kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

এই শহরে আমরা কি একটা বাসা পাব না?

দুজনই শ্রবণ ও বাক্ প্রতিবন্ধী। তবে মনের ভাষায় বলল অনেক কথা। এরপর কাছে এলো। বিয়ে করল। তবে সাদ্দাম-সুমি এখনো সংসার শুরু করতে পারেননি। কারণ তাঁদের বাসা নেই। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে লিখে সুমি জানিয়েছেন অনেক কথা

অনলাইন ডেস্ক   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৪:৪৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এই শহরে আমরা কি একটা বাসা পাব না?

ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, সংসারের ঘানি টানতে টানতে কাহিল দশা মায়ের। আমরা দুই বোনই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। ফলে অন্য যেকোনো মায়ের চেয়ে আমার মায়ের কষ্টটা ছিল বেশি। তা-ও তিনি হাল ছাড়েননি। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আমাদের পড়িয়েছেন। নিজে না খেয়ে খাইয়েছেন। তাই লেখাপড়া শেষে সরকারি চাকরি করব, সংসারের হাল ধরব—এটাই ছিল আমার স্বপ্ন। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে আমার চাকরি হলো। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে মিরপুরে শ্রবণ ও বাক্ প্রতিবন্ধীদের একটি স্কুল আছে। সেখানে আমি ইশারা ভাষা শেখাই।
 
অনেকেই প্রস্তাব দিয়েছিল
বিয়ে নিয়ে আগে তেমন ভাবিনি। আমরা তো সমাজে অচ্ছুত। আমাদের আবার ঘরসংসার? তবে চাকরি পাওয়ার পর এ চিত্র বদলাতে লাগল। অনেকে প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। মুশকিল হলো, তারা সবাই কথা বলতে পারে। আমি বলতে পারি না, শুনিও না। শুধু ইশারা বুঝি। ভাবলাম, তারা আমার মনের কথা বুঝবে না। সরকারি চাকরি পেয়েছি। তাই তারা এখন পাণিপ্রার্থী। কিন্তু আমি তো জীবন থেকে শিখেছি। অনেকেই আমাদের ভালো চোখে দেখে না। আর জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবতে পারা তো অনেক পরের কথা। চিন্তা করলাম, যারা বলতে পারে, শুনতে পারে তাদের সঙ্গে সংসার করা ভীষণ কঠিন হবে। হয়তো একসময় প্রতারণারও শিকার হব। তাই ওই সব প্রস্তাবে রাজি হইনি।

আপনি কি রাজি হবেন?
সাদ্দাম এখন স্বপ্ন আউটলেটে চাকরি করে। ও মহাখালীর পিএফডিএ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে পড়াশোনা করেছিল। আমিও সেখানকার ছাত্রী ছিলাম। তবে আগে কথাবার্তা হয়নি। সাদ্দামের কথা প্রথম জানলাম মার্চ মাসে। আমার এক সহপাঠীর মাধ্যমে। ওর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় মোবাইল ফোনে। সে বলেছিল, ‘আমি যদি বিয়ের প্রস্তাব দিই আপনি কি রাজি হবেন?’ লজ্জায় যেন কান লাল হয়ে গিয়েছিল আমার! বললাম, ‘আমার মাকে বলেন।’ যাহোক, আমার কাছ থেকে মায়ের ফোন নম্বর নিল। সে-ও তার মায়ের ফোন নম্বর দিল। পরে জানলাম দুই পক্ষের অভিভাবকের মধ্যে আলাপ চলছে।

সে-ও তো আমার মতোই
আমাকে প্রথম বিয়ের কথা জানিয়েছিল মা। শুনে নানা স্বপ্ন-কল্পনা খেলা করছিল মাথায়। এত দিন টিভিতে দেখেছি, পালকিতে চড়ে বধূ আসে। বর আসে পাগড়ি মাথায়। আমিও স্বপ্নে বিভোর হলাম। মন বলছিল, আমি তাকে বুঝব, সে-ও আমার কথা বুঝবে। জীবন হবে রঙিন।

আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম
৬ আগস্ট। দিনটি যেন আমার জীবনে অক্ষয় হয়ে থাকে। কুমিল্লায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে বিয়ে হলো। দেনমোহর চার লাখ টাকা। আমি লাল বেনারসি শাড়ি পরেছিলাম। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সাদ্দাম এসেছিল শেরোয়ানি পরে। ওকে দারুণ মানিয়েছিল।
 
মাকে মনে পড়ে
বিয়ের পর যখন গাড়িতে চড়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলাম, তখন চোখের জল আর ধরে রাখতে পারিনি। কেন জানি শুধুই কান্না পাচ্ছিল। মেয়েদের বুঝি এমনই হয়! বিয়ের পর প্রথম রাত যখন শ্বশুরবাড়ি ছিলাম, তখন কেমন লেগেছিল বলতে পারব না। অচেনা নতুন পরিবেশ। পরের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি, সব নতুন মুখ। মনে হলো, আপন বলে কেউ নেই! এর আগে মাকে ছেড়ে কোথাও কোনো দিন থাকিনি। মায়ের কথাই বারবার মনে পড়ছিল। মনে হলো, আহা, যদি মার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে পারতাম! তবে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ব্যবহার ভালো। সেখানে চার দিন ছিলাম।

বাসা কোথায় পাব?
এখন আমি মায়ের কাছে আছি। আর সাদ্দাম ওর আগের মেসে। আমার যা কিছু আছে তা দিয়ে সংসার রাঙাতে চাই। কিন্তু চিন্তায় পড়েছি বাসা নিয়ে। কোথায় থাকব? আমাদের কি কেউ বাসা ভাড়া দেবে? এরই মধ্যে মা কয়েকটি জায়গায় বাসা দেখেছেন। কিন্তু আমরা দুজনই এ রকম শুনে বাড়িওয়ালারা ‘না’ করে দিয়েছেন। আমি যেখানে চাকরি করি সেখানে কর্মকর্তাদের থাকার হোস্টেলও আছে। আমিও থাকার জন্য আবেদন করলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে আবেদন বিবেচনায় নিল না। তাহলে আমি সংসার সাজাব কোথায়? আমি যে মা হতে চাই। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা