kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শেষ হবে কবে?

আবু তাহির মুস্তাকিম   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৯:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শেষ হবে কবে?

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব। এরই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ২০০১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এক ভাষণে সে সময়কার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে জানিয়ে দেন যে, ‘আমাদের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আল কায়েদাকে দিয়ে শুরু। কিন্তু তা এখানেই শেষ হবে না।’

এর জের ধরে আফগানিস্তানে এবং ইরাকে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। সে যুদ্ধ শেষ করার ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে, সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তবে প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০১ সালে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন তার পরিণতি কি হয়েছে সে প্রশ্ন অনেকেরই।

১৯ বছর আগে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হবার দিন থেকে হাজার হাজার মার্কিন নারী-পুরুষ সেনা কর্মকর্তা আফগানিস্তান, ইরাক, উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ এবং হর্ন অব আফ্রিকার সেনানিবাসগুলোতে অবস্থান নিয়েছে। পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে ড্রোনের মাধ্যমে আক্রমণ চালিয়ে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী নেতাদের হত্যা করা হচ্ছে; চলমান হুমকির অসংখ্য ঘটনা মোকাবেলায় দুনিয়াজুড়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী বাজেট আকাশছোঁয়া অনুপাতে বড় হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগের প্রধান নির্বাহী শাশা হ্যাভলিকলেক এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তার ওপর নজর রেখেছেন। তার মতে, বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ‘প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার মুহূর্তেই এ সংক্রান্ত বিতর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। বাস্তবে তার সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ আরো অনেক বেশি ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকে। এটা সবারই জানা যে, ওবামা প্রশাসনের অধীনে তারা আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল যে, এ ধরনের হামলা কমে আসছে। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহতভাবে বেড়েই চলছিল।’ এ বক্তব্যকে সমর্থন করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিযুক্ত ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের সন্ত্রাসবাদবিরোধী সমন্বয়ক রাষ্ট্রদূত নাথান সেলস। বুশ প্রশাসনের আমলে নেয়া সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ কি শেষ হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘না, এ যুদ্ধ বেশ ভালোভাবেই চলছে। আমরা শত্রুদের একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে লড়াই করছি।’ উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জানান যে, ইসলামিক স্টেট (আইএস) যেখানে ব্যাপক বিস্তৃত ছিল; সিরিয়ার সেই বাঘুজ থেকে এসব জিহাদিদের শেষ যোদ্ধাকে এবং তাদের খলিফা আবু বকর আল বাগদাদীকে নির্মূল করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, আইএস সংশ্লিষ্টরা এবং তাদের নেটওয়ার্ক বিশ্বজুড়ে এখনও বেশ সক্রিয়। 

যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর আক্রমণের পর এর ফলাফল সম্পর্কে ওয়াশিংটনে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা ছিল। সে সময় ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরুর ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশ জানিয়ে দেন যে, ‘হয় আপনি আমাদের সাথে নয়ত আমাদের বিরুদ্ধে।’ মাঝামাঝি কোনো জায়গা ছিল না। জোট ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বিশেষ কোনো অনুমতিও ছিল না। এ অনড় অবস্থানের কারণে ইরাকে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের চালানো অভিযানের ফলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররা শত্রুতে পরিণত হয়। আর এর ধারাবাহিকতা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলমান জিহাদি আন্দোলনের সূচনা করে। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্য ন্যাশনাল পত্রিকার সম্পাদক মিনা আল-ওরাবি। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরাক রাষ্ট্র ও ইরাকিদের অবমূল্যায়ন করেছে। ২০০৩ সালে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত হাজার হাজার তরুণকে বেকার করে দেয়। ভাবটা এ রকম যে, তারা যেন পুরোপুরিভাবে দেশের বাইরের কেউ। তারাই ইরাকে প্রথমে আল কায়েদার নিউক্লিয়াস ও পরে আইএসের নিউক্লিয়াস হয়ে উঠে।’

প্রেসিডেন্ট ওবামা পরে বদলে দিলেও ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’র অংশ হিসেবে যেসব ভুল নীতি নেয়া হয়েছে তার ফলাফল এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। শত শত সন্দেহভাজনকে বিনা বিচারে গুয়ান্তানামো কারাগারে আটকে রাখা, তাদের ওপর ‘অস্বাভাবিক নির্যাতন’ চালানো- সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের চোখ বেঁধে বিমানে করে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় থাকা সিআইএ’র ‘ব্লাক সাইট’গুলোতে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে তাদের দীর্ঘ ও ‘বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদ’র লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। ওয়াশিংটনের পশ্চিমা মিত্রসহ গুয়ান্তানামো বে কারাগারের সমালোচকদের ব্যাপারে বিরক্ত সমন্বয়ক নাথান সেলস। এসব মিত্ররা তাদের যেসব নাগরিকদের সিরিয়া এবং ইরাকের নির্জন শিবিরে আটকে রেখেছে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলেন তিনি।

পশ্চিমাদের নৈতিকভাবে খাটো করে দেখাতে তাদের সমালোচকরা এসব যুক্তি তুলে ধরে বলে মনে করেন সেলস। তিনি বলেন যে, ‘কোন পদ্ধতি কাজ করে আর কোন পদ্ধতি কাজ করে না সে বিষয়ে প্রচুর শিক্ষা হয়েছে এবং সে শিক্ষাকে আমাদের বর্তমান প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো হচ্ছে।’

‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ করতে গিয়ে মোট কত খরচ হয়েছে তার সঠিক হিসাব পাওয়াটা অসম্ভব। তবে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এর পরিমাণ এক দশমিক এক ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। এ অর্থের বেশিরভাগ খরচ হয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালনার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ড্রোন আক্রমন পরিচালনায়। সাধারণ মানুষকে চরমপন্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে এ অর্থের খুব সামান্য অংশই খরচ হয়েছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব র‌্যাডিকালাইজেশনের শিরাজ মাহের বিশ্বাস করেন, এ যুদ্ধ আজকের সমাজে অন্যান্য সমস্যা ছড়াতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, ‘যদি বৃহত্তর ইসলামিক স্টেট এবং সিরিয়া ও ইরাক বা এ ধরনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হয় তবে তা ইউরোপে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং তা মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক ধরনের সন্দেহ ও শত্রুতায় ইন্ধন যুগিয়েছে। তাই সিরিয়া পরিস্থিতির কারণে যে অভিবাসী ও শরনার্থী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তার ব্যাপারে ইউরোপবাসীর বিরোধী মনোভাব স্পষ্ট। এতে করে একটি ধারাবাহিক অবনতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তাই এটা বলা ভালো যে, অনেক দিক দিয়েই ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শেষ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

তাহলে আকারবিহীন, সুনির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধে এ অভিযান কি কোনোদিন শেষ হবে? এমন কি কোনো সময় আসবে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শেষ বলে ঘোষণা করা হবে? সে সম্ভাবনা কম। কারণ বিশেষজ্ঞরা বলেন যে, অপরাধ বা সন্ত্রাসকে কমিয়ে এনে শুধুমাত্র ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্তরে’ রাখা যায়। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীন চরম ডানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে নতুন নতুন হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে। আর এ হুমকি আগামী দিনগুলোতেও নতুন নতুন যুদ্ধে প্রাণশক্তি যোগাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মেইল: [email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা