kalerkantho

শনিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৭। ২৪ অক্টোবর ২০২০। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অবিস্মরণীয় সেই ভাষণ

রিয়াজ আহমেদ

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১২:৫৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অবিস্মরণীয় সেই ভাষণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর একটি শ্রেষ্ঠ ভাষণ বাংলায় দিয়েছিলেন।

১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য পদ লাভের আট দিনের দিন সাধু বাংলায় বঙ্গবন্ধু এই ভাষণ দেন। এটা ছিল জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তি লাভ করে। এই ঘোষণা শোনার অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ বঙ্গবন্ধু তাঁর তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘আমি সুখী হয়েছি যে বাংলাদেশ জাতিসংঘে তার ন্যায্য আসন লাভ করেছে। যাঁরা বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তাঁদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন; সেই শহীদদের কথা জাতি আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।’

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন। ভাষণটি বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণ বাংলায় দিয়েছিলেন। বাংলায় ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি আগেই নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বাংলা বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার ফারুক চৌধুরীকে।

উল্লাসমুখর প্রতিনিধিদের তুমুল করতালির মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মঞ্চে উঠে আসেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, যিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’

ভাষণে বঙ্গবন্ধু প্রথমেই বলেন, ‘আজই এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালী জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালী জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালী জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সহিত শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবেন। ইহা বিশেষ আনন্দের ব্যাপার যে, স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন সক্রিয় যোদ্ধা সভাপতি থাকাকালেই বাংলাদেশকে এই পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া নেওয়া হইয়াছে।’

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘... আজিকার দিনে বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে তাহা লইয়া সংকটে পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করিবে আমরা সামগ্রিক ধ্বংস, ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা, বেকার ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব যে বিশ্বে মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের সময়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করিয়া তুলিবে এবং যে কারিগরিবিদ্যা ও সম্পদের পারস্পরিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে সুন্দর জীবন গড়িয়া তোলার অবস্থা সৃষ্টি করিবে। যে অর্থনৈতিক উত্তেজনা সম্প্রতি সমগ্র বিশ্বকে নাড়া দিয়াছে তাহা একটি ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তুলিয়া জরুরীভাবে মোকাবেলা করিতে হইবে।’

এরপর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে তখন চলমান ভয়াবহ বন্যাজনিত ও অন্যান্য কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশকে মারাত্মকভাবে আঘাত হানিয়াছে। যুদ্ধের ধ্বংসলীলার উপর সৃষ্ট বাংলাদেশ পর পর কতিপয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হইয়াছে। আমরা সর্বশেষ যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হইয়াছি তাহা হইতেছে এই বৎসরের নজিরবিহীন বন্যা। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে সাহায্য করার ব্যাপারে সক্রিয় উৎসাহ প্রদর্শন করায় আমরা জাতিসংঘ, তার বিভিন্ন সংস্থা ও মহাসচিবের কাছে কৃতজ্ঞ।’

মাতৃভাষায় বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার পর অধিবেশনে সমাগত পাঁচটি মহাদেশের প্রতিনিধি এবং সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুলপঠিত জাতিসংঘের ‘ডেলিগেট বুলেটিন’ বঙ্গবন্ধুকে ‘কিংবদন্তির নায়ক মুজিব’ বলে আখ্যায়িত করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কের প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া বুলেটিনে প্রকাশিত হয় এবং সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছিল, ‘এযাবৎ আমরা কিংবদন্তির নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শুনেছি। এখন আমরা তাঁকে কাজের মধ্যে দেখতে পাব।’ জাতিসংঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইম তাত্ক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত। বক্তৃতাটি ছিল সহজ, গঠনমূলক এবং অর্থবহ।’

এরপর ১৯৭৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইমের সঙ্গে আলোচনায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতিজনিত সমস্যা, সর্বনাশা বন্যার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার পরপরই জাতিসংঘ বাংলাদেশের ত্রাণকাজে ৭০ লাখ ডলার সহায়তা প্রদান করেছিল। পরে মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করেছিলেন এবং পাকিস্তানে আটক হওয়া বাঙালিদের বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন করতে সহায়তা করেছিলেন।

ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন, “কেউ কেউ বাংলাদেশকে ‘International basket case’  বলে উপহাস করেন। কিন্তু বাংলাদেশ basket case নয়। দুই শ বছর ধরে বাংলাদেশের সম্পদ লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদেই শ্রীবৃদ্ধি করা হয়েছে লন্ডন, ডান্ডি, ম্যানচেস্টার, করাচী, ইসলামাবাদের।...আজো বাংলাদেশে অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে। একদিন আমরা দেখাবো বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।” বঙ্গবন্ধুর সেই দিনের উক্তি আজ বাস্তব ও প্রমাণিত। বাংলাদেশ প্রমাণ করে দিয়েছে সে কখনোই basket case ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর সম্মানে নিউ ইয়র্ক সিটি হলে আয়োজিত এক সংবর্ধনাসভায় নিউ ইয়র্কের মেয়র বঙ্গবন্ধুকে নগরীর চাবি উপহার দেন এবং বলেন, ‘এই উপহার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জনগণের প্রতি আমেরিকার জনগণের শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের নিদর্শন।’ প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে যাঁরা আত্মদান করেছেন সেই সব শহীদের আর সাড়ে সাত কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে এই চাবি গ্রহণ করে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন।’

মানবজাতির সর্বোচ্চ পার্লামেন্ট জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্য পদ অর্জন ছিল বঙ্গবন্ধুর নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। বঙ্গবন্ধু আজ বিশ্বের নির্যাতিত-শোষিত মানুষের নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির আসনে অধিষ্ঠিত।

 

লেখক : অধ্যাপক, কমিটি অফিসার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা