kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

রেলে চেপেই গোটা ইউরোপ ভ্রমণ সম্ভব যেভাবে

অনলাইন ডেস্ক   

৫ আগস্ট, ২০২০ ১৪:১৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রেলে চেপেই গোটা ইউরোপ ভ্রমণ সম্ভব যেভাবে

স্রেফ ট্রেনে চেপে ইউরোপ ভ্রমণের বিষয়টি অসম্ভব মনে হতে পারে। তবে পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর। এটা অসম্ভব মনে হলেও লারা প্রেন্ডারগাস্টের গল্পটা পড়লে বুঝবেন, এটা অনায়াসে সম্ভব। এখানে তার অভিজ্ঞতার বয়ান তুলে ধরা হলো। লারার এই অভিজ্ঞতা যেকোনো ভ্রমণপিয়াসীর জন্যে ভালো পরামর্শ হয়ে উঠতে পারে। লারা আর তার স্বামী লন্ডনে থাকেন। সেখান থেকেই শুরু করলেন। তাদের পথ ধরেই এক অবিশ্বাস্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে ভ্রমণপিয়াসীরা।

লারা লিখেছেন, ডিসেম্বরে (গত বছর) বিয়ের পর পরই আমি এবং আমার স্বামী একটা বিমানে চেপে আমেরিকা কিংবা নিউ জিল্যান্ডে যাবো বলে পরিকল্পনা করলাম। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস আগে জানলাম যে, আমি অন্তঃসত্ত্বা। তাই বলে ঘোরার চিন্তা বাদ যায়নি। তবে এ অবস্থায় দীর্ঘ বিমানযাত্রা পেরেশানিদায়ক হতে পারে। এ কারণে আরামের সাথে বেশি ভ্রমণ কীভাবে করা যায় কিভাবে তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছিল। এরই মধ্যে এলো কভিড-১৯। এর ফলে বিমানযাত্রা নানা কারণে অসম্ভব হয়ে পড়ল। 

রেলে ভ্রমণের কথা মাথায় এলো। অনেক সচেতন যাত্রী এমন পরিস্থিতিতে যতটা পারা যায় নিরাপদ যাত্রার কথাই ভাবলেন। তাছাড়া লকডাউন পরিস্থিতির পর তাদের কাছে বিমানের চেয়ে রেল অনেক বেশি নিরাপদ মনে হলো। ইন্টাররেল পাস থাকলে আপনি বিভিন্ন ইউরোপীয় শহরের মধ্য দিয়ে যেতে পারবেন। তবে কতটা দীর্ঘ ভ্রমণ করবেন তার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পাস রয়েছে। 

তবে স্টেশনে উদয় হওয়ার আগে টিকিটের ব্যবস্থা করে নেয়া দরকার। নিজের আসনটা নিশ্চিত না করে রেলে ওঠা ঝক্কির বিষয়ে হতে পারে। এছাড়া কোনো শহরে গিয়ে এদিকে সেদিকে ঘোরাঘুরির জন্যেও সময় দরকার। তাই আলাদাভাবে টিকিট করে নেয়া ভালো। ইউরোপে যারা ভ্রমণ করবেন তাদের জন্য রেল ভ্রমণের জন্যে উপকারী একটি ওয়েবসাইট হতে পারে 'দ্য ম্যান ইন সিট ৬১'। মার্ক স্মিথের পরিচালিত এই সাইটে বিভিন্ন ধরনের ট্রেন, কোন ট্রেনের খাবার কেমন, কোন সিটগুলোতে বসলে বাইরের দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যাবে ইত্যাদি নানা তথ্য মিলবে। 

ভ্রমণের কাজটা সেরেছিলাম আমরা। প্রতিটি শহরে এক থেকে তিন রাত থেকেছি। ভ্রমণের সময় কিছু সময় উত্তেজনায় অন্তরাত্মা কেঁপে গেছে। আবার কিছু সময় দারুণ আরামদায়ক ছিল। যেকোনো স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার আধাঘণ্টা আগে উপস্থিত হওয়াটা সুবিধাজনক হবে। কিছু শহরে সীমান্তে চেকপয়েন্ট রয়েছে। এবার এখানে বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ সম্পর্কে বলা যাক। 

লন্ডনের সেন্ট প্যানক্রাস থেকে আমস্টারডাম সেন্ট্রাল 
ভ্রমণের সময়: ৪.৫ ঘণ্টা 

Amsterdam City Scene
আমরা যে দিনটাতে সেন্ট প্যাকক্রাসকে বিদায় জানালাম, ওই দিনটা ছিল ঠাণ্ডা। ওপরে ছিল নীলাকাশ। আমস্টারডামে পৌঁছানোর পর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে দিনটা একটু ঘোলটে মনে হলো। কিন্তু শহরের খালগুলোতে বাড়িঘরগুলো ক্রিসমাস ট্রি'র মতো ভেসে রয়েছে। কেইজার্সগ্রাৎ এলাকার '৯-স্ট্রিটস' এর কেন্দ্রে দ্য ডাইলান হোটেলে আমরা দুই রাত থাকলাম। আঠারো শতকের দিকে তৈরি একটি পাম্পিং স্টেশনের কাছেই এটি অবস্থিত। পরদিন রিজকসমিউজিয়ামে ভ্রমণ দারুণ বিষয় ছিল। খাবারগুলো অসাধারণ। 

আমস্টারডাম সেন্ট্রাল থেকে বার্লিন এইচবিএফ 
ভ্রমণের সময়: ৮.৫ ঘণ্টা 


বেশ ভালো সময় কাটাতে হবে ট্রেনে। কাজেই ভ্রমণটাকে পিকনিকের আমেজে নিয়ে আসলাম। আমরা পনির, রুটি, ডিম সেদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে উঠে পড়লাম ট্রেনে। কেবিনে আরেকজন জার্মান যাত্রী ছিলেন। তিনিও খাবার-দাবার নিয়েই উঠেছেন। রাতের খাবারের সময় হয়ে গেলো যখন পৌঁছলাম ওরানিয়া হোটেলে। এটা ক্রাউজবার্গ ডিস্ট্রিক্টে। এই ভবনটা স্থাপত্যশৈলীর একটা ল্যান্ডমার্ক। এখন নানা ধরনের কনসার্ট, সিনেমা প্রদর্শনী এবং সাহিত্যিক আয়োজন হয়ে থাকে এই ভবনে। বার্লিনে আমাদের একজন আত্মীয় ছিলেন। তিনি টপোগ্রাফি অব টেরর মিউজিয়াম ঘুরে আসার পরামর্শ দিলেন। এই জাদুঘর বার্লিন প্রাচীরের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা দেয়ালের অংশের পরই অবস্থিত এবং চেকপয়েন্ট চার্লির নিকটেই। কাছেই রয়েছে ক্রিসমাস মার্কেট। আশপাশেই খাওয়ার অনেক জায়গা রয়েছে। 

বার্লিন এইচপিএফ থেকে প্রাগের হাভনি 
ভ্রমণের সময়: ৪ ঘণ্টা 


এ শহরে ট্রেন আমাদের এলবে নদীর কিনারা ঘেঁষে নিয়ে গেলো। দৃষ্টিনন্দন রুট। এই রেলের খাবারের ক্যারিয়েজটার প্রেমে পড়ে যাবেন। নীল আর স্বর্ণালী কারুকাজে ঠাসা বাসনপত্র। কি কারণে যেন প্রাগ আমাদের আশা পূরণ করতে পারল না। শহরে লোকজনে ঠাসা। হবে শান্ত পরিবেশে সময় কাটানোরও জায়গা রয়েছে। তবে এর জন্য চার্লস ব্রিজ এবং অন্যান্য ব্রিজের মতো মূল পর্যটন স্পটগুলো এড়িয়ে যেতে হবে। প্রাগে আমরা ঘাঁড়ি গাড়লাম মান্দারিন অরিয়েন্টালে। এটা একটা প্রাচীন সন্ন্যাসী আশ্রমে অবস্থিত। খাবার সম্পর্কে বিশেষভাবে বলার কিছু নেই। তবে ভালোমতেই খেয়ে সময় কাটানো গেছে। তবে ১৯১১ সাল থেকে চালু মাইস্যাক নামের একটা ক্যাফের গরুর স্টেক আর পায়ার সুরুয়ার কথা না বললেই নয়। 

প্রাগের হাভনি থেকে ভিয়েনার হাপ্তবাহ্‌নহফ 
ভ্রমণের সময়: ৪.৫ ঘণ্টা 


প্রাগের চেয়ে অনেক বেশি সভ্য মনে হয়েছে ভিয়েনাকে। হোটেল ব্রিস্টলে দুই রাত থেকেছি আমরা। এটা অপেরা হাউজের পাশেই। এর স্থাপত্যকলায় একটা প্রাচীন ও স্বর্গীয় ভাব রয়েছে। অপেরায় সন্ধ্যাটা কাটানোর জন্য টিকিট অগ্রিম কেটে রাখা হয়েছিল। অপেরার পর ক্যাফে মোজার্টে খাওয়ার কাজ সেরে নিলাম। ধনসম্পদে ঠাসা দুই জাদুঘরে সময় কাটানো যেতে পারে। 

ভিয়েনার হাপ্তবাহ‌্নহফ থেকে ভিযেনার সান্তা লুসিয়া 
ভ্রমণের সময়: ৯ ঘণ্টা 


এটা ছিলো সবচেয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ। দক্ষিণ অস্ট্রিয়ার বরফে আচ্ছাদিত পাহাড় দিয়ে রেলযাত্রা। একবার ইতালিতে পৌঁছানোর পর পুরো বগি খালি হয়ে গেলো। পরের কয়েক ঘণ্টার ভ্রমণে আমরা দুজনই ছিলাম। আমরা তিন দিন কাটিয়েছি ভেনিসে। এর মধ্যে দুই রাত ছিলাম গ্র্যান্ড ক্যানালের পরেই অবস্থিত আমান নামের হোটেলে। ষোল শতকের এক সুরম্য পালাজ্জো। বিশাল বিশাল ক্রিসমাস ট্রি রয়েছে এখানে। এখানে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহ আগে বন্যার পানি সরে গেছে। তবুও শহরটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি চুপচাপ। ভেনিসের পর্যটকদের প্রিয় জায়গা এক রেস্টুরেন্ট, নাম তার এস্ট্রো। এখানে অক্টোপাস, সারাডিন এবং গ্নোচি'র স্থানীয় রেসিপি পাওয়া যায়। এখানে ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে পেগি গুগেনহেইম মিউজিয়াম। ভেনিস ভ্রমণটা সত্যিকার অর্থেই সুন্দর ছিল। 

ভেনিসের সান্তা লুসিয়া থেকে মিলানো সেন্ট্রাল  
ভ্রমনের সময়: ২.৫ ঘণ্টা 


মিলানের ঝিরঝিরে বাতাস মন-প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। একটা রাত বুলগেরিয়া হোটেলে কাটালাম। আরো বেশি সময় থাকতে মন চাইবে। মিলানিজদের চারচিক্যময় গোত্রগুলোর ক্যাথেড্রাল দেখার মতো। দুপুরে খাবারের বাজারে ঘোরাঘুরির পর বাগাতি ভালসেচ্চি মিউজিয়ামে ঢুঁ মারা হলো। এটা উনিশ শতকের একটা বাড়ি। পরদিন সকালে নাস্তা আর কফি খেয়ে রওনা দিলাম জেনেভার দিকে। 

মিলানো সেন্ট্রাল থেকে জেনেভা 
ভ্রমণের সময়: ৬ ঘণ্টা  


জেনেভায় একটা রাত কাটানোর কথা বলেই আমার স্বামী হেসেছিলেন। তার কথায়, এটা ভ্রমণের চেয়ে ব্যবসার কাজে ঘোরাঘুরির জায়গা। তবে ইতালি থেকে ফ্রান্সে যাওয়ার পরিবর্তে এখানে আসার সিদ্ধান্ত মোটেও খারাপ ছিল না। এই যাত্রায় আমরা ইতালির বিভিন্ন লেকের কিনারা হয়ে বরফাচ্ছাদিত পর্বতে চড়ে তারপর পৌঁছলাম জেনেভা। স্টেশন থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটলেই বিউ-রিভাজের রাজসীক দৃশ্য চোখে পড়বে। হোটেলে উপভোগ্য সময় কাটিয়েছি। 

জেনেভা থেকে প্যারিসের গ্যারে ডি লায়ন 
ভ্রমণের সময়: ৪ ঘণ্টা 

Paris
ফ্রেঞ্চদের রেইল ইউনিয়নের সহায়তায় আমরা প্যারিস পর্যন্ত পৌঁছতে পারলাম। ভ্রমণের শেষ কিছু দিন কাটালাম লি মিউরিসে। লি গ্র্যান্ড কোলবার্টে বিকালটা কাটালাম। অনিয়ন স্যুপ আর ক্রিমি ক্যারামেলের মতো ক্লাসিক খাবারগুলো অর্ডার করলাম। ওইদিন রাতেই খেলাম রেস্টুরান্ট লি মিউরিস অ্যালাইন ডুক্যাসে-তে। 

অবশেষে আমরা প্যারিস থেকে লন্ডনে ফিরলাম। ইউরোপ ভ্রমণ করলাম রেলে চেপে। অসম্ভব উত্তেজনা, ভালোলাগা আর ভালোবাসা নিয়ে ফিরে এলাম। আমি বলতে পারি, ইউরোপ ভ্রমণের জন্যে ট্রেনই সবচেয়ে ভালো উপায়। 

সূত্র: স্পেকটেটর 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা