kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

তিনি ভাইরাসকে ধাওয়া করেছেন আজীবন ও জিতেছেন, হারলেন করোনার কাছে

আল সানি   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০৮:৫২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিনি ভাইরাসকে ধাওয়া করেছেন আজীবন ও জিতেছেন, হারলেন করোনার কাছে

১৯৭৬ সাল। আফ্রিকার দেশ গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো। ইয়ামবুকু নামের এক গ্রামের কিছু লোক খুব জ্বর আর মাথাব্যথায় ভুগছিল। বেলজিয়ামের এক গবেষণাগারে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের নমুনা পাঠানো হলো। অনুবীক্ষণ যন্ত্রে লম্বা সুতার মতো একটি ভাইরাসের দেখা পেলেন গবেষকরা। ওই সময়ের চেনা কোনো ভাইরাসের সঙ্গে এর মিল নেই। দলটি শেষে ইয়ামবুকু গেল আর দেখল দ্রুতই অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এ ভাইরাসে আর মরছেও অনেক। দলটি উঠেপড়ে লাগল ভাইরাসটি কিভাবে সংক্রমিত হয় তা জানার জন্য এবং শরীরে এটা কী কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে আর একে থামানোই যায় কিভাবে। তবে সবার আগে এর একটা নাম দিতে হবে। একজন বললেন, গ্রামটির নামের সঙ্গে মিলিয়ে একে ইয়ামবুকু ভাইরাস বলা যেতে পারে। অন্যরা তাতে সায় দিল না। কারণ এতে গ্রামটির বদনাম হয়ে যাবে। ১৯৬৯ সালে এমন একটি ঝামেলা হয়ে গিয়েছে। লাসা ভাইরাসের কারণে নাইজেরিয়ার লাসার বদনাম হয়েছে। শেষে ঠিক হলো কোনো একটি নদীর নামে এর নাম দেওয়া যেতে পারে। কঙ্গো বেশ নামি নদী আফ্রিকার। এর নামে কী হয়? জানতে চাইল আরেকজন। কিন্তু কঙ্গোর সঙ্গে মিলিয়ে ক্রিমিয়ান-কঙ্গো হেমোরেজিক ফিভার ভাইরাসের নাম দেওয়া হয়ে গেছে। শেষে মানচিত্র খুলে পাওয়া গেল ইয়ামবুকুর কাছের নদীটির নাম ইবোলা। সেই নদীর নামেই ইবোলা ভাইরাস। এসবই লিখেছেন পিটার পায়ট তাঁর স্মৃতিকথায়। নাম—দম ফেলার সময় ছিল না : মরণঘাতী ভাইরাসের পেছনে গোটা জীবন (নো টাইম টু লুজ : আ লাইফ ইন পারস্যুট অব ডেডলি ভাইরাসেস)।

 

পায়ট তখন তরুণ

বেলজিয়ান পায়টের জন্ম ১৯৪৯ সালে। ছিয়াত্তরে পায়ট সদ্যই মেডিক্যাল স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন আর ক্লিনিক্যাল বায়োলজিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পের ট্রপিক্যাল মেডিসিন ইনস্টিটিউটে গবেষণার সময় পায়ট সাধারণ প্লাস্টিকে তৈরি একটি থার্মোফ্লাস্কে দুটি শিশি আর প্রায় গলে যাওয়া কিছু বরফ পেলেন। শিশির ভেতরে রক্তের নমুনা। কঙ্গো থেকে পাঠিয়েছেন এক বেলজিয়ান ডাক্তার। নমুনা নেওয়া হয়েছে একজন বেলজিয়ান নানের দেহ থেকে। তিনি ইয়ামবুকুতে ধর্ম প্রচারের কাজ করছিলেন। একটি পণ্যবাহী জাহাজে করে পাঠানো হয়েছে ফ্লাস্কটি। পায়ট ও তাঁর সঙ্গীরা ফ্লাস্ক খুলে একটি শিশি অক্ষত পেলেন, অন্যটি ঝাঁকাঝাঁকিতে ভেঙে গেছে। পায়ট ও তাঁর সঙ্গীরা পরীক্ষা করে দেখলেন, না এর সঙ্গে ডেঙ্গু, লাসা ভাইরাসের কোনো মিল নেই। তাঁরা দুটি ইঁদুরের শরীরে নমুনার কিছুটা প্রবেশ করালেন। সপ্তাহখানেক পরে ইঁদুর দুটি মরে গেল। পায়ট লিখছেন, ‘আমরা যখন অনুবীক্ষণ যন্ত্রে নমুনা রাখলাম, দেখলাম দৈত্যাকার এক ভাইরাস, সাধারণ ভাইরাসের তুলনায় সেটি ছিল বেশ বড়। শুধু মারবুর্গ ভাইরাসের সঙ্গে এর দৈর্ঘ্যে মিল আছে (মারবুর্গ ১৯৬৭ সালে ৩১ জন গবেষণাগারকর্মীকে আক্রমণ করেছিল)। ছিয়াত্তর সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে শুধু তিনটি গবেষণাগার (লন্ডনে একটি, একটি ম্যারিল্যান্ডে আর তৃতীয়টি আটলান্টায়) ছিল, যেখানে ভাইরাস নিয়ে নিরাপদে গবেষণা করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নমুনা আটলান্টার গবেষণাগারে পাঠাতে বলল। আটলান্টা বলে পাঠাল, এটি একেবারেই নতুন কোনো ভাইরাস। পায়ট লিখেছেন, ‘আমি একটুও ভয় পাইনি; বরং নতুন একটি ভাইরাস আবিষ্কারে আমার অংশগ্রহণ আছে ভেবে আনন্দ পেলাম। আরো খুশি হলাম, মানুষের প্রাণ বাঁচাতেও ভূমিকা রাখতে পারব ভেবে।’ পায়ট ও সঙ্গীরা সোজা ইয়ামবুকু পাড়ি জমালেন। পায়ট আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রশ্ন করে বুঝতে চাইলেন সংক্রমণের কেন্দ্রস্থল। বুঝলেন, স্থানীয় হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে বেশি (হাসপাতালে একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহৃত হচ্ছিল) আর পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, বিশেষত ১৮-৩০ বছর বয়সী গর্ভবতীরা। পায়ট আরো বুঝলেন, মৃতের সৎকারে গিয়েও লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে। এবার থামানোর উপায় খুঁজলেন। পায়ট ও তাঁর দল গ্রামে গ্রামে গিয়ে আক্রান্তদের বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করলেন। একজনকে আরেকজনের কাছ থেকে দূরত্ব রাখতে বললেন। বললেন হাত না মেলাতে আর কোলাকুলি না করতে। মৃতের সৎকারের নিরাপদ উপায় বুঝিয়ে দিলেন। শেষে ৩০০ লোকের প্রাণ কেড়ে নিয়ে সেবারের মতো ইস্তফা দিয়েছিল ইবোলা। ২০১৪-২০১৬ সালে ইবোলা আবার ফিরে এসেছিল। পশ্চিম আফ্রিকায় মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছিল। ছড়িয়ে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রেও। ইবোলা পাওয়ার পর থেকে ভাইরোলজিস্ট হিসেবে সারা পৃথিবীতে নাম ছড়িয়ে পড়ে পায়টের। আশির দশকে তিনি এইচআইভি (এইডস রোগের কারণ) ভাইরাসের পিছু নেন। আর পঁচানব্বই (ইউএনএইডসের নির্বাহী পরিচালক) থেকে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

 

৪০ বছর হয়ে গেল

এখন লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের পরিচালক পিটার পায়ট। ভাইরাস থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয় বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জনস্বাস্থ্যের ওপর ভাইরাসের প্রভাব আগে থেকেই বলতে পারেন। ভাইরাসের প্রভাবে কোনো ব্যক্তির ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) কিডনি বা হার্টের সমস্যা হবে কি না তা-ও বলতে পারেন।

 

শেষে করোনায় কাবু

জানুয়ারির শেষের দিকে সিঙ্গাপুরে একটি চিকিৎসা সম্মেলনে গিয়েছিলেন। মার্চের গোড়ায় যান বোস্টনে। সেখানে ভাষণও দিয়েছেন। তারপর লন্ডন ফিরে কমপক্ষে পাঁচটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়েছেন। তিনি হাত মেলানো বাদে আর কোনো সতর্কতা অবলম্বন করেননি। ১৯ মার্চ সন্ধ্যায় জ্বরজ্বর অনুভব করেন আর সেই সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা। ৩১ মার্চ তাঁর জ্বর ওঠে ১০৪ ডিগ্রি। জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে রয়েল লন্ডন হসপিটালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পায়ট বললেন, ‘আমার সত্যি ভয় করছে। আমি বুঝতে পারছি এটি আমার জীবনে পরিবর্তন আনবে।’ পায়টের শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকে এবং অক্সিজেন নেওয়ার প্রয়োজন হয়। শেষে পিটারকে গত ৮ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়। ১৩ মে গার্ডিয়ানকে পিটার বলেছিলেন, ফাইনালি এ ভাইরাস গট মি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা