kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

[ তোমায় সালাম ]

গণিতের হারুন স্যার

মো. সিরাজুল ইসলাম   

১৪ আগস্ট, ২০২০ ১৩:৫৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গণিতের হারুন স্যার

পঁচাত্তর বছর ধরে অধ্যাপক হারুনুর রশীদ গণিতের সঙ্গে আছেন। বাংলায় তিনি গণিতের বই লিখেছেন সেই পঞ্চাশের দশকে। তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই লেখা:

 

খুলনায় ১৯৩৪ সালে হারুনুর রশীদের জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে তাঁর বেড়ে ওঠা। খাবারের অভাবে অনেক লোককে মারা যেতে দেখেছেন। কাগজ ও কেরোসিনেরও অভাব ছিল খুব। পাতিলের কালি গুলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তালপাতায় লিখেছেন। রাতে পড়ার জন্য বরাদ্দ পেতেন এক পোয়া কেরোসিন।

 

প্রথম বই লেখা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকরাই তাঁকে গণিতে আগ্রহী করে তোলেন। যাদবচন্দ্রের পাটিগণিত, কে পি বসুর বীজগণিত ছিল সেই সময়ের জনপ্রিয় গণিত বই। তবে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সব বই-ই ছিল ইংরেজিতে। বই আনাতে হতো কলকাতা থেকে। খুলনা শহরের পল্লীমঙ্গল স্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন তিনি। বিএল কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন ১৯৫১ সালে। ১৯৫৩ সালে বিএসসি। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এমএসসি পাস করেন। ১৯৫৬ সালে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বিএল কলেজেই। সেবারই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চ মাধ্যমিকে পিওর ম্যাথ পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে। তাঁর এক বিশ্ববিদ্যালয় সহপাঠীর উৎসাহে বাংলায় উচ্চ মাধ্যমিকের গণিত বই লিখে ফেলেন। তারপর ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে কলকাতা থেকে বই আসা বন্ধ হয়ে যায়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার আলী পাবলিকেশন্সের কে আলী তাঁকে দিয়ে বই লেখান। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বইটি সাদরে গ্রহণ করেন। হারুনুর রশীদও শিক্ষকতার পাশাপাশি বই লেখার আনন্দে মেতে ওঠেন। একপর্যায়ে সম্মান শ্রেণির বইও লিখেছেন।

 

শিক্ষকতার দিনগুলো

‘তরুণ বয়স থেকেই শিক্ষকতায় প্রচুর সময় দিয়েছি, পরিশ্রম করেছি। ছুটির দিনেও অনার্সের ছেলেদের ডেকে ক্লাস নিয়ে কোর্স শেষ করে দিতাম। অনেক সময় এমন হয়েছে অসুস্থতার কারণে কলেজে যেতে পারিনি। ছেলেরা বাসায় এসেছে। ওভাবেই ওদের পড়িয়েছি। তাই আজও প্রতিষ্ঠিত সেসব ছাত্র যেখানেই থাকুক, আমি ডাকলে তারা ছুটে আসে। এখানেই আমার ভালো লাগা।’ বলছিলেন হারুন স্যার।

অধ্যক্ষ হয়ে কুষ্টিয়ার আমলা কলেজে যোগদান করেন ১৯৮৯ সালে। দুই মাস পরই অধ্যক্ষ হন খুলনা পাবলিক কলেজের। এরপর বিএল কলেজের গণিতের অধ্যাপক পদ থেকে ৩১ মার্চ ১৯৯১ সালে অবসর প্রস্তুতি ছুটিতে যান। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষকতা করেছেন। বলছিলেন, ‘বিএল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াকালে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীকে। তিনি ইংরেজি নাটক পড়াতেন। নাটক পড়ানোর সময় স্যার কণ্ঠস্বর বদল করে কখনো পুরুষ কণ্ঠে, কখনো নারী কণ্ঠে সংলাপ বলতেন। এত ভালো শিক্ষক, এত দরদ দিয়ে পড়ানো শিক্ষক আর পাইনি। জীবনের শেষ মুহূর্তেও নিজেকে মুনীর চৌধুরীর ছাত্র বলে গর্ব করব।’

 

গণিতকে মজার করে তোলা

গণিতের প্রতি ছেলে-মেয়েদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে দেখে অধ্যাপক হারুন দুঃখ পান। তাই গণিত অলিম্পিয়াডকে, বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে বিস্তৃত করতে তিনি আন্তরিক ভূমিকা রেখেছেন। গণিতকে জনপ্রিয় করতে তিনি ছোটদের উপযোগী বইও লিখেছেন। সেগুলোর নাম এমন— ‘গণিতের কুইজ ও গেমস’, ‘শূন্য আবিষ্কার ও দশমিক ভগ্নাংশ আবিষ্কারের ইতিহাস’, ‘বাংলার প্রাচীন গণিতের হারানো সম্পদ’, ‘গণিত বিজয় করলো যাঁরা’, ‘গণিত আকাশের দশ প্রমীলা’ ইত্যাদি। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ২০০৮ সালে গড়ে তুলেছেন গণিত ফোরাম। গণিত ফোরামের সাময়িকী ‘গণিতপত্র’। এরই মধ্যে এর ৯টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।

 

ছাত্র-শিক্ষক-পিতা

‘বিদ্যা অর্জনের কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই, পরিশ্রম করেই বড় হতে হয়—এই ধারণাটা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গেঁথে দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তুলতে হবে, তাদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ নিতে হবে, বড় ভাইয়ের মতো পাশে দাঁড়াতে হবে। তারা যদি জানে, আমি তাকে ভালোবাসি, তাহলে সে আমার কথা শুনবে, মানবে।’—বলছিলেন হারুন স্যার।

ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের যেকোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভেতর রাষ্ট্রবিরোধী কাজকর্ম হয় বলে সন্দেহ করত। এ অবস্থায়ও তিনি ‘খুলনা সাহিত্য পরিষদ’ নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন।

আজ এই ৮৭ বছর বয়সেও বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমল থেকে শিক্ষা কার্যক্রমের পর্যায়ক্রমিক বিবরণ তিনি দিতে পারেন। হারুন স্যার বলছিলেন, ‘৮০ বছর আগে যিনি আমার শিক্ষক ছিলেন, তাঁর কথা যেমন মনে আছে, তেমনি মনে আছে ৬০ বছর আগে আমার বিজ্ঞান ক্লাসের ছাত্রদের কথাও।’

তাঁর মেয়ে শামীমা আখতার (মোহাম্মদপুর সরকারি বয়েজ হাই স্কুলের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক) বলছিলেন, ‘বাবা সময়-শৃঙ্খলা মেনে চলা নীতিতে উজ্জীবিত এক আদর্শ শিক্ষক। আমাদের নানা রকম বই পড়তে আগ্রহী করেছেন। আমাদের পরিবারে জন্মদিনে বই উপহার দেওয়া রেওয়াজে পরিণত করেছেন। বাবাকে কেন্দ্র করে আমাদের পরিবারে একটি চমৎকার সাংস্কৃতিক আবহ গড়ে উঠেছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা