kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দুর্যোগ, সামাজিক সংহতি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন

মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৩:০৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুর্যোগ, সামাজিক সংহতি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন

সারা বিশ্বে আজ চলছে মহাদুর্যোগ। থমকে গেছে এই জগত্। গতিশীল পৃথিবী আজ স্তব্ধ। COVID-19 ভাইরাসের পাদুর্ভাবে মানবজাতি আজ শঙ্কিত। মানবসৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ বা জাতিগত বিভেদ নয়। বরং মানবজাতির প্রতি এক নতুন ভাইরাসের আক্রমণ। আজ অতিক্ষুদ্র অণুজীব মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ করেছে। মানুষের জীবন-জীবিকা আজ হুমকির মুখে। অনাগত ভবিষ্যত্ আমাদের অজানা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়ে দুর্যোগ ও মহামারি নেমে আসে। সৃষ্টির শুরু থেকে বিভিন্ন বিপত্তিকে মোকাবেলা করেই টিকে আছে মানবসভ্যতা। মানব বিপর্যয়ের মুখে অনেক মানবহিতৈষী ও পক্ষ মানবতার হাত বাড়িয়ে আসছে। তখন বিপন্ন মানুষ খোঁজে পায় প্রাণশক্তি এবং আত্মোদ্দীপ্ততা। ঐতিহাসিক সত্যি হলো, মানুষ মানবিক বিপর্যয়কে সংঘবদ্ধ শক্তিতে মোকাবেলা করেছে। প্রতিষ্ঠা করেছে মানবতাবাদ। বিকাশ লাভ করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

যুদ্ধবিগ্রহ, মহামারি, দুর্ঘটনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিবিধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছামূলক সংগঠনের উদ্ভব। পাঠকের উদ্দেশ্যে আজকের নিবন্ধ স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংগঠনের বিকাশ সম্পর্কিত। স্বেচ্ছাসেবিতা (Voluntarism), স্বেচ্ছাসেবী (Volunteer) ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত (Voluntary) প্রভৃতি বিষয়ে আমাদের ধারণা সুস্পষ্ট নয়। স্বেচ্ছাসেবিতা বা Voluntarism হলো স্বেচ্ছামূলক কাজ। সময়ের প্রয়োজনে পারস্পরিক সহানুভূতি, মানবিকতাবোধ, সহমর্মিতা, ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও মানবপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে স্বেচ্ছামূলক কাজে ঝুঁকে পড়ে। ইংরেজি Voluntarism শব্দটি এসেছে লাতিন Voluntas থেকে। Voluntas অর্থ ইচ্ছা। এই লাতিন শব্দ থেকে স্বেচ্ছাসেবী (Volunteer) এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত (Voluntary) প্রভৃতি শব্দ এসেছে। মূলত স্বেচ্ছামূলক কাজ মুনফাহীন এবং অরাজনৈতিক চর্চা। এই কর্মের মূল দর্শন হলো মানবতাবাদ। যখন কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় কল্যাণধর্মী পরিচালিত সংগঠন হলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি হলো স্বেচ্ছাসেবক। 
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যাত্রা কখন? এ প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই অজানা। ‘হিলফুল ফুজুল’ বা শান্তি সংঘ নামে বিশ্বে প্রথম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির ১৫ বছর আগে অর্থাত্ ২৫ বছর বয়সে ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে কিছুসংখ্যক আরব যুবকের সমন্বয়ে এই সংঘ গড়ে ওঠে। মূলত জিলকদ মাস আরববাসীর জন্য অতি পবিত্র। সম্ভবত ৫৮৫ সালের এই মাসে ওকাজ মেলাকে কেন্দ্র করে কোরাইশ ও হাওয়াজিন গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ পাঁচ বছরব্যাপী স্থায়ী হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সমমনা যুবকদের অংশগ্রহণে মুহাম্মদ (সা.) ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংঘের অন্যতম লক্ষ্য ছিল—১. দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, ২. বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করা, ৩. অত্যাচারিতকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করা, ৪. দুর্বল, অসহায় ও এতিমদের সহায়তা প্রদান করা, ৫. বিদেশি বণিকদের জান ও মালের নিরাপত্তা প্রদান, ৬. সব ধরনের অন্যায় ও অবিচারের অবসান। এ সংঘের মাধ্যমে আরবসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তী সময়ে ষোড়শ শতাব্দীতে চার্চ ও গির্জাকেন্দ্রিক সমাজসেবা কার্যক্রমের সংস্কার সাধনে ফ্রান্স নাগরিক ফাদার ভিনসেন্ট ডি পল (Father Vincent De Paul) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই ক্যাথলিক ধর্মযাজক তিউনিশিয়ান জলদস্যুদের হাতে ধৃত হন। ক্রীতদাস হিসেবে বহুদিন অতিবাহিত করেন। ক্রীতদাস থাকাকালীন তিনি বন্দি ও তাদের পরিবার, এতিম, অবৈধ শিশু, অসুস্থ ও ক্ষুধার্তদের নিয়ে চিন্তিত হন এবং স্বেচ্ছামূলক সমাজকর্মে ব্রতী হন। তাঁর প্রচেষ্টায় বহুসংখ্যক হাসপাতাল, এতিমখানা ও দরিদ্রদের আশ্রয় নিবাস প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘Ladies of Charity’ নামে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। এ দলের সদস্যরা দরিদ্রদের গৃহ পরিদর্শন করে খাদ্য ও বস্ত্র ব্যক্তিগতভাবে বিতরণ করতেন। অভিজাত মহিলারা ছিলেন এই দলের সদস্য। একই বছর ফাদার ভিনসেন্ট অসুস্থ, বিকলঙ্গ ও অসহায়দের সেবাযত্নের উন্নত ব্যবস্থাকরণের লক্ষ্যে ‘Daughter of Charity’ নামে নতুন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন সমাজকর্মে উত্সাহী কৃষক পরিবারের যুবতিরা।
ব্রিটিশ-ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক হিতৈষী ব্যক্তি স্বেচ্ছামূলক সমাজকর্মে সম্পৃক্ত হন। রাজা রামমোহন রায় সমাজ সংস্কার ও ‘সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আইন-১৮২৯’ প্রবর্তন করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজ সংস্কার ও ‘হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন-১৮৫৬’ প্রবর্তন করেন। স্যার সৈয়দ আহামদ খান ভারতে মুসলিম সমাজ সংস্কারক ও ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটান। হাজী মুহম্মদ মুহসীন ‘মুহসীন ট্রাস্ট’ গঠন করেন। দরিদ্র ছাত্রদের বৃত্তি এবং বিপদাপন্ন মানুষদের সহায়তা করতেন। বেগম রোকেয়া নারীজাগরণ, বিধবা ও আশ্রয়হীন মানুষের সেবায় এগিয়ে আসতেন। তা ছাড়া নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, এ কে ফজলুল হক, স্বামী বিবেকানন্দসহ অনেকে স্বেচ্ছামূলক কাজে লিপ্ত ছিলেন। পাক-ভারত বিভাজন-পরবর্তী এ দেশে স্বেচ্ছামূলক কাজ প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনগত ভিত্তি অর্জন করে সরকারের জারিকৃত ‘স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-১৯৬১’-এর মাধ্যমে। এ অধ্যাদেশের আওতায় সারা দেশে নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সংখ্যা ৬৩ হাজার ২৩২টি। সারা দেশে এ সংগঠনগুলো স্বেচ্ছামূলক কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। 
যুগে যুগে ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও মানবতাবাদে উজ্জীবিত হয়ে মানুষ স্বেচ্ছামূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছে। ক্রমেই মানবতার চিত্র বদল হচ্ছে। মানুষ স্বেচ্ছায় স্বেচ্ছামূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করছে না। যেকোনো কল্যাণমূলক উদ্যোগের অন্তরালে মানুষ বৈষয়িক উদ্দেশ্য পোষণ করে। জনপ্রতিনিধিত্ব, সরকারের শুভদৃষ্টি, কোনো সংগঠনের লাভজনক পদ গ্রহণ বা অন্যান্য উদ্দেশ্যমূলক প্রয়োজনে মানুষ স্বেচ্ছামূলক সেবাকর্ম করছে। মানবতাবোধ, মানবাধিকার, কল্যাণমূলক দর্শনশক্তি ও ধর্মীয় অনুশাসনে মানুষ অনুপ্রাণিত হচ্ছে না। ধূর্ত মানুষের ছলনায় সমাজ, দেশ ও বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি আজ প্রশ্নবিদ্ধ। এ যেন সভ্যতার উল্টো যাত্রা।
‘কভিড-১৯’ বর্তমান বিশ্বের সর্ববৃহত্ মহামারি। সারা বিশ্বে এক কোটি ৮৫ লাখ (প্রায়) মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত এবং ছয় লাখ ৯২ হাজার (প্রায়) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত দুই লাখ ৪৪ হাজার (প্রায়) মানুষ আক্রান্ত এবং তিন হাজার ২৫০ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। এ ভাইরাস মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞ মহল পরামর্শ দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকারের পক্ষ থেকে বিরাজমান আর্থ-সামাজিক প্রভাব মোকাবেলার কৌশলে ব্রিফিং দিচ্ছে নিয়মিত। সরকারের উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই মহাদুর্যোগে অনেক জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়েছেন ত্রাণ আত্মসাতের দায়ে। সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ী মহল চিকিত্সাসহায়ক উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি করেছে। নকল চিকিত্সাসামগ্রী বিপণন করেছে। সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ লুট করার পরিকল্পনা করেছে। সাহেদ চরিত্রের উদ্ভব ঘটেছে এই মহামারির যুগেই। 
শত শত কল্যাণমূলক অঙ্গীকার নিয়ে দেশে অর্ধলাখের বেশি সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। বছরব্যপী বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে আমাদের বেঁচে থাকা। তা ছাড়া দেশে ক্রমেই মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সামাজিক বিপর্যয় ঘটছে। দুর্নীতি, মুদ্রাপাচার, মানবপাচার, ইভ টিজিং, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যাপক হারে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এ ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক সংগঠনগুলো কোনো সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে না।
মানবিক সহায়তা, সমাজিক উন্নয়ন ও সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠায় কল্যাণমুখী মানুষগুলো কেন পিছু হটছে। স্বেচ্ছামূলক সামাজিক সংগঠনগুলো আজ নিষ্ক্রিয় কেন? কারণ সমাজ আজ সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। নৈতিকতাবোধসম্পন্ন মানুষদের সামাজিক প্রভাব ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। মহত্ ব্যক্তি বা সংগঠনের যেকোনো কল্যাণধর্মী উদ্যোগে রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশ্লেষণ চলে। রাজনৈতিক দর্শন মতবাদের শিকার হচ্ছে দেশের মানবতাবাদী নিরপেক্ষ মানুষগুলো। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নিরপেক্ষতার মানদণ্ড নিরূপণ অতি কঠিন। সব ধরনের মানবহিতৈষী স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হবে সর্বমহল থেকে। সামাজিক সংগঠনগুলোকে টিকিয়ে রাখতেই হবে সমাজ ও দেশের স্বার্থে। তবেই সম্মিলিতভাবে যেকোনো মহামারি, দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠা করা যাবে সামাজিক সংহতি। 

 লেখক : সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বিভাগীয় কার্যালয়, চট্টগ্রাম।
[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা