kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

প্লাজমা থেরাপির পরীক্ষামূলক ট্রায়াল সব জেলায় চালু হোক

ড. রবিউল হাসান ভুঁইয়া    

১৩ আগস্ট, ২০২০ ১৬:০২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্লাজমা থেরাপির পরীক্ষামূলক ট্রায়াল সব জেলায় চালু হোক

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিস্তারে গোটা বিশ্ব বিপর্যস্ত। এই ভাইরাস মোকাবেলায় টেস্টের মাধ্যমে শনাক্তকরণ, আলাদাকরণ ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিত্সা দিলেও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার খবর আসে এবং ১৮ মার্চ প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর কথা জানায় আইইডিসিআর।

প্রথম থেকেই ধারণা ছিল যে ভ্যাকসিন অথবা নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ আবিষ্কার সময়সাপেক্ষ। এর পরপরই বিভিন্ন দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর ওপর প্লাজমা থেরাপির সফল ট্রায়ালের খবর জানা যায়। 

ব্লাড-প্লাজমা (রক্তরস) বা পরোক্ষ এন্টিবডি থেরাপি হচ্ছে, একজন নিরাময় লাভকারীর শরীরে উৎপন্ন এন্টিবডি অন্য আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রবেশ করিয়ে ভাইরাসকে অকার্যকর করা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তির ব্লাড-প্লাজমা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে দারুণ ভূমিকা রাখে। প্লাজমা থেরাপি ১৮৯০ সালের পদ্ধতি। এই থেরাপি প্রয়োগে ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি, ২০০২-২০০৩ সালে সার্স ও ইবোলার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য পাওয়া গেছে। গত ২৭ মার্চ ও ৬ এপ্রিল চীনের পরীক্ষামূলক প্লাজমা থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সফলতার খবর নামকরা বিজ্ঞান সাময়িকীতে (JAMA I PNAS) প্রকাশিত হয়। এতে উন্নত বিশ্ব প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ নিয়ে আরো আশাবাদী হয়ে ওঠে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্লাজমা থেরাপির গড়পড়তা প্রয়োগ বন্ধ করতে বললেও এর পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে প্রয়োগে নিষেধ করেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে করোনা আক্রান্ত রোগীর ওপর প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ করে আসছে। আমেরিকাও পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হিসেবে তাদের ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদনে এক্সপানডেন্ট অ্যাক্সেস প্রগ্রামের আওতায় মায়ো ক্লিনিক্যালের মাধ্যমে দেশব্যাপী করোনা আক্রান্ত ১৬ হাজার রোগীর ওপর প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ করছে। তারা দেশব্যাপী পাঁচ হাজার রোগীর ওপর এই থেরাপি প্রয়োগ করার পর মায়ো ক্লিনিক্যালের প্রধান মাইকেল জয়নার বলেছেন, এই থেরাপি নিরাপদ এবং পরবর্তী ধাপে এর কার্যকারিতা দেখবেন। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও পরীক্ষামূলক ন্যাশনাল ট্রায়ালের অংশ হিসেবে বিভিন্ন শহরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করছে। শুধু ভারতের নাগপুরেই করোনা আক্রান্ত ৫০০ রোগীর ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের পরিকল্পনা করছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি আমাদের দেশেও প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগে রোগীর শারীরিক উন্নতির লক্ষণসহ সাফল্য পাওয়ার দাবি করছে বিভিন্ন হাসপাতাল। প্লাজমা থেরাপির সফলতা কিছুটা প্রতীয়মান হওয়ায় আক্রান্ত রোগীর ওপর এই থেরাপি প্রয়োগে মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন স্থানে প্লাজমার চাহিদা দেখে দারুণভাবে প্রতীয়মান হয়। 

এদিকে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় প্লাজমা সংগ্রহ ও সরবরাহের উদ্দেশ্যে নিরাময় লাভকারী থেকে প্লাজমা পেতে সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী অনলাইন প্ল্যাটফরম ‘সহযোদ্ধা’ প্লাজমা নেটওয়ার্ক উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহকারী সংগঠন বাঁধন, সবাই মিলে সবার ঢাকা, স্যাটেলাইট টিভি সাংবাদিকদের সংগঠন বিজেসিসহ আরো কিছু সংগঠন মিলে প্লাজমা সংগ্রহ ও সরবরাহের উদ্দেশ্যে প্লাজমা সাপোর্ট সেন্টার নামে কাজ শুরু করেছে।

যেহেতু আমাদের দেশে ভেনটিলেশনের স্বল্পতা আছে এবং বিভিন্ন জায়গায় এই থেরাপি প্রয়োগে সফলতাও শোনা যাচ্ছে, তাই পরীক্ষামূলক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতা দেশব্যাপী বিস্তৃত করে সব জেলা শহরে প্লাজমা ব্যাংক স্থাপন করা প্রয়োজন। যাতে চিকিত্সকের পরামর্শক্রমে করোনায় আক্রান্ত রোগীর জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করতে পারে। পাশাপাশি ব্লাড-প্লাজমা পেতে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাময় লাভকারীদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগও নেওয়া প্রয়োজন। 
 
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা