kalerkantho

বুধবার । ১২ কার্তিক ১৪২৭। ২৮ অক্টোবর ২০২০। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

হৃদরোগ ও করোনাঝুঁকি

অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন, পরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

অনলাইন ডেস্ক   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১০:৫২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হৃদরোগ ও করোনাঝুঁকি

হৃদরোগীদের করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি অন্য সাধারণ মানুষের মতোই। অর্থাৎ হৃদরোগের সমস্যা আছে এমন ব্যক্তিরা বেশি করোনায় আক্রান্ত হবে—বিষয়টি এমন নয়। তবে হৃদরোগীরা কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে তাদের মায়োকার্ডাইটিসসহ বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমনকি কভিড থেকে সেরে ওঠার পরও হৃদরোগসংক্রান্ত নতুন কিছু জটিলতা তৈরি হয়। কারণ যে মাত্রার সংক্রমণের ধকল একজন কম বয়সী ও সুস্থ-সবল মানুষ সামলে নিতে পারে, সেই একই ধকল হৃদরোগীরা হয়তো বা সামলে উঠতে পারে না।

ঝুঁকি বেশি যাদের
করোনাভাইরাস মূলত ক্ষতি করে ফুসফুসকে। কিন্তু জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত প্রবন্ধে বিজ্ঞানীরা জানান, কিছু ক্ষেত্রে ফুসফুসে জটিলতা দেখা দেওয়ার আগেই হার্ট আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে কভিড আক্রান্তদের আগে থেকে হৃদরোগ থাকলে সমস্যা বেশি হয়।

কারণ হার্ট ও ফুসফুস শরীরে তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল বলে একটির ক্ষতি হলে তার প্রভাব পড়ে অন্যটির ওপর। যাদের হার্ট দুর্বল, তাদের হার্টের ক্ষতি বেশি হয়। দুর্বল ফুসফুসের প্রভাবও হার্টে গিয়ে পড়ে।

করোনায় বেশি ঝুঁকিতে যেসব হৃদরোগী 
► হার্টে পাম্প করার ক্ষমতা যাদের কম।

► পেসমেকার বা ভাল্ভ লাগানো হয়েছে যাদের।

► অতিরিক্ত মোটা বা স্থূল যারা।

► ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা রয়েছে যেসব হৃদরোগীর।

► ধূমপায়ী।

► বয়স্ক হৃদরোগী ইত্যাদি।

মায়োকার্ডাইটিস
বলা হচ্ছে, করোনায় আক্রান্তদের হৃদরোগসংক্রান্ত যে রোগটি বেশি হয়, সেটি হলো মায়োকার্ডাইটিস। যদি হার্টের পেশিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়ায়, তখন তাকে বলে ভাইরাল মায়োকার্ডাইটিস। এটি হলো হূদেপশির প্রদাহ। করোনাভাইরাসের কারণে হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশিতে আঘাতের কারণে মায়োকার্ডাইটিস হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগীরা তেমন কোনো জটিলতা ছাড়াই সুস্থ হয়ে যায়।

উপসর্গ
► ব্যায়াম ও পরিশ্রমের সময় শ্বাস নিতে অসুবিধা।

► বুকে চাপ ধরা এবং তীব্র ব্যথার অনুভূতি, যা সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে।

► বিশ্রামের সময়ও নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়া।

► কোনো কোনো ক্ষেত্রে পা ফুলে যেতে পারে।

► ফ্লুর মতো উপসর্গ, যেমন—অবসাদ, ক্লান্তি ভাব, উচ্চ তাপমাত্রা।

► হঠাৎ চেতনা লোপ পাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

জটিলতা
মায়োকার্ডাইটিস হয়ে হার্ট পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে সাধারণত তিন ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন—

হার্ট ফেইলিওর : করোনায় আক্রান্তদের যে কারোরই হার্ট ফেইলিওর হতে পারে। তবে যাঁদের বয়স পঁয়ষট্টির বেশি এবং আগে থেকে হার্ট ফেইলিওরের ইতিহাস আছে অথবা কোনো কারণে হার্ট দুর্বল, তাঁদের হঠাৎ করে হার্ট ফেইলিওর ঘটতে পারে। এমনকি জটিলতা তৈরি হয়ে মারাও যেতে পারেন রোগী।

অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন : কারো কারো হৃদস্পন্দন খুব কমে যেতে পারে। আবার কারোর ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দন খুব বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা না করালে রোগীর প্রাণহানি ঘটতে পারে।

রক্ত জমাট : ইস্কেমিক হৃদরোগ আছে যাদের, তাদের হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার চিহ্ন দেখা যায় না। কভিডের ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে গিয়ে এমন পরিস্থিতি হয় যে হার্টের ধমনির পথ অবরুদ্ধ না হলেও সে রকম উপসর্গই হয় অনেকটা।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা
কেউ মায়োকার্ডাইটিসে আক্রান্ত হয়েছে কি না, তা জানা যেতে পারে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। যেমন—

► ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম।

► ইকোকার্ডিওগ্রাম।

► বুকের এক্স-রে।

► এমআরআই ইত্যাদি।

চিকিৎসা
► হার্ট ফেইলিওর বা হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ।

► স্বল্প লবণযুক্ত খাদ্য গ্রহণ।

► পর্যাপ্ত বিশ্রাম।

► প্রদাহ কমাতে প্রয়োজনে স্টেরয়েডের ব্যবহার।

► প্রয়োজনে কাউন্সেলিং করানো।

হৃদরোগীর জন্য করণীয়
হৃদরোগসংক্রান্ত নানা জটিলতায় যারা ভুগছে, তাদের কভিড হোক বা না হোক—কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এতে করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত জটিলতা এড়ানো অনেকাংশে সম্ভব। যেমন—

► হৃদরোগীরা রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধগুলো নিয়মিত খেতে থাকুন। কোনো গ্যাপ দেবেন না বা ওষুধ খেতে ভুলে যাবেন না।

► বাড়িতে কারো জ্বর, সর্দি ও কাশি হলে ওই ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরে থাকুন।

► সামান্য জ্বর, সর্দি, কাশি কিন্তু শ্বাসকষ্ট নেই, তারা বাড়িতেই চিকিৎসা নিন। জটিলতা বাড়ছে মনে হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হোন বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

► রক্তচাপ, নাড়ির গতি, দেহের তাপমাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করুন।

► খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাড়ির বাইরে যাবেন না। একান্তই বের হলে মাস্ক পরে বের হোন।

► নিয়মিত হাত স্যানিটাইজ করুন। অপ্রয়োজনে চোখ, নাক ও মুখে হাত না লাগানোই শ্রেয়।

► করোনার শারীরিক দূরত্ববিধি কঠিনভাবে মেনে চলুন।

► নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা করুন। ঘরের বাইরে বের না হয়ে ভোরে বা সন্ধ্যায় বাড়ির ছাদে হাঁটুন।

► যোগব্যায়াম ও শ্বাসের ব্যায়ামগুলো নিয়মিত করুন।

► ভালো হয় প্রতিদিন রোদে ১৫ থেকে ২০ মিনিট থাকতে পারলে।

► প্রতিদিন সুষম খাদ্য গ্রহণ ও প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন।

► অতিরিক্ত চিন্তা নয়, বরং সদা হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন।

► কভিড মহামারির নেগেটিভ খবরগুলো কম শোনার চেষ্টা করুন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা