kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ । ১ অক্টোবর ২০২০। ১৩ সফর ১৪৪২

করোনায় কৃষিতে করণীয়

ড. এম. আফজাল হোসেন   

১২ আগস্ট, ২০২০ ১৪:০১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনায় কৃষিতে করণীয়

জাতিসংঘের মহাসচিব বর্তমান করোনা পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সংঘটিত সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ও মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পৃথিবীর প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচার আশায় স্বপ্রণোদিত গৃহবন্দিত্বের জীবন বেছে নিয়েছে। এমন বিপর্যয় উত্তরাধুনিক সভ্যতার প্রত্যেক মানুষের কাছে ছিল অকল্পনীয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মধ্যচীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। 
 
করোনাভাইরাস (কভিড-১৯)-এর সংক্রমণ বাংলাদেশে এসে পৌঁছায় মার্চ মাসের প্রথমার্থে। ধীরে ধীরে করোনা বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মহামারি আকার ধারণ করে। বাংলাদেশেও জ্যামিতিক হারে আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মানুষের মধ্যে কাজ করছে এক অজানা শত্রুর আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব। সংগত কারণেই করোনাভাইরাস এবং এর সংক্রমণরোধে গৃহীত ব্যবস্থার কারণে বিশাল প্রভাব পড়েছে কৃষি এবং কৃষি ব্যবস্থাপনার ওপর। করোনার সংক্রমণের প্রভাবে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক প্রভাব যে দীর্ঘমেয়াদি হবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এই পরিস্থিতিতে কৃষির উত্পাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
 
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এখনো বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৭৫ ভাগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকানির্বাহের প্রধান উৎস হচ্ছে কৃষি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষির উৎপাদন, উন্নয়ন ও সফল বিপণনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কৃষিতে সবুজ বিপ্লব ঘটানোর মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। 
 
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মনে রাখতে হবে, কৃষি আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এখন সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থবিরতা এসে গেছে। দুর্ভিক্ষও দেখা দিতে পারে। এই দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নিজের দেশকেও যেমন বাঁচাতে হবে, পাশাপাশি অন্যান্য দেশকেও সাহায্য করতে হবে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ সাহায্য চেয়েছে এবং আমরা তাদের জন্য খাদ্যশস্যও পাঠিয়েছি। সে জন্য এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে।’
 
প্রধানমন্ত্রীর উল্লিখিত বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করোনাভাইরাসজনিত কারণে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কৃষি উত্পাদন অব্যাহত রাখতে এবং অনাবাদি জমি চাষাবাদের উপযোগী করে উত্পাদন আরো বৃদ্ধি করতে হবে এবং দেশে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষি উত্পাদন অব্যাহত এবং বৃদ্ধি করতে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, বাজারজাতকরণ ও বিপণনে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এরই মধ্যে বোরো ধান কাটার শ্রমিক সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হাওর অঞ্চলের ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন ১৮০টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে আগাম বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগেই খুবই অল্প সময়ের মধ্যে হাওরের কৃষকরা সময়মতো সুষ্ঠুভাবে ধান ঘরে তুলতে পেরেছে। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে একদিকে কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসল যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে ধান ঘরে তুলতে পেরেছে, অন্যদিকে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রভাব এড়াতে বর্তমান সরকার কৃষকদের প্রণোদনা প্রদানসহ সার, বীজ, কীটনাশক প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। 
 
করোনা পরিস্থিতি এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে টেকসই খাদ্য উত্পাদন নিশ্চিতকরণে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। পরিবর্তিত পরিবেশে কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বারোপ করতে হবে। 
 
01. কৃষকের মাঝে সহজ শর্তে ঋণ অথবা বিনা মূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক এবং জমি চাষের, ফসল কাটার ও ফসল মাড়াই কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণ এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা।
 
02. সেচের অভাবে যাতে কোনো জমির ফসল নষ্ট না হয় সে জন্য সেচসুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 
 
03. দেশের সব পতিত জমি কৃষিযোগ্য জমিতে পরিণত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 
 
04. জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ এক জমিতে চার ফসল উত্পাদন, দানাদার বিভিন্ন ফসল ছাড়াও ফলমূল, বাদাম, ডাল ও তেলজাতীয় শস্য, সবজি চাষ, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন ও মাছ চাষে কৃষকদের আগ্রহী করে তোলা। 
 
05. নগর কৃষি ও ছাদ বাগানে ফল ও সবজি চাষের জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে বাগান পরিকল্পনা ও সৃজন করা প্রয়োজন। 
 
06. বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের আগাম তথ্য প্রদানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
 
07. কৃষিকাজে ব্যবহূত কৃষি উপকরণের দাম বাজারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা। কারণ উচ্চমূল্যে কৃষি উপকরণ কিনলে কৃষকের উত্পাদন খরচ বেড়ে যায়। সে ক্ষেত্রে কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে যাবে।
 
08. কৃষকের উৎপাদিত ফসল যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে উত্পাদিত ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
 
09. কৃষককে কৃষিকাজে খাদ্যশস্য উত্পাদনে উৎসাহিত করার ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে হলে তাকে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সরকারিভাবে বেশির ভাগ ফসল ক্রয়, গুদামজাত ও বিক্রির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তা ছাড়া অনলাইন পোর্টাল করে অথবা ফেসবুক গ্রুপ করে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। 
 
যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং স্থিতিশীলতা সংরক্ষণে কৃষির ভূমিকা অনস্বীকার্য, সেহেতু দেশের করোনা সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে কৃষির টেকসই উন্নয়নের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলেই টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্ভব। এ জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি, গোষ্ঠী, বেসরকারি খাত এবং উন্নয়নশীল প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। করোনা সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিপণন ব্যবস্থাপনা যথাযথ চালু রাখতে হবে। 
 
কৃষকের কষ্টার্জিত উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। 
বাংলাদেশের কৃষিতে ধারাবাহিক ভালো ফলনের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত খাদ্য সংকটের সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। করোনার এই পরিস্থিতিতে সেই ধারাবাহিকতা যে বিঘ্নিত হবে না তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তাই উত্পাদনের ধারা অব্যাহত রাখা এবং কৃষকদের স্বনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে সামাজিকভাবে ঐক্য ও দায়িত্ব নিতে হবে। কৃষির উন্নয়নে এবং দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এ দেশের যোগ্য কৃষিবিদরা যথেষ্ট অবদান রেখেছেন এবং রাখছেন। আধুনিক বিশ্বের বিশাল বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির ভিত্তিতে কৃষিবিদরা কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের লক্ষ্যে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছেন। আধুনিক বিশ্বে স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচারের মাধ্যমে কৃষির উন্নয়নে ন্যানো টেকনোলজির ব্যবহার অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ন্যানো প্রযুক্তি থেকে তৈরীকৃত সার ফসল উত্পাদনের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করতে পারে। দেশের তরুণ প্রজন্মকে কৃষির এই আধুনিকায়নের মাধ্যমেই কৃষি পেশাকে আরো আকৃষ্ট করতে হবে। এ সময়ে কৃষিকাজে কৃষকের মনোবল সুদৃঢ় রাখার লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাসহ কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কৃষিবিদদের সার্বক্ষণিক মনিটরিংসহ সার্বিক সহায়তা প্রদান করা খুবই জরুরি। যেভাবেই হোক করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই আমাদের ফসল উৎপাদনের স্বাভাবিক ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। 
 
লেখক : ইমেরিটাস প্রফেসর ও উপদেষ্টা, পুন্ড্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া, সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর (ভারপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ, সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা