kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭। ৭ আগস্ট  ২০২০। ১৬ জিলহজ ১৪৪১

পথের এঞ্জেল ইথিওপিয়ার জ্ঞানেট

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ জুলাই, ২০২০ ১৭:২৩ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পথের এঞ্জেল ইথিওপিয়ার জ্ঞানেট

আমরা টানা দুই দিন জার্নি শেষ করে ক্লান্ত হয়ে যখন ইথিওপিয়ার কনসো ভ্যালিতে এসে পৌঁছেছিলাম- চোখ খুলেই সেই স্মৃতির পাতা এখন ভোরের সূর্যের মতো আলোকিত হয়ে ওঠে। ছবির মানুষটির নাম জ্ঞানেট। তাকে আমি জ্ঞানেট আপা বলে ডাকি। ইথিওপিয়ার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তিনি, আমার ক্লাসমেট লোলা'র বোন। 

লোলা আর আমি দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে হিউম্যান রাইটস এন্ড এশিয়া বিষয়ে আমরা একসাথে কোর্স করেছিলাম। লোলা সব সময় বলতো ইথিওপিয়ার আরবামিন্স নগরে তোমাকে যেতেই হবে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা থেকে প্রায় ৪০ ঘণ্টা জার্নি করিই আমি গিয়েছিলাম লোলাদের আরবামিন্সের বাড়িতে। লোলা ছিলো না, কিন্তু লোলা'র বোন জ্ঞানেট আপা আমাকে লোলার অনুপস্থিতি অনুভব করতে দেয়নি। দূর দেশ থেকে আসা একজন পরিব্রাজক অতিথির জন্য যা যা করার দরকার ছিল সবই করেছেন তিনি। 

আদর-আপ্যায়ন, ঘুরে বেড়ানো, তাদের বিশেষ কফি কালচারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, তার সকল বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, তাদের ট্রেডিশনাল খাবার- দাবার অনেক কিছুর সাথেই  পরিচয় করে দিয়েছেন এই ছবির মানুষটি। যেদিন জ্ঞানেট আপু আমাকে সময় দিতে পারতেন না, সেদিন তার বন্ধু বেলাই ভাই আমাকে নিয়ে বের হতেন আরবামিন্স নগরীকে ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। 

জ্ঞানেট আপা সহ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে এমন অনেক মানুষ আমার পৃথিবী ভ্রমনের ইতিহাসে 'পথের এঞ্জেল' হয়ে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছেন। দুর্গম জায়গায় আমাকে নিরাপদে রাখা, কোথাও কোথাও আমাকে পথ দেখানো, তাদের নিজস্ব কালচারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, আরবামিন্স থেকে দক্ষিণ ইথিওপিয়ার বেশ কিছু অংশ আমাকে ঘুরে দেখিয়েছেন তিনি।

২০১৮ সালের এপ্রিলে আমি পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়া থেকে ম্যাপ করেছিলাম দক্ষিণ আফ্রিকার মোজাম্বিক, লেসোথো, সোয়াজিল্যান্ড পর্যন্ত ১৩ টি দেশ সফরের জন্য টানা সড়কপথে। পূর্ব আফ্রিকার ম্যাপের দিকে তাকালেই মনে পড়ে যায় সেই যাত্রাপথের সকল এঞ্জেল মানুষগুলোর কথা যারা আমাকে পথে-পথে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তেমনি একজন অসাধারণ মানুষ জ্ঞানেট আপা যাকে আমি কখনোই ভুলবো না, যার কথা ভাবলেই এখনো দূর থেকে তাকে আমি ভালোবেসে যাই। 

যেদিন আমি আর জ্ঞানেট আপা বিদায় নেব কনসো থেকে। আমি রওনা হব কেনিয়ার উদ্দেশ্যে, সেদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেললেন আর বললেন, যেন আমি লোলাকেই বিদায় দিচ্ছি। পথে যেন সাবধানে থাকি সে কথাই বারবার মনে করিয়ে দিলেন। আমার মাথা মুছে দিয়ে আমাকে আশীর্বাদ করলেন। মানুষ-মানুষে অদৃশ্য ভালোবাসার টান। সব দেশের মানুষগুলোর অনুভূতিগুলো যেন একই।

পৃথিবীর পথে পথে এমন অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে যারা আমার ভাই বোন নয়, কাছের কোন বন্ধু নয়, নিজ দেশের মানুষ নয়- তবুও তারা আমাকে আপন করে নিয়েছে, আমার অনেক কাছের মানুষ হয়ে গেছে। কারণ আমরা একই পৃথিবীর মানুষতো, তাই। 

লেখক : নাজমুন নাহার, বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী পরিব্রাজক, ১৪০ দেশভ্রমণকারী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা