kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

অপরিকল্পিত নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা

মোঃ শাহ জালাল মিশুক   

২৮ জুলাই, ২০২০ ১৪:১৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অপরিকল্পিত নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা

নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষার বন্দনা করে এমন অমর পঙক্তি রচনা  করেছিলেন। বর্ষাকে স্বাগত জানিয়ে বন্দনা করে এমন আরো অনেকে অসংখ্য কবিতা ও গানে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্ষাকালে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। পাশাপাশি বৃষ্টির সৌন্দর্য মানুষের মনে শিল্পবোধ জাগিয়ে তুলবে। কবি কবিতা লিখবেন, সুরকার সুর বাঁধবেন, গায়ক গান গাইবেন, চিত্রশিল্পী ছবি আঁকবেন- আর এভাবে দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি আরো ঋদ্ধ হয়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এমন সৌন্দর্য উপভোগ তো দূরের কথা, প্রত্যাশা করাও যেন বেশ দুষ্কর রাজধানী ঢাকার নগরবাসীর জন্য। কংক্রিটে আচ্ছাদিত ঢাকা শহর থেকে প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ বহু আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে গত ২২ জুলাই, ২০২০ ইং ঢাকার বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে আছে। এসব এলাকার বড় সড়কের চেয়ে বিভিন্ন আবাসিক এলাকার ছোট রাস্তা এবং অলিগলির অবস্থা ছিল আরো করুণ। বেশির ভাগ বাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকেছে। ব্যবসারও হয়েছে ক্ষতি। জলাবদ্ধতার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরীক্ষা করতে আসা করোনা রোগীরা পড়ে বিপাকে। পাশাপাশি অফিসগামী মানুষদের ভোগান্তিও ছিল চরমে। একদিকে কোমর সমান পানি, অন্যদিকে খোঁড়া সড়ক। গাড়ির চাকার তোড়ে সৃষ্ট পানির ঢেউ ডিঙিয়ে চলতে গিয়ে খাদে পড়ছে মানুষ ও ছোট যানবাহন। 

দিনদিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র৷ ঘণ্টাপ্রতি ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই এই শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তলিয়ে যায়৷ বর্ষায় পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ৷ ঢাকার জলাবদ্ধতার বেশ কিছু কারণ এই জনদুর্ভোগ থেকে যেন নগরবাসীকে কোনোভাবেই মুক্তি দিচ্ছে না। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মহানগরীতে এখন দুই কোটিরও বেশি মানুষ বাস করছে৷ এই শহরের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে৷ ফলে শহরের বেশির ভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে৷ ঢাকা শহরের অনেক এলাকায়ই এখনো ময়লা ফেলা হয় খোলা জায়গায়৷ এসব ময়লা-আবর্জনা, বিশেষ করে কঠিন বর্জ্যের একটা অংশ সরাসরি ড্রেনে গিয়ে প্রবাহ বন্ধ করে দেয়৷ ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায় রাস্তাঘাটে৷ পাশাপাশি শহরের সড়কগুলোতে খোড়াখুঁড়ির মহোৎসব শুরু হয় বর্ষা মৌসুমের ঠিক আগে থেকে৷ পুরো বর্ষা মৌসুম ধরেই চলে এসব খোড়াখুঁড়ি৷ সামান্য বৃষ্টিতেই তাই জলাব্ধতার সৃষ্টি হয় শহরে৷

অন্যদিকে শহরের চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতালক্ষ্যা প্রভৃতি নদী ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলেছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ভূমিদস্যু৷ আর তাই বিশাল জনসংখ্যার এ শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ ঢাকা নগরীর ৬৫টি খাল একসময় এ মহানগরীর পানি নিষ্কাশনে বিশেষ ভূমিকা রাখত৷ কিন্তু রাজধানীর এই খালগুলো এখন খুঁজে পাওয়াও কঠিন৷ বেশিরভাগই চলে গেছে দখলদারদের হাতে৷ অনেকগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে৷ যে দু’য়েকটি টিকে আছে সেগুলোও দখলে জর্জরিত৷ শহরের বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে আবাসান ব্যবস্থা গড়ে তোলায় বড় এই শহরের পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ হয়েছে৷ প্রায়শই দেখা যাচ্ছে ঢাকা শহরে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজে কোনো সমন্বয় না থাকায় সারা বছরই সড়ক খোড়াখুড়ি চলতেই থাকে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ওয়াসা স্যুয়ারেজ নির্মাণের জন্য একটি সড়ক খোড়া হলো, সে কাজ শেষ হতে না হতেই আবার খোড়াখুড়ি শুরু করল গ্যাস কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগ৷ ফলে সারা বছর সড়কগুলোতে এ ধরনের কাজ চলায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়৷ অন্যদিকে শহরে এখনো চলছে পলিথিনের অবাধ ব্যবহার৷ পলিথিন ব্যবহার না করার আইন থাকলেও তার সামান্যটুকুও মানা হয় না৷ ফলে দুই কোটির ও বেশি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয় তার অধিকাংশজুড়েই থাকে পলিথিন৷ এসব পলিথিন পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে দেয়৷

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের পর্যাপ্ত পরিমাণে উন্মুক্ত এলাকা থাকতে হয়। এতে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে চলে যেতে পারে। এটি হলে মাটির নিচের পানির স্তরও ভালো থাকে, জলাবদ্ধতাও কমে। এরপরও বৃষ্টির যে পানি থাকবে, তা জলাধারে গিয়ে কিছু সময়ের জমা হওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হয়। কিন্তু ঢাকা শহর উল্টো পথে হেঁটেছে, কংক্রিটের আচ্ছাদন বছর বছর বেড়েছে আর জলাধার কমেছে। গত বছর প্রকাশ করা বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি) একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে মূল ঢাকা শহরের মোট ভূমির প্রায় ১৪ শতাংশ ছিল জলাভূমি। ওই সময় কংক্রিটে আচ্ছাদিত এলাকা ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। ২০ বছর পর ২০১৯ সালে জলাভূমি কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ, আর কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা বেড়ে হয়েছে ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশ।

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে অতিদ্রুত দরকার টেকসই উদ্যোগ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এরই ধারাবাহিকতায় অতিদ্রুত সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও টেকসই ড্রেনেজ ও জল নিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে মূল দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ ডিভিশনকে কারিগরী লোকবল ও বাজেটসহ সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করতে হবে, এতে কারিগরী সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনকে করতে হবে জরুরী ভিত্তিতে জল নিষ্কাশনের, স্থানীয় সমস্যাগুলো নিরসনে কার্যকর ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয় সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ, অঞ্চল ভিত্তিক কাউন্সিলর আর রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা যেতে পারে। 

অন্যদিকে ঢাকা শহরের সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজে বিশেষত সড়ক খোড়াখুড়ির বিষয়ে অবশ্যই কঠোরভাবে সমন্বয়হীনতা দূরকরে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি রাজউককে দ্রুত ও কঠোর ভাবে ‘সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিকল্পিত জলাধার, নিম্নাঞ্চল, প্লাবন ভূমি পুনঃরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি প্লটে আইনানুগ ২৫ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান পুনঃরুদ্ধার করার মধ্যে দিয়ে মাটির অভ্যন্তরে জল পুনঃভরণ নিশ্চিত করতে হবে। পানি নিষ্কাশনের পথগুলো যেনো বন্ধ না হয়, তাই পলিথিন ব্যবহার না করার আইন রাজধানীতে কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিদিনের বর্জ্য থেকে পলিথিনের পরিমান একেবারে কমিয়ে ফেলতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন ও রাজউক সহ সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিকল্পনা প্রনয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সকল ধাপে পর্যাপ্ত সংখ্যক নগর পরিকল্পনাবিদদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে অনেকাংশেই পরিকল্পিত নগর গঠনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেয়া সম্ভব হবে। এজন্য সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে অতিদ্রুত স্থায়ী নগর পরিকল্পনাবিদ পদ স্মৃষ্টি করে পর্যাপ্ত সংখ্যক নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ প্রদান করে যথাযথভাবে তাদের কাজের সুযোগ করে দিলে, পরিকল্পিত নগর গঠনের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা 
করা যাচ্ছে।

অর্থাৎ, সবমিলিয়ে এটা পরিস্কার যে জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা শহরের বৃষ্টির পানি চারপাশের নদীতে পৌঁছাতে ড্রেন-খাল ও নদীর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ থাকা খুবই দরকার। বাস্তবতা হচ্ছে এখনো সেটা নেই। শহরের খালগুলো দখলমুক্ত এবং খাল ও ড্রেনে কঠিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। এটা নিশ্চিত করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য ড্রেন-নদী ও খালের সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যেকোনোমূল্যে রাজধানীতে জলাবদ্ধতায় জনদুর্ভোগ নিরসনে টেকসই উদ্যোগ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অতিদ্রুত হাতে নিয়ে নগরবাসীকে এমন চরম জনদুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে হবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

*** মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা