক গৃহবধূকে পাথর মেরে হত্যা করা হয়েছিল। টিএসসিতে এক তরুণীকে বিবস্ত্র করে উল্লাস করার মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে অতীতে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর দেশব্যাপী হত্যা-নির্যাতনের উৎসব করার মতো ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতায়ই কি দেশে আজ গুম, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, পুড়িয়ে মারার মতো জঘন্য সব অপরাধ নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে? অতীতে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হলে এবং অপরাধীরা শাস্তি পেলে আজকের এই পরিস্থিতি হয়তো দেখতে হতো না। দায়িত্বহীন রাজনীতিই কি সামাজিক অধঃপতনের কারণ? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে তো বলতেই হবে, দায় রাজনীতির, দায়িত্বও।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম তো কারো অজানা নয়। অন্তত পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সীরা তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ বইটির সঙ্গে পরিচিত। তাঁর এই ‘বর্ণপরিচয়’ বইয়ে কিছু ছোট গল্প আছে, যা ছোটবেলা থেকেই একজন মানুষের চরিত্র গড়ে তুলতে সহায়ক। এমন দুটি গল্পের দুই চরিত্র মাধব ও ভুবন। ১০ বছর বয়সী মাধবকে তার বাবা পাঠশালায় পাঠিয়েছিলেন লেখাপড়া শিখতে। মাধব ছেলেটি ভালো ছিল। দোষের মধ্যে একটাই, পরের জিনিস না বলে নিত। একদিন ধরাও পড়ে গেল। তাকে স্কুল থেকে বিদায় করে দেওয়া হলো। মাধবকে তার বাবা অন্য স্কুলে ভর্তি করে দিলেন; কিন্তু মাধব তার চুরির অভ্যাস ছাড়তে পারল না। সম্ভ্রান্ত ঘরের ছেলে হয়েও শেষ পর্যন্ত এলাকায় সে চোর বলে পরিচিত হলো। ভুবনের গল্পটি একটু অন্য রকম।

গল্পের ভুবন শৈশবেই মা-বাবাকে হারিয়ে মাসির কাছে বড় হচ্ছিল। উপযুক্ত বয়সে মাসি তাকে স্কুলে পাঠালেন। ভুবন একদিন স্কুল থেকে একজনের বই চুরি করে আনল। মাসি জানতে চাইলেন, বইটি সে কোথায় পেয়েছে। ভুবন সত্য কথাটিই বলল। অন্যের বই সে না বলে এনেছে। মাসি বইটি রেখে দিলেন। ফেরত দিতে বললেন না। এতে দিনে দিনে ভুবনের সাহস বেড়ে গেল। চুরি করতে করতে সে পাকা চোর হয়ে উঠল। শেষে ধরাও পড়ল। বিচারে গুরুদণ্ডই হলো তার। ভুবন বিচারককে জানাল, সে তার মাসির সঙ্গে দেখা করতে চায়। মাসিকে আনা হলো। তাঁকে কাছে যেতে বলল ভুবন। মাসি কাছে যেতেই, সে তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে দাঁত দিয়ে কান কেটে নিল। উপস্থিত সবাই অবাক। প্রশ্ন করা হলো ভুবনকে। কেন সে এ কাজটি করল? ভুবন জানাল, মাসির কারণেই আজ শাস্তির মুখে সে। প্রথম যেদিন সে চুরি করেছিল, সেদিনই যদি মাসি তাকে শাসন করতেন, তাহলে আজ তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হতো না। 

এই অপরাধপ্রবণ সমাজকে কলুষমুক্ত করতে হলে দায় স্বীকার করে দায়িত্ব নিতে হবে। নিতে হবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বিশুদ্ধ রাজনীতিই সমাজকে পরিশুদ্ধ করবে।

 

লেখক : সাংবাদিক, ছড়াকার

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা