kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

পাখির বাসা বেঁধে দেন জাহাঙ্গীর

অনলাইন ডেস্ক   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৪:৪২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পাখির বাসা বেঁধে দেন জাহাঙ্গীর

২০০৫ সালের মে মাসে জাহাঙ্গীর বাইক্কা বিলে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পাখির বাসা বসান। এ বছর বসিয়েছেন ২৫টি। দেখে এসেছেন বিশ্বজ্যোতি চৌধুরী

শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল মাছ ও পাখির অভয়াশ্রম। অন্য জলজ প্রাণীরও নিরাপদ আবাসস্থল। শীতে পরিযায়ী পাখির মেলা বসে। আর বর্ষায় ওড়ে ধবল বক। শরতে নীলাভ জলে ফোটে হাজারো পদ্ম-শাপলা। বাইক্কা বিলের কিছু প্রকৃতিপ্রেমী বন্ধুও আছেন। বিলে তাঁরা পাখির জন্য বাসাও বেঁধে দেন। সেই বাসায় পাখি ডিম দেয়। বাচ্চা ফোটায়। ডিমে তা দেওয়া মা পাখির সুরক্ষার ব্যবস্থাও করেন তাঁরা। মা পাখি নিশ্চিন্তে ছানা লালন-পালন করে। তারপর একদিন বড় হয়ে আকাশে ডানা মেলে। অনেক পাখি এখানে স্থায়ীভাবেও বাস করে।

পাখির বাসা
বিলের পূর্ব ও দক্ষিণ পারে আছে হিজল-করচের বন। আছে জারুল, বট, শিমুল, জামসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এসব গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাকা খুঁটির মাথায় রাখা হয়েছে কৃত্রিম পাখির বাসা। কিছু কৃত্রিম বাসা স্থাপন করা হয়েছে। কিছু বাসা আবার টাঙানো হয়েছে গাছের ডালে। এই বিলে পাখির বাসা প্রথম স্থাপন করেন মো. মাজহারুল ইসলাম জাহাঙ্গীর। এই বিলে তিনি বহু রাত কাটিয়েছেন। ২০০৫ সালের প্রথম বাসাটি ছিল পানির ফিল্টারের (সিমেন্টে গড়া) ওপরের অংশ দিয়ে তৈরি। তিনি ফ্রেন্ডস অব বাইক্কা বিল নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও গড়েছেন। এতে যুক্ত আছেন পাখি গবেষক ড. পল থম্পসন, ইনাম আল হক প্রমুখ। আরো আছেন বড় গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ। ফ্রেন্ডস অব বাইক্কা বিল এ বছর ২৫টি কাঠের বাক্সের বাসা হিজল-করচের বনে টাঙিয়েছে। ২১ ইঞ্চি বাই ১২ ইঞ্চি আয়তনের বাসাগুলো বিশেষ নকশায় তৈরি। এগুলোতে বাসা বেঁধেছে বালিহাঁস। এরই মধ্যে কিছু হাঁস ছানা নিয়ে নেমে পড়েছে বিলে। কোনো কোনো বাসায় এখনো ছানা আছে।

বালিহাঁসের জন্যই  


বাসাগুলো বালিহাঁসের বংশ বিস্তারের কথা ভেবেই তৈরি। এটি গৃহপালিত হাঁসের চেয়ে আকারে ছোট এবং উড়তে পারে। ফোটার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই ছানাগুলোকে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। দেরি হলে বেঁচে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাসাগুলো তাই বিশেষভাবেই তৈরি। তবে বালিহাঁসের জন্য তৈরি করা বাসায় অন্য পাখিও থাকে। যেমন—গো শালিক, জংলা ময়না, ফিঙে, ঘুঘু। বাচ্চাও ফুটিয়েছে অনেকে।

প্রাকৃতিকভাবে জলাভূমির আশপাশে পুরনো গাছগাছালির গর্ত বা কোটরে বালিহাঁস বাসা বাঁধে। পুরনো মঠ-মন্দির বা পরিত্যক্ত দালানকোঠার খোঁড়লও এগুলোর বেশ পছন্দ। আমাদের দেশে জলাভূমির পাশে পুরনো গাছগাছালি ও পরিত্যক্ত স্থাপনা এখন নেই বললেই চলে। প্রজনন মৌসুমে নিরাপদ পরিবেশ না পেয়ে এদের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে থাকে। এই প্রজাতির দেশি পাখি এখন শুধু আমাদের দেশের হাওরগুলোতেই দেখা যায়। তাই জাহাঙ্গীর ও তাঁর পাখিপ্রেমী বন্ধুদের এই উদ্যোগ। হাকালুকি হাওরেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু শিকারিদের উপদ্রবে সেটি সফল হয়নি।  বালিহাঁসের প্রজনন মৌসুম জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে অক্টোবর মাসেও এরা ডিম দেয়। এই চার মাস বাইক্কা বিলের কাঠের বাক্সের বাসাগুলোই হয়ে ওঠে এদের নিরাপদ আবাস। প্রতিবছর বিলে এভাবে কৃত্রিম বাসা তৈরি করে দেওয়া হয়। ২৮ দিন পর ডিম থেকে ছানা ফোটে। ডিম ফোটার দুই-তিন দিনের মধ্যে ছানাগুলো টুপ টুপ করে বিলের জলে লাফিয়ে পড়ে। মায়ের সঙ্গে বিলের পানিতে ভেসে বেড়ায়। শুরু হয় শিকারি পাখি থেকে আত্মরক্ষা, খাদ্য সংগ্রহ আর উড়তে শেখার তালিম নেওয়া।

জাহাঙ্গীর বললেন
২০০৬ সালে গাছের কোটরের মতো ১২টি কাঠের বাসা তৈরি করে বাইক্কা বিলের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছিল। কিন্তু সফল হতে পারিনি। পরের বছর চারটি বাক্সে বালিহাঁস বাসা বাঁধে। ২০০৮ সালে আবার কৃত্রিম বাসায় পাখিরা বাসা বাঁধেনি। ২০১১ সালে পল থম্পসনের কারিগরি পরামর্শে তিন মাপের ২১টি পানিনিরোধক পাখির বাসা হিজল-করচের বনে স্থাপন করা হয়। ওই বছর ১৪টিতে বালিহাঁস বাসা বাঁধে। ডিম দেয় ও বাচ্চা ফোটায়। এ বছর এখন পর্যন্ত ছয়টি বাসায় ৫০টির মতো ডিম পাওয়া গেছে। দুটি বাসা থেকে বাচ্চারা বিলের পানিতে নেমে গেছে। অন্যগুলো বাচ্চা ফোটার অপেক্ষায়। বাংলাদেশে একমাত্র বাইক্কা বিলেই কৃত্রিম বাসায় বালিহাঁসের প্রজনন সম্ভব হয়েছে। আমাদের বালিহাঁসের মতো প্রজননসংকটে এমন অনেক পাখি আছে বিশ্বে। বাইক্কা বিলের পাখির বাসার অনুকরণে তৈরি বাসায় ওই সব পাখিও হয়তো একদিন বাসা বাঁধবে। ডিম দেবে। বাচ্চা ফোটাবে।     

ছবি: লেখক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা