kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ

'সুন্দর আগামীর জন্য: সর্বশেষ কভিড পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও সংলাপ'

অনলাইন ডেস্ক   

১১ আগস্ট, ২০২০ ২৩:৫৫ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ

ওয়েবিনারের অতিথি ও প্যানেলবিদরা (বাম থেকে ডানে) শীর্ষ সারিতে: মডারেটর প্রফেসর ড. হাসান মাহমুদ রেজা, বিশেষ অতিথি এম এ কাশেম, প্রধান অতিথি মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং অধিবেশন সভাপতি অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম। মধ্যম সারি: ড. এম শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক ড. সানিয়া তাহমিনা, এবং অধ্যাপক ড. আহমেদ হোসেন। নিচের সারিতে: ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন ও মি. সুভাস সিংহ

বর্তমানে বিশ্ব কভিড-১৯ মহামারির মতো একটি অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরে ১৫৬ দিন কেটে গেছে, এবং এই সময়ে আমাদের শিক্ষা, বাণিজ্য এবং সর্বোপরি সাধারণ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজমান রয়েছে। প্রত্যেকেই বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের মুখাপেক্ষী হয়ে আছেন যারা নিরাময়ের সন্ধানে রয়েছেন, তবে বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ এসব গবেষণা এবং এর ফলাফলের ইতিবাচক সংবাদ সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না। 

এই পরিস্থিতিতে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউট 'সুন্দর আগামীর জন্য: সর্বশেষ কভিড পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও সংলাপ' শীর্ষক একটি তথ্যবহুল ওয়েবিনার এর আয়োজন করে আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট)। ওয়েবিনার এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন দেশের বিশিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্বাস্থ্য গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা। প্যানেল সদস্যরা কভিড পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার গুরুত্বের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা এবং সুযোগগুলি নিয়ে কথা বলেন। মানসিক স্বাস্থ্য, মাতৃ এবং শিশু স্বাস্থ্যের ওপর কভিড-১৯ এর প্রভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা বিধানের ক্ষেত্রে সমতার মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তবে উপেক্ষিত বিষয়গুলি নিয়েও তারা আলোচনা করেন।

প্যানেল আলোচকদের পাশাপাশি, ওয়েবিনার অধিবেশনটির প্রধান অতিথি হিসাবে ছিলেন সম্মানিত শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী; বিশেষ অতিথি হিসাবে ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অফ ট্রাস্টির সম্মানিত চেয়ারম্যান, এম এ কাশেম এবং অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম।

ওয়েবিনারটির সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ হেলথ অ্যান্ড লাইফ সাইন্সের ডীন অধ্যাপক ড. হাসান মাহমুদ রেজা। বিশেষ অতিথি এম এ কাশেম তার বক্তব্যে তিনি কভিড পরবর্তী সময়ে 'নতুন স্বাভাবিকের' সঙ্গে খাপ খাইয়ের গুরুত্ব চিহ্নিত করেন এবং সময়োপযোগী ওয়েবিনারের ব্যবস্থা করার জন্য আয়োজকদের মূল্যবান বক্তব্যের জন্য প্যানেল সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।

তিনি লকডাউন পরিস্থিতি চলাকালীন সময়ে শিক্ষাব্যবস্থায় অনলাইন ক্লাসের গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এটি সম্ভব করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তির প্রচারে নিরলস প্রচেষ্টার জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানান। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করে তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। মি. এম এ কাশেম নীতিনির্ধারকদের বিগত কয়েক মাসের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে অনুরোধ করেন যা দেশকে বড় ক্ষতির সম্মুখীন করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন যে সমন্বয়ের অভাব, অব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক দুর্নীতির লড়াই করে একটি সুন্দর আগামী নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন যে মহামারিজনিত কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে তিনি আশাবাদী যে মানব জাতি এই মহামারির সঙ্গে লড়াই করে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিয়ে আসতে পারে।

প্রধান অতিথি মহিবুল হাসান চৌধুরী তার বক্তব্যে ঝুঁকি নির্ধারণের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সকল জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে নীতি নির্ধারকদের সহযোগিতার আহবান জানান যাতে করে সকল নাগরিককে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়। তিনি বিদ্যালয়গুলি পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় জাতীয় প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধাপের শিক্ষাব্যবস্থার কথা বিবেচনার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি শিক্ষা খাতে কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার বিস্তারিত বর্ণনাও করেন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা, বাংলাদেশে কভিড মহামারিটি প্রথম ধাপ থেকে আমরা যে শিক্ষা পেয়েছি তা নিয়ে কথা বলেন। তিনি ভাইরাসটির উৎপত্তি ও এর অধিকারে সংক্রমণের পেছনের কারণগুলো  নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে কিভাবে সংক্রমণকে কমানোর উপায়গুলো নিয়েও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশ, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনস-এর সদস্য দেশ হওয়ায় এটি ঠিক সময়ে কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিনের সুবিধা ভোগ করবে।

তিনি সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখা হলে এবং পরীক্ষা এবং আইসোলেশনের হার কমে গেলে করেন তবে মহামারির দ্বিতীয় ধাপের পুনরুত্থান হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি ভবিষ্যতে নতুন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার জন্য টেস্টিং সেন্টারগুলি কার্যকরী রাখার গুরুত্ব সম্পর্কেও কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথিবী ও পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক এবং প্রো-উপাচার্য ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল পর্যানুক্রমিক বিপর্যয় এবং মানব্জীবনে তাদের প্রভাব সম্পর্কে কথা বলেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, মহামারি পরিস্থিতি চলাকালীন আমরা কীভাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের (ঘূর্ণিঝড়, বন্যার) মুখোমুখি হয়েছি এবং কীভাবে এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে প্রকাশ করেছে। তিনি বর্ণনা করেন যে কীভাবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলি মহামারির ওপর প্রভাব ফেলেছে। তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরর মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্বকেও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আমাদের দেশে আরো একটি পর্যানুক্রমিক বিপর্যয় এড়াতে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের জন্য একটি পৃথক স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি প্রণয়নের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন। 

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. আহমেদ হোসেন কভিড মহামারি চলাকালীন সময়ে স্কুলগুলি পুনরায় খোলার বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি স্কুল খোলার গুরুত্ব এবং বিদ্যালয়গুলি বন্ধ থাকার কারণে  শিশুদের কী কী সমস্যা হতে পারে তা নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য স্কুল / অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত তাও তিনি আলোচনা করেন।

আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ও প্রাক্তন চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে বাংলাদেশের মহামারী সংক্রান্ত পরিস্থিতির তুলনামূলক বিচার করেন। এছাড়াও তিনি একটি নিরাপদ, কার্যক্ষম এবং সুলভ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলেছেন। ডা. হোসেন স্কুল খুলে দেওয়ার পর ক্লাসে অংশ নেওয়া বাচ্চাদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা সম্পর্কেও কথা বলেছেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি এবং জাতীয় কভিড রেসপন্স টীমের চেয়ারম্যান ডা. এম শহীদুল্লাহ, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে কভিড মহামারির প্রভাব সম্পর্কে কথা বলেছেন। কভিড পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিবর্তন হয়েছে এবং কীভাবে জাতীয় বিশেষজ্ঞ দল মহামারি মোকাবেলার ক্ষেত্রে ভুল ও চ্যালেঞ্জ থেকে শিখেছে তাও তিনি বর্ণনা করেন। তিনি অবশেষে এই পরিস্থিতি থেকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে শুরু করে, জনশক্তি, এমআইএস এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নতুন করে সাজানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

সমাপনী বক্তব্যে অধিবেশন চেয়ারম্যান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম উল্লেখ করেন যে, মহামারি মোকাবেলায় সরকারের প্রতিটি সেক্টর দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। তিনি আমাদের ভুল থেকে শেখার গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলেছেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, এই মহামারি দীর্ঘকাল স্থায়ী হবে না কিন্তু এর মাধ্যমের প্রাপ্ত শিক্ষা আমাদের কাছে থাকবে যা আমাদের আরো ভালো ভবিষ্যত এনে দেবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে নীতি নির্ধারকরা এই ওয়েবিনারের আলোচনা থেকে উপকৃত হবেন। অবশেষে তিনি আয়োজকদের তাদের প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি প্যানেল সদস্যদের অন্তর্দৃষ্টি এবং জ্ঞানগর্ভ আলোচনার জন্যও ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

ওয়েবিনারটি জুম প্লাটফর্ম থেকে প্রচার করা হয়েছিল এবং মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা