kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ । ১ অক্টোবর ২০২০। ১৩ সফর ১৪৪২

ভুল সবই ভুল

‘একটি গন্ধমের লাগিয়া ...’

গাউস রহমান পিয়াস   

১৩ আগস্ট, ২০২০ ১৪:৫৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘একটি গন্ধমের লাগিয়া ...’

সবাই সত্যি জানে, এমন অনেক কথা পরে যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলো মিথ্যা। কালের কণ্ঠ'র 'অবসর' সাময়িকীর বিশেষ রচনা..

 

ছদ্মবেশী শয়তানের ছলনায় ভুলে নবী আদম (আ.)-কে নিষিদ্ধ ফল গন্ধম খাওয়ায় প্রলুব্ধ করেন বিবি হাওয়া। গন্ধম ফলবিশেষ—এমনই বিশ্বাস আমাদের। গানও লেখা হয়েছে এ নিয়ে : একটি গন্ধমের লাগিয়া, আল্লায় বানাইল দুনিয়া...। কিন্তু মাওলানা রুমি যে লিখেছেন, জে খাকে মান আগার গন্দম বার আয়াদ, আজ-আ গার নান পাজি মাসতি ফেজায়ি আয়াদ! {আমার মৃত্তিকা (গোর) থেকে যদি গন্ধম ফলে, আর তুমি রুটি বানাও, মাদকতা (প্রেমের) বাড়বে খুব।} এখানে গন্ধম তো গম!

আমাদের বিশ্বাসে যেমন গন্ধম, তাবৎ দুনিয়ায় আছে আপেলের গল্প। কুইজ প্রতিযোগিতায় আজকাল প্রশ্ন হয়—অ্যাডাম, নিউটন ও স্টিভ জবসের মধ্যে মিল কোথায়? উত্তর : আপেল। আপেল স্থান করে নিয়েছে নানা উপকথা ও সাহিত্যেও! গ্রিসের পৌরাণিক কাহিনীতে আপেলের উল্লেখ দেখি। গ্রিক বীর হারকিউলিসের ‘বারোটি মহা শ্রম’-র একটি ছিল মৃত্যুপুরীর বাগান থেকে ‘জীবন গাছ’-এর একটি সোনালি আপেল নিয়ে আসা। ট্রয়ের যুদ্ধটিও ঘটেছিল একটিমাত্র আপেলের কারণেই! গ্রিক, রোমান, নর্স পুরান ও লোককাহিনীতে আপেলের নাম পাওয়া যায় অমরত্বের ফল হিসেবে। এই ফল দেবদেবীর ভক্ষ্য ছিল। মাঝেমধ্যে দেবতারা সন্তুষ্ট হয়ে মানুষকে আপেল খেতে দিতেন।

স্বর্গের ফলটির পরিচয় নিয়ে মতান্তর থাকলেও কোনোভাবেই সেটি যে আপেল ছিল না, এটুকু বিশ্বাস করেন গবেষকরা। বাইবেলে শুধু ফল বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফে গন্ধম বা আপেল—কোনো শব্দই ব্যবহৃত হয়নি। বরং   ‘শাজারাত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ বৃক্ষ। ১. ‘আমি বললাম, হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেথা ইচ্ছা আহার করো, কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না, হলে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩৫)

গলদের গোড়া তাহলে কোথায়? লাতিন ভাষায় প্রথম অনূদিত বাইবেল থেকেই সমস্যার শুরু। লাতিনে ‘ম্যালাম’ শব্দটি একই সঙ্গে ‘খারাপ’ ও ‘আপেলগাছ’ দুটিই বোঝায়; উচ্চারণে কিঞ্চিৎ হেরফের শুধু আছে। চতুর্থ শতাব্দীর শেষভাগে বাইবেলকে হিব্রু ও অ্যারামিক ভাষা থেকে অনুবাদ করেন সেন্ট জেরোম। জেরোমকে ৩৮২ খ্রিস্টীয় সালে দীক্ষা দিয়েছিলেন পোপ দামাসুস। অনুবাদে আদম-হাওয়ার নন্দনকানন তথা স্বর্গ থেকে বিতারণের প্রসঙ্গটিতে ‘ম্যালাম’ কথাটি স্বাভাবিকভাবেই আসে। হয়তো মন্দ ফলই বুঝিয়েছিলেন জেরোম। ‘ম্যালাম’ যেহেতু একই সঙ্গে আপেলগাছও বোঝায়, এই নামেই নিষিদ্ধ ফলটি পরিচিতি পেতে শুরু করে। আপেলের ইংরেজি নাম তো অঢ়ঢ়ষব, বৈজ্ঞানিক নাম গধষঁং ফড়সবংঃরপধ। অর্থাৎ এখানেও লাতিন শব্দ ‘ম্যালাম’-এর ছায়া!

প্রাচীন অনেক চিত্রকলায় অ্যাডাম, ইভ ও সাপের সঙ্গে যে ফলটি দেখা যায় তা আপেলই। বুঝতে অসুবিধা হয় না, প্রচলিত বিশ্বাসে প্রভাবিত হয়েই শিল্পীরা এমন ছবি আঁকতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। লোকবিশ্বাসে ফলটি আঙুর, ডুমুর হিসেবেও পাওয়া যায়। আর গন্ধম?

দ্বিতীয় শতাব্দীর ইহুদি ধর্মগুরু জুদাহ বেন ইলাই মনে করেছিলেন, নিষিদ্ধ ফলটি ছিল আসলে গন্ধম তথা গম। হিব্রু ভাষায়ও গমের প্রতিশব্দ হলো ‘খিতাহ’, যার একটি অর্থ হচ্ছে ‘পাপ’। তবে জুদাহ ফলটিকে গন্ধম হিসেবে চিহ্নিত করার যুক্তি হিসেবে বলেছিলেন, একটি শিশু তার মা ও বাবাকে জন্মের পর চিনতে পারে না, যতক্ষণ না সে গ্রেইন তথা দানার স্বাদ লাভ করে। তাহলে শেষ কথা হলো এই : আদম শয়তানের প্ররোচনায় যে ফলটি খেয়েছিলেন, তার নাম কোরআন কিংবা বাইবেলে নেই। ‘গন্ধম’ বা ‘আপেল’ নয়,  আমরা বড়জোর নিষিদ্ধ ফল বলতে পারি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা