kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

করোনা : দূষিত এক নগরীর সাময়িক হাসি, নগরবাসীর দীর্ঘ কান্না

মোঃ শাহ জালাল মিশুক   

৭ জুলাই, ২০২০ ১৬:৫৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা : দূষিত এক নগরীর সাময়িক হাসি, নগরবাসীর দীর্ঘ কান্না

কভিড ১৯ যা এখন করোনাভাইরাস নামেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যাধিক  সুপরিচিত। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রথম চীনে শনাক্ত হয় করোনা ভাইরাস। যার অল্প কিছুদিনের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পরে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং বড় হতে থাকে মৃত্যুর মিছিল। ফলে করোনা ভাইরাস অল্প কিছুদিনের মধ্যেই রুপ নেয় বৈশ্বিক মহামারীতে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক অপরূপ লীলাভূমি লাল সবুজের বাংলাদেশ ও রক্ষা পায়নি করোনার ভয়াল থাবা থেকে। যেহেতু গত ৮ মার্চ  বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। পাশাপাশি গত ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর সমগ্র বাংলাদেশকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। 

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর করোনার পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। ঢাকার সর্বত্রই এখন ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতি এই করোনাভাইরাস। আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর মনে করেন, ঘনবসতির কারণে রাজধানীতে করোনা রোগী বেশি। তিনি বলেন, ঢাকার মতো জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খুব সহজেই মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। সেসঙ্গে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সুবিধা দেশের অন্য অন্য জায়গার তুলনায় ঢাকায় বেশি, সেটিও একটি কারণ। এছাড়াও ঢাকার হাসপাতালগুলোর মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াতে পারে।

প্রায় দুই কোটির বেশী মানুষের বাস রাজধানী ঢাকায়। শত শত বছরের পুরোনো এই শহরে করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে সব বিষয়েই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাই চারিদিকে এতসব দুঃসংবাদের মধ্যেও করোনার প্রভাবে প্রকৃতিতে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন। করোনা হানা দেবার অল্প কিছুদিন আগেও সারাবিশ্বের সব মেগা সিটির মধ্যে ঢাকা ছিল সবচেয়ে বেশি দূষিত শহর। পাশাপাশি পৃথিবীতে বায়ু দূষণের দিক দিয়ে ঢাকাকে উপরের দিকেই রাখা হয়। এই অদৃশ্য বায়ু দূষণকে মানুষ ভয় না পেলেও অদৃশ্য করোনাভাইরাসকে ঠিকই ভয় পেয়েছে। তাই করোনা পরিস্থিতির শুরুর দিকে লকডাউনের কদিনেই ঘটেছিলো আকস্মিক পরিবর্তন। ফলে চিত্র পাল্টেছে ঢাকার। 

কোনও একটি শহরের একিউআই সূচকে ৫০ এর নিচে স্কোর থাকলে ওই শহরের বাতাসের মানকে ভালো বলা হয়। স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে বাতাসের মান গ্রহণযোগ বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু একিউআই স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে শহরের বাতাসকে দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বলে চিহ্নিত করা হয়। আর একিউআই স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে স্বাস্থ্য সতর্কতাসহ জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। স্কোর  ৩০১ থেকে ৫০০ হলে বাতাসের মান সবচেয়ে খারাপ বলে ধরে নেয়া হয়। 

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) গবেষণা বলছে, "গত বছরের মার্চের সঙ্গে এ মার্চ মাসের ঢাকার বাতাসের মান কোনোভাবেই মেলানো যাচ্ছে না। গেল এক মাসের নাটকীয়তায় ঢাকার বাতাসে দূষণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত ১০ বছরের মধ্যে মার্চ মাসে ঢাকার বাতাসের মান সবচেয়ে ভালো।" 

করোনাভাইরাসের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে মাঝে মাঝেই রাজধানী ঢাকা শহরের বায়ুর মানের উন্নতি হয়েছিলো। করোনা আতঙ্কে যান চলাচল ও নির্মাণ কাজ ও বেশির ভাগ শিল্পকারখানা ছিল বন্ধ। এ কারণেই বাতাসের দূষণ বেশ কিছু সময় অনেক কমে গেছে। ফলশ্রুতিতে ২২ মার্চ দুপুরে বায়ুমান সূচক (একিউআই) ইনডেক্সে বিশ্বের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় ঢাকা শহরের  অবস্থান নেমে এসেছিলো ১৮ নম্বরে। এছাড়াও ৩১ মার্চ বেলা ৩ টায় ঢাকা শহরের অবস্থান নেমে এসেছিলো ২৯ নম্বরে এবং ২৪ এপ্রিল সকালে ১০৪ একিউআই স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় ১২তম খারাপ অবস্থানে ছিল ঢাকা। পাশাপাশি গত ১১মে প্রায় ২৫ শতাংশ দূষণ কমে যাওয়ায়, দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ৩০/৪০ ধাপ নিচে নেমে এসেছিলো ঢাকা। আর এই অবস্থাকে নগরীর বায়ু দূষণ কমানোর মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ, অতিসত্ত্বর এলোমেলো নির্মাণ কাজ ও কলকারখানার দূষণ বন্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে এ দূষিত নগরীর প্রকৃতি ছিলো মানুষের কাছে বন্দী। করোনা প্রভাবে তারা ঘর বন্দি হওয়ায় প্রকৃতি ফিরে এসেছে স্বমহিমায়।যেখানে গত প্রায় এক বছর ধরে বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় উপরের দিকেই অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকা, সেখানে করোনা পরিস্থিতির শুরুর দিকে লকডাউনের মধ্যে প্রায়ই ঢাকার বাতাসের মান ভালো অবস্থানে পাওয়া গেছে। এমনকি লকডাউন শেষ হবার পর ও ৪ই জুন বিকালে এয়ার ভিজ্যুয়াল ইনডেক্সে ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা ছিল ৮০, যা অন্য সময়ের তুলনায় ভালো। এ অবস্থায় বায়ুকে সহনীয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বছরের অন্য সময় বায়ুদূষণে শীর্ষস্থানে থাকলেও ৪ই জুন ঢাকার অবস্থান ছিল ২৬ নম্বরে। 

এমনকি গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) জানিয়েছে, জনবহুল এই ঢাকার বাতাসের মান উন্নত হয়েছে। তবে এখনও পুরোপুরি স্বাস্থ্যকর নয়। সেখানে বলা হয়েছে, দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় মঙ্গলবার সকালে সপ্তম খারাপ অবস্থানে আছে ২ কোটি মানুষের ব্যস্ততম এই ঢাকা শহরটি।বাতাসের মানের দিক থেকে ঢাকার স্কোর ৯৭। যা বাতাসের মানকে ‘সহনীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলশ্রুতিতে এ দূষিত নগরীর জন্য মরনঘাতী করোনা ভাইরাস অন্য কোনো ভালো কিছু নিয়ে আসতে নাহ পারলেও নগরীর দূষণের যে অবিরাম কান্না তা সাময়িকভাবে হলেও কিছুটা লাঘব করেছে। 

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের তথ্য মোতাবেক এই শহরের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস করে। করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত শহর নিউ ইয়র্কে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১১ হাজার জন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা শহরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর মিছিল এমনভাবে বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে ঢাকা শহর যেনো নিজেই একটা করোনা বোমা। করোনা ভাইরাস ক্রমেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় লাখ লাখ নগরবাসী চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় শুরু থেকেই বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। একমুঠো খাবারের সন্ধানে তাদের অনেকেই ভীড় করছেন শহরের সড়কগুলোতে। 

ঢাকা শহরে কিছুক্ষণ ঘুরলেই মোড়ে মোড়ে কিংবা রাস্তার ধারে অসংখ্য মানুষকে দেখা যাচ্ছে, যারা মূলতঃ খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে এসেছেন পথে। লাজ-লজ্জা, করোনা আতংক সবকিছু ছাপিয়ে ক্ষুধা নিবারণই এখন তাদের কাছে মূখ্য বিষয়। নগরবাসী একদিকে যেমন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ভয়ে বাইরে বের হতে পারছে না, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে দু-মুঠো ভাতের জন্য বাসায় ও থাকতে পারছে নাহ৷ তাই এই পরিস্থিতিতে একান্তই জীবিকার তাগিদে সীমিত পরিসরে বাইরে বের হলেও করোনা প্রতিরোধে নগরবাসীদের মানতে হবে সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি। পাশাপাশি অতিদ্রুত আবিস্কার করতে হবে কার্যকরী কোনো ভ্যাকসিন এবং যেকোনো মূল্যে প্রতিরোধ করতে হবে বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসকে। নতুবা ফলাফল হবে নগরবাসীর দীর্ঘ কান্না, যার বাস্তবতা খুবই ভয়াবহ আর জন্ম দিবে ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন এ নগরীর নির্মম সব ইতিহাসের।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

*** মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা