kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিসিএসের প্রস্তুতি নেবেন নাকি ব্যাংকের?

অনলাইন ডেস্ক   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৯:২১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিসিএসের প্রস্তুতি নেবেন নাকি ব্যাংকের?

মডেল : আজাজুল ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

দুটি সেক্টরের চাকরির পরীক্ষা কাছাকাছি সময়ে হলে চাকরিপ্রার্থীরা বুঝে উঠতে পারেন না কী করা উচিত। বিসিএসের প্রস্তুতি নেবেন, নাকি ব্যাংকের চাকরির? অনেকে একসঙ্গে দুই সেক্টরের প্রস্তুতিই নিতে চান। আসলে কী করা উচিত সে ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক ও ৩৮তম বিসিএসে (সাধারণ শিক্ষা) সুপারিশপ্রাপ্ত মো. আব্দুল আউয়াল

একই সময়ে একাধিক পরীক্ষা?
করোনা পরিস্থিতি সামলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সামনে আরো পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। বিসিএস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা ধরনের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির এটাই মোক্ষম সময়। করোনার কারণে এ বছর বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি কম প্রকাশিত হয়েছে এবং নিয়মিত নিয়োগপ্রক্রিয়া থমকে আছে। ফলে চাকরিপ্রত্যাশীদের মাঝে উৎকণ্ঠা থাকলেও সবার উচিত নিজেকে যথাযথ প্রস্তুত রাখা। করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে আসামাত্রই ৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

এ ছাড়া কাছাকাছি সময়ে আরো অনেক সরকারি চাকরির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে চাকরিপ্রত্যাশী অনেকে দ্বিধায় পড়ে যান এই ভেবে যে কোনটির প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাকরির প্রস্তুতি এবং বিসিএসের প্রস্তুতি একসঙ্গে নেওয়া উচিত বা ঠিক হবে কি না? আমি মনে করি, ব্যাংক ও বিসিএসের প্রস্তুতি সাংঘর্ষিক নয়। দুটির প্রস্তুতি একসঙ্গেই নেওয়া উচিত। কারণ ব্যাংক ও বিসিএসের প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের পরিপূরক।

সমন্বিত প্রস্তুতি যে কারণে
যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কোয়ালিফাই করার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না এবং দেশের চাকরির বাজার নানা কারণে বৈচিত্র্যহীন হওয়ায় অনেক বেশি প্রতিযোগী ব্যাংক ও বিসিএসের পরীক্ষায় অংশ নেন। বিসিএসে নিয়োগপ্রক্রিয়াসহ নানা ধরনের জটিলতার কারণে নিয়োগ বিলম্বিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তিন বছরের বেশি সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় বেকার বসে থাকা আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সম্ভব হয় না। ব্যাংকের চূড়ান্ত নিয়োগপ্রক্রিয়া সাধারণত তুলনামূলক কম সময়ে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ১৬ জুলাই ২০১৭ তারিখে আর চূড়ান্ত নিয়োগ সম্পন্ন হয় ২১ আগস্ট ২০১৯। পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হতে দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে। অন্যদিকে ৩৮তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় ২০ জুন ২০১৭ তারিখে আর ৩০ জুন ২০২০ তারিখে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতদের তালিকা প্রকাশিত হলেও চূড়ান্ত নিয়োগ এখনো সম্পন্ন হয়নি। নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হতে আরো কয়েক মাস লাগতে পারে। কাছাকাছি মানের দুটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি এক মাসের ব্যবধানে প্রকাশিত হলেও বিসিএসের নিয়োগ পেতে প্রায় দেড় বছর বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ আরো দ্রুত সম্পন্ন হয়। তাই বিসিএসের প্রস্তুতির পাশাপাশি ব্যাংকের চাকরির প্রস্তুতিও নেওয়া উচিত বলে মনে করি।

প্রস্তুতিতে মিল-অমিল
বিসিএস ও ব্যাংকের নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এক না হলেও পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন প্রায় একই রকম। ব্যাংকে প্রিলিমিনারির পর দ্রুত লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় প্রার্থীকে অল-আউট পারফরম্যান্স করতে হবে। পরীক্ষায় প্রার্থীদের মধ্যে খুব অল্প নম্বরের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় বা কেউ কেউ অল্প নম্বরের জন্য বাদ পড়েন। তাই লেখার মান ধরে রেখে সব প্রশ্নের উত্তর করা উচিত। অন্যদিকে বিসিএস লিখিত পরীক্ষা হয় পাঁচ দিনব্যাপী (সাধারণ ক্যাডার মোট ২১ ঘণ্টা, পেশাগত ক্যাডার ২৪ ঘণ্টা, উভয় ক্যাডার ২৫ ঘণ্টা)। এখানে একটি বিষয়ে প্রার্থী আশানুরূপ পারফরম্যান্স করতে না পারলেও অন্য বিষয়ের মাধ্যমে তা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে।

এ ছাড়া বিসিএস ও ব্যাংকে নিয়োগের ভাইভার নম্বরের একটি বিশাল পার্থক্য রয়েছে। বিসিএসের ভাইভায় ২০০ নম্বর বরাদ্দ থাকে, যেখানে ব্যাংকের জন্য ২৫ নম্বর। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে—ব্যাংকের ভাইভার নম্বর কম হলেও তা বিসিএসের ভাইভার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

বিসিএস ও ব্যাংকের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা যথাক্রমে ২০০ ও ১০০ নম্বর আর লিখিত পরীক্ষা যথাক্রমে ৯০০ ও ২০০ নম্বরের হয়। বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা হয় বাংলা, ইংরেজি, বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতার ওপর। অন্যদিকে, ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষা হয় বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের ওপর।

বিসিএস ও ব্যাংকে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—উভয় পরীক্ষায় সমসাময়িক চিন্তা-ভাবনা বা বিষয়সমূহের হালনাগাদকৃত তথ্য, তথ্য বিশ্লেষণ, কোটেশন, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষায় কাজে লাগে, যা প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতিকালে গুছিয়ে নিলে উভয় পরীক্ষাতেই সমানভাবে কাজে লাগে।

বিসিএসের বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, বাংলা ও ইংরেজির প্রস্তুতি নিলে তার মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার ফোকাস রাইটিং অংশের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। আবার উভয় পরীক্ষায় ট্রান্সলেশন ও রিট্রান্সলেশন, বিভিন্ন ধরনের চিঠি বা আবেদনপত্র লিখতে বলা হয়ে থাকে।

বিসিএসের বাংলা ও ইংরেজি লিখিত পরীক্ষার রচনার জন্য পড়লে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহে রেখে আত্মস্থ করলে তা দিয়ে খুব সহজেই ব্যাংকের বাংলা ও ইংরেজি ফোকাস রাইটিং অংশ উতরে যাওয়া যায়।

গণিতে বাড়তি নজর
গণিত অংশের দিকে নজর দিলে দেখা যায়—ব্যাংকের জন্য নির্ধারিত কোনো সিলেবাস নেই। তাই বিসিএসের জন্য যে সিলেবাস দেওয়া আছে, তার প্রায় সব টপিক ব্যাংকের জন্যও সমাধান করতে হয়।

বিসিএস বা ব্যাংকে একই ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে। উভয় পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিগত নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধান করতে হবে।

ব্যাংকে চাকরির প্রস্তুতির জন্য আগারওয়ালের বই কিংবা ওয়েবসাইটভিত্তিক কিছু সমস্যার সমাধান করতে পারলে খুব ভালো হয়, যা বিসিএস পরীক্ষায়ও কাজে আসবে। এ ছাড়া মানসিক দক্ষতার ওপর বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় যথাক্রমে ১৫ ও ৫০ নম্বরের প্রশ্ন আসে। তবে ব্যাংকের পরীক্ষায় এ অংশ থেকে সাধারণ দু-একটি প্রশ্ন আসে। 

তথ্যই শক্তি
বিসিএস ও ব্যাংক উভয় চাকরির পরীক্ষায় সফলতার জন্য তথ্যবহুল লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যানবেইস, ইউএনডিপি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক বার্ষিক রিপোর্ট, পরিসংখ্যান ব্যুরো, আদমশুমারির রিপোর্ট প্রভৃতি উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ উভয় নিয়োগ পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভায় কাজে লাগাতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় বিজ্ঞানের জন্য যথাক্রমে ১৫ ও ১০০ নম্বর বরাদ্দ থাকে, যা ব্যাংকের জন্য পড়তে হয় না।

একই সঙ্গে প্রস্তুতি
আমার পরামর্শ হলো—ব্যাংক ও বিসিএসে একই সঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। কারণ নিয়োগ পরীক্ষাগুলো সাধারণত খুব কাছাকাছি সময়ে বা কিছুটা আগে-পরে হয়। তাই একটায় যদি উত্তীর্ণ নাও হন, অন্যটির সুযোগ থাকবে।

আমার মতে, ব্যাংকের চাকরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ বিসিএসের প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এ ছাড়া ব্যাংকের ক্যারিয়ার গ্রোথটাও ভালো।

সম্প্রতি প্রকাশিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার ফল থেকে দেখা যায়—বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। এখন নিজের ক্যারিয়ার ভাবনা, পোস্টিং, বেতন, কাজের ধরন, সামাজিক প্রেক্ষাপট, কাজের চাপ, ব্যক্তিগত ভালো লাগা অনুযায়ী কেউ ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেবেন, না হয় ব্যাংকার হিসেবে নিজেকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। যদিও ব্যক্তিগত ভালো লাগা, দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিজের ক্যারিয়ার গঠনের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়, তার পরও সামগ্রিক চাকরির বাজার এবং দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও বিসিএসের প্রস্তুতি যুগপৎ নেওয়ার পক্ষে আমার পরামর্শ থাকবে।

অনুলিখন : এম এম মুজাহিদ উদ্দীন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা