kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

উপকূলের পতিত জমিতে মুগডালের চাষ

ড. এম জি নিয়োগী ও ড. আব্দুল হামিদ   

২২ জুলাই, ২০২০ ১২:৩৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



উপকূলের পতিত জমিতে মুগডালের চাষ

দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা শুষ্ক মৌসুমে অনাবাদি থাকে। এর পরিমাণ চার লাখ ৩৯ হাজার হেক্টর। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে আমন ধান কাটার পর এই বিশাল পরিমাণ জমি ছয়-সাত মাসেরও বেশি সময় পতিত থাকে। মূলত শুষ্ক মৌসুমে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, বেশ কিছু অঞ্চলে পানি নেমে যেতে না পারার কারণে জলাবদ্ধতা এবং সেচযোগ্য পানির অভাবের কারণেই এসব জমি পতিত থাকছে।

পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলাসহ বরিশাল বিভাগের বেশ কিছু এলাকার অলবণাক্ত এবং কম লবণাক্ত অঞ্চলে বেশ কয়েক বছর ধরে মুগডালের চাষ হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত একটু মধ্যমমাত্রার লবণাক্ত জমি হলেই এই ফসলের চাষ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষক কাঙ্ক্ষিত ফলন পাচ্ছে না। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এখন অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। জোয়ারের পানি বিস্তীর্ণ এলাকাকে প্লাবিত করছে। ক্ষেতের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মে মাসে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং সেই সঙ্গে জোয়ারের পানিতে উপকূল অঞ্চলে মুগ ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে কৃষক মুগ ফসল চাষাবাদে উত্সাহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমি আমন ধান কাটার পরে পতিত থাকছে।

এই লবণাক্ত পতিত জমিতে ফসল ফলানোর লক্ষ্যে অ্যাগ্রেরিয়ান রিসার্চ ফাউন্ডেশন এনএটিপি ফেস-২ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৮-১৯ সাল থেকে উপকূলের দুর্গম অঞ্চলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় কৃষকের মাঠে গবেষণা করে আসছে। 

করোনা মহামারি ক্রান্তিকালেও বেশ কিছু ভালো ফলাফল এই গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষক যদি ডিসেম্বর মাসে আমন ধান কাটার পরে জানুয়ারি মাসে একই জমিতে মুগডালের বীজ সিডার মেশিনের সাহায্যে লাইনে বপন করে, তাহলে কৃষক ভালো ফলন পেতে পারে। 

জানুয়ারি মাসে মুগ বীজ বোনার জন্য শীতের কারণে গাছে বাড়বাড়তি কম হয়। তবে ফেব্রুয়ারি মাসেই গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়ে আসে। তাই জানুয়ারি মাসে বীজ বোনার কারণে কৃষক মার্চ মাসের শেষে প্রথমবার মুগ ফসল তুলতে পারবে এবং এপ্রিল মাসে দ্বিতীয়বার ফসল তুলতে পারবে। এতে মে মাসে ঝড়-বৃষ্টি শুরুর আগেই ৮০ শতাংশ ফসল তোলা সম্ভব। 

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত স্বল্পমেয়াদি বিইউ মুগ-৫ নিয়ে কৃষকের জমিতে গবেষণা করা হয়েছিল। দেখা গেছে, বীজ বপনের মাত্র ৫৫ দিনের মধ্যেই প্রথমবার এই জাতের ফসল তোলা যায়। এক সপ্তাহ আগে পাকে বিধায় ঝড়-বৃষ্টির ঝুঁকিও এই জাতের ফসলে কম থাকে। 

এখানে উল্লেখ্য যে এবার ২০ মে আম্ফান ঘূর্ণিঝড়ের আগেই কৃষক বিইউ মুগ-৫ জাতের ডাল সম্পূর্ণ তুলতে পেরেছিল। অর্থাৎ বিইউ মুগ-৫ ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যায়, তিনটি বিষয় মাথায় রেখে মুগডাল চাষাবাদ করলে কৃষক উপকূলের ঝড়-বৃষ্টি থেকে মুগ ফসলকে রক্ষা করতে পারবে।

প্রথমত, জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে মুগডালের বীজ বপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিইউ মুগ-৫-এর মতো স্বল্পমেয়াদি জাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, সিডার মেশিনের সাহায্যে লাইনে বীজ বপন করতে হবে। এ ছাড়া আগাছা নিয়ন্ত্রণ ও পোকা-মাকড় দমন মুগডাল চাষাবাদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তির বদৌলতে কৃষক সামনের শুষ্ক মৌসুমেই উপকূলের বিস্তীর্ণ পতিত জমিতে চাষাবাদ করে উচ্চ মূল্যমানসমৃদ্ধ ফসল ঘরে তুলতে পারবে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত—দেশের কোথাও এক ইঞ্চি পরিমাণ জমি যেন অনাবাদি না থাকে, এই লক্ষ্য সামনে রেখে কেন উপকূলের বিস্তীর্ণ পতিত জমিতে মুগডাল চাষকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে! সাধারণত ডিসেম্বর মাসে আমন ধান কাটার পর জানুয়ারি মাসে কোনো ফসল (সরিষা, গম, আলু ইত্যাদি) চাষাবাদ করার সময় থাকে না। দক্ষিণাঞ্চলে মুগডাল চাষের উপযুক্ত সময় হলো জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস। তাই অতি সহজেই কৃষক আমন ধান কাটার পর পতিত জমিতে মুগডাল চাষাবাদ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, মুগডাল অত্যন্ত কম সময়ের ফসল। মাত্র দুই মাসে মুগ ফসলের ৫০ শতাংশেরও বেশি ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশে দানাজাতীয় এমন আর কোনো ফসল নেই, যার থেকে মাত্র দুই মাসে ফসল সংগ্রহ সম্ভব।

তৃতীয়ত, মুগ ফসল চাষাবাদে সাধারণত সেচের প্রয়োজন হয় না। জানুয়ারি মাসে মুগ বীজ বপন করলে জমিতে যে আর্দ্রতা থাকে, তা দিয়েই মুগ ফসল বেড়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে গত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছরেই মার্চ-এপ্রিল মাসে কোনো না কোনো সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে, যা মুগ ফসলের জন্য ইতিবাচক। তবে মে মাসের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত মুগ ফসলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আর সে কারণেই মুগ ফসল জানুয়ারি মাসে বপন করলে মে মাসের আগেই মুগ ফসল তোলা যায় এবং ভালো ফলন নিশ্চিত করা যায়।

চতুর্থত, মুগগাছের শিকড়ে এক ধরনের গুটি বা নডুউলের সৃষ্টি হয়, যা জমিকে উর্বর করে। মুগগাছ থেকে মুগের ছেই বা পড্ (ফল) তোলার পর সম্পূর্ণ গাছকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে জমিতে তা পচে জৈব সার তৈরি হবে এবং জমিকে উর্বর করবে। এতে জমির লবণাক্ততাও কমে যাবে।

পঞ্চমত, মুগডাল অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ। মুগডাল সুস্বাদু এবং সবাই খেতে পছন্দ করে। করোনাভাইরাস বা যেকোনো অসুখে পুষ্টিকর খাদ্য প্রয়োজন। গরিব কৃষক পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য কোথায় পাবে! কৃষক যদি মুগডাল চাষাবাদ করতে পারে, তাহলে গরিব কৃষক পরিবার ভাতের সঙ্গে নিয়মিত ডাল খেতে পারবে, যা পরিবারকে পুষ্টিসমৃদ্ধ করবে। 

এ ছাড়া প্রতি কেজি মুগডালের বাজারমূল্য ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা, যা অন্য যেকোনো ফসলের বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। তাই মুগডাল চাষ করে কৃষক একদিকে যেমন পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারবে, অন্যদিকে বাজারে বিক্রি করে আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হতে পারবে।

মুগডাল চাষাবাদে খরচ অনেক কম। সিডার মেশিন দিয়ে চাষাবাদ করলে খরচ আরো কমে যায়। মেশিন দিয়ে এক বিঘা জমিতে এক ঘণ্টায় চাষসহ বীজ বোনা যায়। এতে খরচ মাত্র ৫০০ টাকা। এক বিঘা জমিতে মেশিন দিয়ে চাষাবাদ করলে মুগ ফসলের মোট উৎপাদন খরচ হবে দুই হাজার ৫০০ টাকা। এর থেকে ২০০ কেজি মুগডাল পাওয়া যাবে, যার বাজারমূল্য ১৫ হাজার টাকা।

সরকারকে মুগডাল চাষাবাদ সম্প্রসারণে এগিয়ে আসতে হবে। মুগডাল উত্পাদনের পাশাপাশি উপকূলের গরিব কৃষক পরিবারের সদস্যরা যথেষ্ট পরিমাণ ডাল খেতে পারবে। দেহে পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারবে। বাজারে ডাল বিক্রি করে লাভবান হতে পারবে।

গবেষণায় উপকূল অঞ্চলের পতিত জমিতে মুগডাল চাষাবাদে ওপরে উল্লিখিত অনেকগুলো ইতিবাচক দিক বেরিয়ে এসেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার এখনই উপকূল অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক গত ১২ মার্চ ২০২০ তারিখে খুলনার দাকোপ উপজেলার উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিয়ে মুগ ফসলসহ অন্যান্য গবেষণার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন। গবেষণালব্ধ এই সার্থক প্রযুক্তিগুলো উপকূল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ পতিত জমিতে ছড়িয়ে দিতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে তিনি জানিয়েছেন। 

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র। বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশকে করোনা-পরবর্তী সময়ের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচাতে এবং প্রয়োজনে বিশ্বের যেকোনো দেশকে খাদ্যসহায়তা দিতে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে খাদ্যশস্য উত্পাদনে প্রস্তুতি নিতে বলছেন। দেশের কোথাও যেন এক ইঞ্চি পরিমাণ জমি অনাবাদি না থাকে, সে ব্যাপারে দেশের আপামর জনসাধারণ, বিশেষ করে কৃষকসমাজ এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগগুলোকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। উপকূল অঞ্চলে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারের অন্যান্য সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যারা কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারাও এই মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে পারে। প্রয়োজনে অ্যাগ্রেরিয়ান রিসার্চ ফাউন্ডেশন কারিগরি সহায়তা দিতে পারে। উপকূলের পতিত জমিতে প্রযুক্তিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দেশের প্রতি ইঞ্চি জমিকে আবাদের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং দেশকে ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখবে।

লেখকদ্বয় : গবেষক, অ্যাগ্রেরিয়ান রিসার্চ ফাউন্ডেশন

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা