kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৭। ৬ আগস্ট  ২০২০। ১৫ জিলহজ ১৪৪১

দিল্লির চিঠি : বিশ্বায়নের যুগে সুখ-দুঃখ কোনো সীমান্ত মানে না

জয়ন্ত ঘোষাল   

২৭ জুলাই, ২০২০ ০৮:১৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দিল্লির চিঠি : বিশ্বায়নের যুগে সুখ-দুঃখ কোনো সীমান্ত মানে না

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নাকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন?

হ্যাঁ, করেছিলেন তো! তাতে হলোটা কী?

এর আগে শেখ হাসিনা যেদিন দিল্লি এলেন, আমরা দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, সেদিন তো বহু দেশের রাষ্ট্রদূত এসে তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। পাকিস্তানের উপহাইকমিশনার সঈদ হায়দার শাহও এসেছিলেন। এখন ভারত-পাকিস্তান দুই দেশেই হাইকমিশনার নেই। ডেপুটিই কার্যনির্বাহী হাইকমিশনার। তিনি সেদিন শেখ হাসিনাকে বললেন, প্রধানমন্ত্রী আপনাকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। সেদিন শেখ হাসিনা দিল্লি আসার আগেও ইমরান ফোন করেন এবং ১৫ মিনিট কথা বলেন।

তাতে হলোটা কী? এতো স্বাভাবিক কূটনীতি।

আমাকে ফোন করেছিলেন এক ভারতীয় অফিসার। তিনি কিন্তু এত সহজে ব্যাপারটা মেনে নিতে চাইছেন না। তাঁর প্রশ্ন, ‘আচ্ছা, আপনি কি জানেন ইমরান খান ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শেখ হাসিনাকে?

ওই অফিসারকে আমি বললাম, কী কথা হয়েছে দুজনের মধ্যে তা জানব কী করে? ইমরান খান বা শেখ হাসিনা দুজনের কেউই তো আমাকে জানাননি তাঁরা কী কথা বলেছেন। তবে নিজের দেশে আমন্ত্রণ জানানো তো শিষ্টাচার।

বুঝলাম, ভারতীয় কূটনীতিক, অফিসার ও রাজনৈতিক নেতারা বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমার মনে হয়, সময় বদলাচ্ছে। প্রতিটি দেশের সঙ্গে অন্য একটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বিরোধ আজ চরমে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিও গঠিত হয় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করে। কিন্তু সে তো ১৯৭১ সালের কথা। আজ ২০২০ সালে সব কিছু বদলে গেছে। ভারত পাকিস্তানের জন্য শত্রু কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্র। বাংলাদেশের সঙ্গে এই ইতিহাসের বোঝা কেন বয়ে নিয়ে যাবে। তাই চীন-আফগানিস্তান-ইরান সবাই ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়। সবাই জানে দক্ষিণ এশিয়ায় এই ছোট্ট দেশটির ভৌগোলিক-কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্ব অসীম। বাংলাদেশের সঙ্গে চীন-পাকিস্তান-রাশিয়া ভালো সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করবে—এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার জন্য ভারতের দিক থেকে চাই প্রো-অ্যাকটিভ ডিপ্লোমেসি।

এ কারণেই ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী হাইকমিশনার করে পাঠাচ্ছেন বিক্রম দোরাই স্বামীকে। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে ছিলেন দারুণ সক্রিয়। শ্রিংলা যাওয়ায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর ডেডিকেশনও ছিল অভূতপূর্ব। তিনি সাউথ ব্লকে যখন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ছিলেন তখন থেকেই তাঁকে দেখছি খুব সক্রিয়। আর শ্রিংলার এক সুযোগ্য জুনিয়র অফিসার ছিলেন স্মিতা পন্থ। সাউথ ব্লকের একতলায় শ্রিংলার ঘরে বসে যখন বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলতাম, দেখতাম তাঁর চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে নতুন নতুন ভাবনা শুনলে। তিনি ডাউন টু আর্থ ব্যক্তি। আইএফএস-সুলভ অভিজাত নাক-উঁচু বিচ্ছিন্নতা দেখিনি কখনো। দার্জিলিংয়ের এই মানুষটি বাংলাদেশের সফলতার সিঁড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং আজ দেশের পররাষ্ট্রসচিব। শ্রিংলার জন্য আজ ঢাকায় এই পোস্টিংয়ের কূটনৈতিক গুরুত্বটাও বেড়ে গেছে। তাই রিভা গাঙ্গুলি দাসের মতো বাঙালি কূটনীতিককে দিল্লিতে সচিব (পূর্ব) মর্যাদায় ফিরিয়ে এনে পাঠানো হচ্ছে বিক্রম দোরাই স্বামীকে। তিনি তামিল হলেও ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারেন। কারণ তাঁর স্ত্রীর মা বাঙালি এবং বাংলায় কথা বলতে শ্রীমতী বিক্রম স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

আসুন, আজ বাংলাদেশের পাঠকদের বিক্রম দোরাই স্বামী সম্পর্কে কিছু কথা জানাই। নরেন্দ্র মোদি সরকার ঢাকায় নিযুক্ত দিল্লির শীর্ষ কূটনীতিক রিভা গাঙ্গুলি দাসের পরিবর্তে বিক্রমকে স্থলাভিষিক্ত করলেন। এর আগে তিনি আফগানিস্তানে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিক্রম দোরাই স্বামী ১৯৯২ সালের ফরেন সার্ভিস ব্যাচ। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং নানা সামিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। বিক্রমের ওপর আজ ভারতের প্রত্যাশা অনেক, একইভাবে ঢাকারও। ৪৫ বছরের এই ঝকঝকে যুবক মনমোহন সিংয়ের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন।

৭ রেসকোর্স রোডে মনমোহনের চেম্বারের বাইরে ছোট একটি ঘরে বসে তিনি যখন ব্যক্তিগত সচিবের কাজ করতেন, তখন দেখেছি তিনি কিভাবে নানা দেশের কূটনীতির অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। আমাদের দেশে ইন্দিরা থেকে রাজীব, এমনকি নরসিমা রাও জমানায়ও ব্যক্তিগত সচিব একজনই হতেন। আর আইএএস অর্থাৎ ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসেসের নবীন অফিসারকে নিযুক্ত করতেন। অটল বিহারি বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হন আইএএস ব্রজেশ মিশ্র। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দুজন ব্যক্তিগত সচিব নিয়োগ প্রথা চালু করেন। একজন আইএএস, তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ কাজ দেখবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ক্যাবিনেট মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালদের যোগাযোগ রাখবেন আর অন্যজন হবেন আইএফএস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসার। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পৃথিবীর অন্য সব রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগের একটি সূত্র হবেন। তখন শক্তি সিনহা আইএএস হলেও ফরেন সার্ভিসের অজয় বিসারিয়া হলেন আর এক ব্যক্তিগত সচিব। তিনি আজ পাকিস্তানে ভারতের হাইকমিশনার। মনমোহন আসার পর এই প্রথা রদ করেননি। দুজন ব্যক্তিগত সচিবের একজন হন বিক্রম। ফলে তাঁরও অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আছে অনেক মণিমাণিক্য।

বিক্রম কিন্তু শুরুতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করে সাংবাদিক হন। ফলে সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আছে তাঁর ডিএনএতে। প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হলে ১৯৯৪ সালে তিনি হংকংয়ে যান। তখন তিনি ছিলেন সেখানকার থার্ড সেক্রেটারি। এই সময়েই তিনি চীনা ভাষা ম্যান্ডারিন শিখে ফেলেন নিউ এশিয়া ইয়েল-ইন-এশিয়া ল্যাংগুয়েজ স্কুল থেকে। হংকংয়ে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ছিল সে প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৬ সালে তিনি বেইজিংয়ে যান। চার বছর সেখানে কর্মরত ছিলেন।

বিক্রম দিল্লিতে ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল হলেন। তারপর নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের ভারতীয় পার্মানেন্ট হাইকমিশনে রাজনৈতিক কাউন্সিলর হন। তারপর দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে কনসাল জেনারেল হন। বিক্রম এরপর দিল্লি এসে বেশ কয়েক বছর সার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০১২ সালের মার্চ মাসে ব্রিকসের সামিট পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।

যখন যেখানে গেছেন বিক্রম সফলই হয়েছেন। ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। আর আজ যখন তিনি ঢাকা যাচ্ছেন তখন তিনি হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর ও পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার খুবই পছন্দের। এ কথা কেন বলছি জানেন? এ জন্য বলছি, শীর্ষ স্তরে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকলে সেই কূটনীতিক অন্য দেশে অনেক সিদ্ধান্ত সহজে নিতে পারেন। সব দেশেই আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার ফাঁস থাকে। বিক্রমকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন আর মোদি, জয়শংকর ও হর্ষ বর্ধনের টিমের দর্শনের সঙ্গে বিক্রমের মতৈক্য আছে। শেখ হাসিনাও তাঁকে জানেন। ফলে বাংলাদেশের যেসব সমস্যা ও দাবি আছে সেগুলো পূরণ করাও সহজ হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে বৃহৎ রাষ্ট্রসুলভ দাদাগিরি নয়, বিক্রম দোরাই স্বামী চান সম্পর্কটাকে একটা সমান মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে।

২০২০ সালের ৩ মার্চ হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে তিনি বলেন, ঢাকায় আসতে পারা আমার জন্য খুবই আনন্দের। কারণ ঢাকা আমার কাছে নিজের শহরের মতোই। ঢাকা ও বাংলাদেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এমনকি সেদিন শ্রিংলা আশ্বাস দেন যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার জন্য অনুকূল আবহ তৈরির জন্যও ভারত সরকার মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছে। শ্রিংলা কবি নজরুলকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, সুখ আর দুঃখ আমরা সমানভাবে ভাগ করে নিই। কারণ বিশ্বায়নের যুগে সুখ-দুঃখ কোনো সীমান্ত মানে না। আর তারা সবার দ্বারপ্রান্তেই একইভাবে হাজির হয়।

ঠিক এই পটভূমিতে বিক্রমের ঢাকায় গমন। তাঁর ঢাকা যাত্রা সফল হোক।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা