kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭। ৭ আগস্ট  ২০২০। ১৬ জিলহজ ১৪৪১

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

পাচার হওয়া গরু কি কোরবানির উপযুক্ত? প্রশ্ন তুলেছে বিএসএফ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ জুলাই, ২০২০ ১৯:৫২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাচার হওয়া গরু কি কোরবানির উপযুক্ত? প্রশ্ন তুলেছে বিএসএফ

কোরবানির ঈদের আগে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাচার রুখতে বিএসএফ এক নতুন কৌশল নিয়েছে। পাচার হওয়ার আগে গরুগুলিকে যে অপরিসীম নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়, সেগুলো কোরবানি দেওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছে বি এস এফ।

কোন গরু কোরবানি দেওয়া উচিত বা অনুচিত, তা নিয়ে কোনও সীমান্তরক্ষী বাহিনী এধরণের বার্তা আগে কখনও দিতে চেয়েছে বলে জানা যায় না।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন বিষয়ে ভারতের কোনও বাহিনীর এধরণের মন্তব্য অনুচিত।

একই সঙ্গে গরু পাচারের প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করে, সেইসব রাখালদের উদ্দেশ্যেও তারা বার্তা দিতে চেয়েছে যে - কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে তারা বিএসএফের হাতে ধরা পড়া বা গুলি খাওয়ার মতো বড় ঝুঁকি নিলেও পাচারচক্রের মাথারা আড়ালেই থেকে যায়।

পাচার রোধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএসএফ?

ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বলছে প্রতিবারের মতো এবছরও কোরবানির ঈদের আগে গরু পাচার রোধে তারা বেশকিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে, যার মধ্যে আছে পাচারের পরিচিত এলাকাগুলিতে বাড়তি প্রহরা দেওয়া, ইলেকট্রনিক নজরদারি, স্পিড বোটে চেপে নদী অঞ্চলে পাহারা দেওয়া ইত্যাদি।

তারা কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার একটি বিবরণী সংবাদমাধ্যমের কাছে পাঠিয়েছে বিএসএফ।

তাতে বলা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য সূত্রে বিএসএফ জেনেছে যে সীমান্ত এলাকায় গরুর হাটে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা খুব দ্রুত চালু করা হবে যেখানে ভারত থেকে পাচার হয়ে যাওয়া গরু বেচাকেনা হচ্ছে।

এছাড়াও তারা উল্লেখ করছে, যে পাচারের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই কলার ভেলায় বেঁধে নদীতে গরু ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সেগুলি যখন বাংলাদেশের দিকে পাচারকারীরা স্পিড বোটে চেপে নদী থেকে তুলতে যায়, তাতে কখনও কখনও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডসের সম্মতি থাকে।

তবে ওই বিবরণীতে সবথেকে বেশি নজরে পড়েছে যে বিষয়টি, তা হল পাচার হওয়া গরু কোরবানি দেওয়া কতটা উচিত, তা নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্নটি।

বিএসএফের লিখিত বিবরণীতে বলা হয়েছে, "পাচারকারীরা গরুগুলির সঙ্গে পাশবিক আচরণ করে। পাচার করার আগে গরুর শরীরে মাদক মেশানো ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়। কোনও সময়ে লেজ কেটে দেওয়া হয়, যাতে গরুগুলি প্রাণপনে দৌড়তে পারে, তাদের অভুক্ত রাখা হয়।"

"এইরকম যন্ত্রণা দিয়ে গরুগুলিকে সীমান্তের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয় কয়েকশো কিলোমিটার পায়ে হাঁটিয়ে অথবা ট্রাকে গাদাগাদি করে। এইরকম যন্ত্রণা দেওয়ার পরে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীই গরুগুলি আর কোরবানির উপযুক্ত থাকে না," লেখা হয়েছে ওই বিবরণীতে।

'পাচার হওয়া গরু খাওয়া উচিত নয়'

এ প্রসঙ্গে বিএসএফের দক্ষিণ বঙ্গ ফ্রন্টিয়ারের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এস গুলেরিয়া অবশ্য ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী যন্ত্রণা দিয়ে যে গরু পাচার হয়েছে, তা কতটা আদর্শ, সেই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে চাননি।

তিনি বলেছেন পশুবিজ্ঞান অনুযায়ী ওই ভাবে পাচার হওয়া গরু মানুষের খাওয়া উচিত নয়।

মি. গুলেরিয়ার ব্যাখ্যা,"বাংলাদেশে যখন গরুগুলিকে পাচার করা হয়, তার আগে থেকেই এদের ব্যাপক নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়। তাদের যেভাবে গাদাগাদি করে গাড়িতে চাপিয়ে অথবা বহু কিলোমিটার পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হয়, তাতে অনেক গুরু আহতও হয়, রক্তাক্ত হয়। সীমান্তে নিয়ে আসার পরে তাদের মাদক মেশানো ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়।"

"কখনও তাদের দৌড় করানো হয় বা চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে, পা বেঁধে কলার ভেলায় বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় যেসব গরু বাংলাদেশে পৌঁছায়, সেগুলি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আদৌ মানুষের খাওয়ার উপযোগী নয়।"

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মানুষের পাচার হওয়া গরু কোরবানি দেওয়া উচিত না অনুচিত, তা নিয়ে কেন বিএসএফ মন্তব্য করতে গেল - এই প্রশ্নের জবাবে বিএসএফের অবসরপ্রাপ্ত ডি আই জি সমীর কুমার মিত্র বলছিলেন, "হিন্দু ধর্ম হোক বা ইসলাম, ঈশ্বরের কাছে যা উৎসর্গ করা হয়, সেই জীবটির তো সুস্থ, সবল থাকা উচিত। কিন্তু পাচার হওয়ার আগে বা পাচারের সময়ে গরুগুলিকে যে নিষ্ঠুরতা আর পাশবিকতার শিকার হতে হয়, সেগুলি অনেক সময়েই শুদ্ধভাবে উৎসর্গ করার অবস্থায় থাকে না।"

"পাচার হয়ে যাওয়া যে গরুগুলিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অনেকেই কোরবানি দিচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যে হয়তো বিএসএফ একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই প্রশ্নটা সেদেশের মানুষের মনে ঢুকে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ভারত থেকে গরুর চাহিদা কমবে, তাতে পাচারও কমানো যাবে," ব্যাখ্যা করছিলেন মি. মিত্র।

'অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ' না করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাংলাদেশের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে কীভাবে ঈদ পালন করবে, সেটা নিয়ে ভারতের কোনও বাহিনীর মন্তব্য করা বাঞ্ছনীয় নয়।

"বাংলাদেশ আমাদের প্রতিবেশী এবং বন্ধু রাষ্ট্র। এমন কোনও মন্তব্য কাগজে কলমে করা ঠিক নয়, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আঘাত করে, বা তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উদ্বিগ্ন করে," বলছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমন কল্যান লাহিড়ী।

"সীমান্তে গরু পাচার সহ সব ধরণের অপরাধ বন্ধ করা নিশ্চয়ই প্রয়োজন। কিন্তু সেটা নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন। প্রতিবেশী দেশে কীভাবে ঈদ বা অন্য কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে, তা নিয়ে ভারতের কোনও বাহিনীর মন্তব্য করা অনুচিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটা থিয়োরি আছে, 'থিয়োরি অফ নন ইন্টারফিয়ারেন্স।'

"অর্থাৎ অন্য দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি। এটা না মেনে চললে বাংলাদেশের সঙ্গে যে সম্পর্ক আমাদের আছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে," বলছিলেন মি. লাহিড়ী।

পাচার হওয়া গরু কোরবানি দেওয়ার উপযুক্ত কি না, তা নিয়ে মন্তব্য করা ছাড়াও বিএসএফের বিবরণীতে যেভাবে পাচারের সঙ্গে বিজিবির পরোক্ষ সহযোগিতা নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে, সেটাও বেশ আশ্চর্যজনক।

আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসএফ বলে থাকে যে দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সর্বকালের সেরা সম্পর্ক এখন রয়েছে। দুই বাহিনীর নিয়মিত বৈঠক হয়। তাই পাচারকারীদের সহায়তা দেওয়ার মতো প্রসঙ্গ সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয় না।

বিএসএফের ডি আই জি মি. গুলেরিয়া বলছিলেন, "বাংলাদেশ সরকার তো আনুষ্ঠানিকভাবেই বলে থাকে যে তারা চায় না যে ভারত থেকে গরু পাচার হয়ে তাদের দেশে যাক। নিজেদের দেশেই তারা গরুপালনে উৎসাহ দিচ্ছে।"

"বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশও সেদেশের সরকারের নীতিই মেনে চলে। কিন্তু এই বেআইনী ব্যবসায় বহু কোটি টাকা জড়িয়ে আছে। ভারত আর বাংলাদেশের মাফিয়ারা তাই সবসময়েই চেষ্টা করে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে পাচার চালিয়ে যেতে।"

কিন্তু লিখিত বিবৃতিতে গরু পাচারে বিজিবি-র পরোক্ষ সম্পৃক্ততা নিয়ে যা লেখা হয়েছে, তাতে বিএসএফের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়ার অফিসাররাও কিছুটা বিস্মিত।

এক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়ার অফিসার বলেন যে দুই বাহিনীর বৈঠকে এই প্রসঙ্গ ওঠে ঠিকই, যে বিজিবি যথেষ্ট কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে না, কিন্তু সেসব কথা বৈঠকের কার্যবিবরণীতেও থাকে না। একেবারেই অনানুষ্ঠানিকভাবে সেসব কথা হয়। কিন্তু সেরকম একটি তথ্য কেন লিখিত বিবৃতিতে দেওয়া হল, সেটাই আশ্চর্যের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা