kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন কত দূর?

ড. সমীরুজ্জামান সমীর, ড. এনায়েতুর রহমান   

২৩ জুলাই, ২০২০ ১১:৫৬ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন কত দূর?

করোনাভাইরাসের প্রকোপে বিশ্ব আজ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সারা বিশ্বেই করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন/টিকা আবিষ্কারের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। অনেকেই ভাবছেন যে জনজীবন দৈনন্দিন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হলে বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীর শরীরে করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরির কোনো বিকল্প নেই। সবাই চেষ্টা করছেন যাতে ন্যূনতম সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসা যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। আর কার্যকর একটি ভ্যাকসিন উদ্ভাবনই কিন্তু সব কিছুর সমাধান নয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সব মানুষকে দেওয়ার মতো যথেষ্ট ভ্যাকসিন উৎপাদনও একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। এখন প্রশ্ন হলো, ভ্যাকসিনে এলেই কি আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? ভ্যাকসিন উদ্ভাবন হলেও আমাদের হাতে সময়মতো আসবে কি? যদি আমরা ভ্যাকসিন পাইও, দীর্ঘ মেয়াদে এ ভ্যাকসিন কাজ করবে কি? আদৌ কাজ না করলে কী হবে আমাদের? তাড়াহুড়া করে ভ্যাকসিন বাজারে নিয়ে আসতে গিয়ে আমরা পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই না আবার বড় কোনো ভুল করে ফেলি, যার খেসারত দিতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, এটাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। এ প্রশ্নগুলোর কেন অবতারণা করছি, তার ব্যাখ্যা এ প্রবন্ধে দেওয়ার চেষ্টা করব।

আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা রোগ-জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। তা বেশ কয়েক ধরনের পদ্ধতিতে কাজ করে। শরীরের কোথাও বাইরে থেকে কোনো জীবাণু ঢুকেছে, এটা শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের শরীরের স্বয়ংক্রিয় ইমিউন রেসপন্স এর বিরুদ্ধে কাজ করা শুরু করে। একধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণের মাধ্যমে ইনফ্লেমেশন তৈরি করে এবং রক্তের মধ্যকার শ্বেত রক্তকণিকা আক্রান্ত কোষগুলোকে মেরে ফেলে। আমাদের শরীরে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের জীবাণু ঢুকতে থাকে এবং আমাদের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সুস্থ রাখে। বেশির ভাগ রোগ-জীবাণুর বিরুদ্ধে আমাদের প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কার্যকর হলেও করোনাভাইরাসের মতো জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে এটা খুব একটা কার্যকর হয় না। এসব ক্ষেত্রে কাজে লাগে অ্যাডাপ্টিভ ইমিউন রেসপন্স, যা কিনা একটি নতুন জীবাণুর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে নতুন নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। একটি কার্যকর অ্যান্টিবডি যখন তৈরি হয়ে যায় তখন ওই অ্যান্টিবডিগুলো ভাইরাসের গায়ে আঠার মতো লেগে যায় এবং শরীরের টি সেল তখন ভাইরাসগুলো কোন কোন কোষে আছে তা শনাক্ত করতে পারে। ভাইরাসে আক্রান্ত ওই কোষগুলোকে তখন টি সেল মেরে ফেলতে পারে এবং ধীরে ধীরে শরীর সুস্থ হয়ে যায়। আমাদের শরীরে যদি কোনো একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের ইমিউন সিস্টেম এটা মনে রাখতে পারে, যা ভবিষ্যতে এই একই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। সাধারণভাবে ধরা হয় কোনো রোগী যত বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে কোনো একটি ভাইরাসের আক্রমণে, তার শরীরের ইমিউন সিস্টেমের রেসপন্স তত বেশি হবে এবং সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর তার শরীরে অ্যান্টিবডির পরিমাণ বেশি থাকার সম্ভাবনা তত বাড়বে। যথেষ্ট পরিমাণ অ্যান্টিবডি শরীরে থাকলে ভবিষ্যতে এই বিশেষ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা হবে খুবই কম, আর অসুস্থ হলেও প্রথমবারের মতো অতটা মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা আরো কম। কাজেই কোনো বিশেষ ভাইরাসের কবল থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখতে শরীরে উপযুক্ত অ্যান্টিবডি, যথেষ্ট পরিমাণে তৈরি হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। যার শরীরে একটি বিশেষ রোগের জীবাণু প্রবেশই করেনি, ভ্যাকসিন/টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে তার শরীরে এই অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে। এই কারণেই সারা বিশ্ব তাকিয়ে আছে সার্স কভ-২-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দিকে।

মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম কিছু কিছু রোগের জীবাণুকে মনে রাখতে পারলেও কিছু জীবাণুকে আবার ভুলে যায়। যে জীবাণুকে আমাদের ইমিউন সিস্টেম মনে রাখতে পারে, তার বিপক্ষে যত দিন ভুলে না যাচ্ছে তত দিন আমাদের শরীর থাকে সুরক্ষিত। যেমন, আমরা সবাই জানি যে জীবনে একবার কখনো আমাদের জলবসন্ত হলে সারা জীবনে আর হয় না। হামের টিকা যেমন একবার নিলে যদি শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, আমাদের ইমিউন সিস্টেম এটাকে মনে রাখে সারা জীবন। আবার বাচ্চাদের শ্বাসতন্ত্রের রোগ আরএসভি-কে যেমন আমাদের ইমিউন সিস্টেম একেবারেই মনে রাখতে পারে না, এক মৌসুমেই একজন বাচ্চা একাধিকবার এতে আক্রান্ত হতে পারে। এখনকার করোনাভাইরাসের (সার্স কভ-২) অ্যান্টিবডিকে মানবদেহ কত দিন মনে রাখতে পারে সে ব্যাপারে এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত নেই। কাজেই একবার নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেলে, শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি যে আমাদের কত দিন এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। মানবদেহে অন্য আরো যেসব করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয় তাতে দেখা যায়, সাধারণ ভাইরাল ফ্লু এক বছরের মধ্যেই আবার আক্রমণ করতে পারে, সার্স ও মার্সের অ্যান্টিবডি কয়েক বছর পর্যন্ত মানবদেহে থাকে। এর আলোকে ধারণা করা যায় যে নভেল করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি হয়তো বেশি দিন শরীরে থাকবে না। যদিও নিশ্চিতভাবে এখনই কোনো কিছু বলা মুশকিল। যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে যে নভেল করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি মানবদেহে কয়েক মাসের বেশি থাকে না, যদিও এ ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে হলে আরো বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। অ্যান্টিবডি যদি দীর্ঘ মেয়াদে শরীরে না-ই থাকে, তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেও কিন্তু আমাদের খুব বেশি একটা লাভ হবে না শেষ পর্যন্ত।
একটি সফল ভ্যাকসিন উদ্ভাবন কোনো ম্যাজিক নয় যে সংবাদ সম্মেলন করে বলে দিলেই উদ্ভাবন হয়ে গেল। এ পর্যায়ে আমরা একটু বুঝতে চাই যে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াগুলো কী কী আর নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন গবেষণায় কে কোন অবস্থায় আছে, আর প্রক্রিয়াটাই বা কিভাবে এগোচ্ছে। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলো ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা-ও বোঝা দরকার।

যেকোনো রোগেরই একটি কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন আসলে একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ, যাতে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে অভিজ্ঞ যেকোনো গবেষকদলেরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের একেবারে প্রাথমিক ধাপ হলো ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনের ওপর বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করা। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি যথার্থ ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট বের করতেই যেকোনো গবেষকদলের দুই থেকে চার বছর সময় লেগে যায়। এই পর্যায়ে যে ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটগুলোকে সম্ভাবনাময় বলে ধারণা করা হয় সেগুলো পরবর্তী যে পর্যায়ে যায়, তার নাম প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, যাতে মোটামুটি বছর দুয়েক সময় লাগে। প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অন্য প্রাণিদেহে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যথার্থভাবে পরীক্ষা করা হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি এক শ ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনের মধ্যে বিশটির বেশি এই পর্যায় পার হয়ে মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেতে পারে না। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সাধারণত তিনটি পর্যায়ে হয়ে থাকে— ফেজ-১, ফেজ-২ এবং ফেজ-৩। ফেজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ভ্যাকসিনটি একটি ছোট দলের ওপর প্রয়োগ করা হয়, দেখা হয় এটি কতটা নিরাপদ এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে এটা কতটা প্রভাবিত করতে পারে। প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পার হয়ে আসা ২০টি ভ্যাকসিনের মধ্যে ১০টির বেশি সাধারণত ফেজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পার হতে পারে না। ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ভ্যাকসিনটি এইবার কয়েক শ লোকের ওপর প্রয়োগ করা হয় এবং এই পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিনটি মানবদেহে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে কি না, এ ব্যাপারে আরো বিশদভাবে জানতে পারে। ভ্যাকসিনের কার্যকর মাত্রা ও পরিমাণের ব্যাপারেও ফেজ ২-এর ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফেজ-২ পার  হতে পারে হয়তো শেষ পর্যন্ত পাঁচটির মতো ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট। ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয় কয়েক হাজার মানুষের ওপর, মানবদেহের ওপর ভ্যাকসিনের বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং এর কার্যকারিতার বিস্তারিত তথ্য এই ফেজে বের হয়ে আসে। ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পার করে ফেলা ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটকেই আমরা ধরতে পারি একটি সফল উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন। যদিও ক্রমাগত রূপ পরিবর্তন করতে থাকা ভাইরাসের জন্য একবার উদ্ভাবিত এ ভ্যাকসিনই সবার জন্য বা সব জনগোষ্ঠীর জন্য সমভাবে কার্যকর হবে না।  প্রাথমিকভাবে প্রতি ১০০টি ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনের মধ্যে গড়ে একটি ভ্যাকসিন শেষ পর্যন্ত ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল উতরাতে পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এই সবগুলো ধাপ ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ বছরের মতো সময় লেগে যেতে পারে। এরপর ভ্যাকসিনটিকে পাঠানো হয় অনুমোদনের জন্য। সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে  ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লেগে যায় এই পর্যায়ে। এই সব ধাপ অতিক্রম করার পর একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনে যায় এবং এই ধাপে বছর দুয়েক লেগে যাওয়ারও নজির আছে। যুক্তরাজ্যের ওয়েলকাম ট্রাস্টের হিসাব মতে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ অতিক্রম করে একটি কার্যকর ভ্যাকসিন বের করতে ১০ বছরের ওপর সময় লেগে যায় এবং এই কাজে আনুমানিক সর্বমোট খরচ ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যা চার হাজার কোটি টাকার চেয়েও বেশি। তবে বিশ্বে কভিড-১৯ মহামারিতে বিপুল পরিমাণে লোকের প্রাণহানি হওয়ায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা বিশাল পরিমাণ অর্থ ও লোকবল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের পেছনে ব্যয় করেছে। এ জন্যই আশা করা যাচ্ছে যে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক কম সময়ের মধ্যেই হয়তো করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন মানুষের হাতে চলে আসবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কোনো দেশ যদি একটি-দুটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট বের করেই আশাবাদী হয়ে যায়, তা বাস্তবতার নিরিখে হবে বোকামি। ভ্যাকসিন গবেষণায় দীর্ঘদিন নিজেদের ধরে রাখাটাই হবে সেই সব দেশের গবেষণার প্রাথমিক সাফল্য।

বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার গবেষক করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজে দিন-রাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বিশ্বে এখন ১৪০টির বেশি গবেষণাদল কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজে নিয়োজিত। এর মধ্যে প্রি-ক্লিনিক্যাল ফেজে আছে ১৩৮টি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফেজ-১-এ আছে ১৭টি, ফেজ-২-এ আছে ৯টি এবং ফেজ-৩-এ আছে তিনটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট। এখন পর্যন্ত ফেজ-৩ ট্রায়াল সম্পন্ন করতে পারেনি কোনো ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট। আশা করা যাচ্ছে ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়তো কোনো একটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট অতিক্রম করে ফেলবে ২০২০ সালের শেষ নাগাদ, এবং বিজ্ঞানীরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন এই পুরো প্রক্রিয়া ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য। এখানে একটি কথা উল্লেখ্য, যে গবেষকদলগুলো ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের এই দৌড়ে সবচেয়ে অগ্রগামী, তারা কিন্তু বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজ করে যাচ্ছে কয়েক যুগ ধরে। যেকোনো নতুন ভ্যাকসিন ডিজাইন করার কাজে তাদের আগে করা বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল, পূর্ববর্তী প্যাটেন্ট ব্যবহার করতে পারায় তারা অন্য অনেক নতুন গবেষকদলের তুলনায় অনেকটা এগিয়ে থাকে। ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের বিশ্বব্যাপী এই মহাযজ্ঞে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদেরও যে পদচারণ শুরু হয়েছে, এটা আশার কথা। বাংলাদেশের একটি ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন প্রি-ক্লিনিক্যাল ফেজে আছে বলে সংবাদমাধ্যমে বেশ আলোড়ন তুলেছে অতি সম্প্রতি। 

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম যেখানে দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অপরাধ ও দারিদ্র্যের মতো বিষয়গুলো প্রচার করতেই বেশি ব্যস্ত, সেখানে বাংলাদেশি কারো কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের খবর, তা যত প্রাথমিকই হোক না কেন প্রচার করছে, এটা ভালো দিক। বিজ্ঞানীদের কাজটা চটকদারির নয়, সেটাও বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের বুঝতে হবে। আশা করা যায় বাংলাদেশ থেকে কভিড-১৯-এর আরো অনেক ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন বের হবে এবং অনেক গবেষক ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগের চিন্তা করবেন। এতে যদি শেষ পর্যন্ত একটি ভ্যাকসিনও সবগুলো ধাপ পার হয়ে সফলতার মুখ দেখে, ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের দৌড়ে আমরা কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকব। তবে ভ্যাকসিন ডিজাইনের ক্ষেত্রে অন্য ওষুধের তুলনায় অনেক বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়, কারণ এটা কোটি কোটি সুস্থ মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয়। এ জন্য ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের সব ফেজ সতর্কতার সঙ্গে অতিক্রম করাটা অত্যন্ত জরুরি।

ভ্যাকসিন ডিজাইনের ক্ষেত্রে জেনোমিক ডেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত (১৬.০৭.২০২০) ২২২টি নভেল করোনাভাইরাসের জেনোম সিকোয়েন্সিং ডাটা এরই মধ্যে এনসিবিআই ও জিসাইডে প্রকাশ করেছেন। এগুলোর মধ্যে বিসিএসআইআরের গবেষকদলটি এরই মধ্যে সর্বোচ্চ ১৭১টি করোনাভাইরাস  সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করে দেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অগ্রগামী ভূমিকা রাখছে। বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস এরই মধ্যে তার জেনোমিক লেভেলে ৫৯০টি ও প্রোটিন লেভেলে ২৫০টিরও অধিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের পাশাপাশি কভিড-১৯ রোগীর নমুনায় অন্য আরো প্যাথোজেনের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। এ ছাড়া বিসিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা কভিড-১৯ রোগীর নমুনায় অন্যান্য মাল্টি-ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট জিনের উপস্থিতি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এ গবেষণাগুলো বাংলাদেশের মানুষের জন্য ওষুধ প্রস্তুতসহ সার্বিক আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত গবেষণায় সহায়ক হবে। 

বিশ্বব্যাপীই সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজে অর্থ সহায়তা থেকে শুরু করে সার্বিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বায়োমেডিক্যাল অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি কয়েক শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে ভ্যাকসিন গবেষণায়, যার অংশীদার হলো ফার্মা কম্পানি মডার্না ও জনসন অ্যান্ড জনসন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ ডজনখানেক মার্কিন ফার্মা কম্পানির সঙ্গে একযোগে কাজ করছে ভ্যাকসিন গবেষণায় গতি আনয়নে। যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না মার্চ ২০২০-এ মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করে। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, এই ভ্যাকসিন মানবদেহের জন্য নিরাপদ এবং মডার্নার ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট জুনে আরো বড় আকারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে গেছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের অনুদানের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক ফার্ম ইনোভিয়ো ফার্মাসিউটিক্যালস এপ্রিলে একটি ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করে। চীনে কমপক্ষে ছয়টি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল গত মার্চ মাস থেকেই শুরু হয়েছে, এবং তাদের সামরিক বাহিনীর লোকের ওপর প্রয়োগের জন্য একটি ভ্যাকসিনের ছাড়পত্র এরই মধ্যে মিলেছে। 

অস্ট্রেলিয়ায় তিনটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের ট্রায়াল চলছে। ইউরোপিয়ান দেশগুলো এ পর্যন্ত ভ্যাকসিন গবেষণায় মোট আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা) বরাদ্দ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়োটেক কম্পানি নোভাভ্যাক্স অস্ট্রেলিয়ার তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে, ভালো ফল পেলে তারা তাদের ট্রায়াল যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশেও শুরু করতে ইচ্ছুক। ভ্যাকসিনের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাডক্স ভ্যাকসিন টিম। এই ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজে গতি আনার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে এবং সফল হলে ফার্মা কম্পানি এস্ট্রাজেনেকা এই ভ্যাকসিন উত্পাদন করে বাজারে নিয়ে আসবে। মানবদেহে ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে অক্সফোর্ডের এই ভ্যাকসিনের। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে থাকা যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকদের আরেকটি ভ্যাকসিনকেও অনেক সম্ভাবনাময় বলে ধরা হচ্ছে। জার্মানির ফার্মা জায়ান্ট ফাইজার, জার্মান ফার্ম বায়োএন্টেক এবং চায়নিজ ফার্ম ফোসাম ফার্মা একসঙ্গে কাজ করছে একটি ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের জন্য। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল জার্মানিতে শুরু হয়েছে গত এপ্রিলে। আরেকটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল জুনে শুরু করেছে জার্মান ফার্ম কিউরভ্যাক। রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেটের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

বিশ্বজুড়েই মানুষ অধীর আগ্রহে বসে আছে একটা ভ্যাকসিনের আশায়। যেভাবে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের জন্য অপরিসীম বিনিয়োগ হচ্ছে, এক বা একাধিক ভ্যাকসিন যে অতি শিগগির বাজারে চলে আসবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বাজারে এলেও তা কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি ভ্যাকসিনের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে সজীব রাখা। আমাদের নিজেদের শরীর যদি সুস্থ-সবল না থাকে, নিজের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাই যদি দুর্বল থাকে তাহলে ওষুধ/ভ্যাকসিন কোনো কিছুর কার্যকারিতাই কিন্তু আশানুরূপ হবে না। নিজের শরীরকে সুস্থ-সবল রাখার উপায় আমাদের নিজেদের হাতেই আছে। আমার কাজটা আমি করে রাখি, বিজ্ঞানীদের তাঁদের কাজটা করতে দিই, সবার মিলিত প্রয়াস এই দুর্যোগ মোকাবেলায় অত্যন্ত জরুরি। এর আগেও অনেক দুর্যোগ মানবজাতি মোকাবেলা করেছে সফলভাবে, করোনার এই দুর্যোগও চলে যাবে।
 
ড. সমীরুজ্জামান সমীর, গবেষক, ন্যানোবায়োটেক, যুক্তরাজ্য
ড. এনায়েতুর রহমান, গবেষক, বায়োডিভাইস ল্যাব, আলস্টার ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা